অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ ও ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা-ভীতি প্রদর্শন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ইসরায়েলি সরকারের সমর্থন ও সহযোগিতায় উগ্রপন্থী বসতিস্থাপনকারীরা একের পর এক নতুন বসতি ও অবৈধ আউটপোস্ট গড়ে তুলছেন। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে বাড়িঘর ও জমি ছাড়তে বাধ্য করার অভিযোগও বাড়ছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ পশ্চিম তীরের ভূচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
চলতি মাসে ইসরায়েলের নির্বাচন সামনে রেখে এই তৎপরতা আরও জোরালো হয়েছে। বসতিস্থাপনকারীদের একটি অংশ মনে করছে, এখনই যত বেশি জমি ও এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়া যায়, ভবিষ্যতে সরকার পরিবর্তন হলেও সেগুলো ফিরিয়ে দেওয়া কঠিন হবে। তাদের এই কর্মকাণ্ডে সরকারের উচ্চপর্যায়ের কয়েকজন মন্ত্রীর প্রকাশ্য সমর্থনও রয়েছে।
গত তিন বছরে পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গাজা যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক মনোযোগের বড় অংশ অন্যদিকে সরে যাওয়ার সুযোগে পশ্চিম তীরে নতুন বসতি, আউটপোস্ট এবং ইসরায়েলিদের জন্য জমি কেনা ও নিবন্ধনের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। একই সময়ে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর উচ্ছেদ, সড়ক ও চেকপয়েন্টে বিধিনিষেধ এবং বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতাও বেড়েছে।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের হামলার ১ হাজার ৬০০টির বেশি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মানুষ আহত হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়ি ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে ছয়টিরও বেশি হামলার ঘটনা ঘটেছে।
জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা বিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান যুদ্ধ শুরুর পর পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী বা বসতিস্থাপনকারীদের গুলিতে অন্তত ৭৬ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। রামাল্লার উত্তর-পূর্বে দেইর জারির ও আল-মুগাইয়েরের মতো ছোট ফিলিস্তিনি শহরেও বারবার প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এ বছর পশ্চিম তীরে অন্তত ৪ হাজার ৩০০ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। জাতিসংঘের হিসাবে, এসব বাস্তুচ্যুতির প্রায় ৬০ শতাংশের সঙ্গে বসতিস্থাপনকারীদের হামলার সম্পর্ক রয়েছে।
ইসরায়েলের বর্তমান সরকারের কয়েকজন প্রভাবশালী ডানপন্থী মন্ত্রী বসতি সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান সমর্থক। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের দায়িত্বের মধ্যে বসতি-সংক্রান্ত নীতিও রয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরও বসতি আন্দোলনের ঘনিষ্ঠ সমর্থক এবং নিজেও একজন বসতিস্থাপনকারী।
ইসরায়েলি বসতি পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন পিস নাউয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলি সরকার মাত্র তিনটি নতুন বসতি অনুমোদন করেছিল। কিন্তু এরপর থেকে ১০০টির বেশি বসতি অনুমোদন করা হয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছরের মার্চেই ৩৪টি বসতি অনুমোদনের ঘটনা রয়েছে। এমন অনেক আউটপোস্টও পরে বৈধতা পেয়েছে, যেগুলো শুরুতে ইসরায়েলি আইন অনুযায়ীও অনুমোদিত ছিল না।
পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীর সংখ্যা এখন ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি বলে বিভিন্ন হিসাব থেকে জানা যায়। তাদের পাশে প্রায় ৩০ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করছেন। নতুন নতুন আউটপোস্ট থেকে বসতিস্থাপনকারীদের হামলা ও ভয় দেখানোর কারণে বহু ফিলিস্তিনি পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে।

ইসরায়েলের আসন্ন ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনের আগে পশ্চিম তীরে ‘ই-১’ নামে পরিচিত একটি দীর্ঘদিনের বিতর্কিত প্রকল্পের অংশবিশেষের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়াও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ওই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হাজার হাজার বসতি-আবাসন তৈরি হতে পারে। সমালোচকদের আশঙ্কা, এটি পূর্ব জেরুজালেমকে পশ্চিম তীরের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
স্মোত্রিচের বক্তব্য অনুযায়ী, এই প্রকল্পের লক্ষ্যই হলো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে দুর্বল করে দেওয়া। বসতি সম্প্রসারণের পক্ষে থাকা শক্তিগুলো মনে করছে, বর্তমান সরকারের সময় তাদের জন্য এমন রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সুযোগ আগে কখনো ছিল না।
সহিংসতার সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর পশ্চিম তীরের জালুদ শহরে শতাধিক উগ্র বসতিস্থাপনকারী দাঙ্গা করে বলে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে। তারা সড়ক বন্ধ করে, আগুন ধরিয়ে দেয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর দিকে পাথর ছোড়ে। ওই সময় ইসরায়েলি সেনাদের পাহারায় বাস্তুচ্যুত একটি ফিলিস্তিনি পরিবার নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেনি।
রামাল্লার উপকণ্ঠে তাইবেহের কাছে কাবনাহ পরিবারের বাড়িতেও প্রতিদিনের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে সকাল ও সন্ধ্যায় বসতিস্থাপনকারীরা সেখানে আসে। কখনো তারা বাড়ির চারপাশে ঘোরাফেরা করে, কখনো পাথর ছোড়ে বা বাড়ির বেড়া ধরে ঝাঁকায়।
৫৫ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক নায়েফ কাবনাহ প্রায় ২৫ বছর ধরে ওই বাড়িতে বসবাস করছেন। সাত সন্তানের এই বাবা বলেছেন, বাড়ি ছেড়ে গেলে কোথায় যাবেন, সেটিই তিনি জানেন না। তার ভাষায়, একবার চলে গেলে আবারও বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

পশ্চিম তীরের উত্তরাঞ্চলেও বসতি সম্প্রসারণের চিত্র স্পষ্ট। ২০০৫ সালে ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারনের বিচ্ছিন্নতাবাদী পরিকল্পনার সময় পশ্চিম তীরের চারটি ইহুদি বসতি—গানিম, কাদিম, সা-নুর ও হোমেশ—খালি করা হয়েছিল। সে সময় প্রায় ৮ হাজার ৫০০ ইহুদি বসতিস্থাপনকারীকে গাজা থেকেও সরিয়ে নেওয়া হয়।
কিন্তু চলতি বছর ওই চারটি এলাকাতেই আবার বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আগস্টে কাদিম পুনরায় চালু হওয়ার পর ২০০৫ সালের সেই প্রত্যাহার কার্যত পুরোপুরি উল্টে দেওয়ার পথ তৈরি হয়েছে।
নতুন বসতিতে যাওয়া পরিবারগুলোর কেউ কেউ নিজেদের ‘অগ্রদূত’ হিসেবে দেখছেন। তাদের বক্তব্য, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর নিরাপত্তার জন্য ইসরায়েলিদের এসব এলাকায় ফিরে যাওয়া প্রয়োজন। তাদের কেউ কেউ বসতিগুলোকে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি এলাকার মধ্যে একটি নিরাপত্তা বলয় হিসেবেও দেখছেন।
তবে এর বিপরীত দিকে রয়েছে ফিলিস্তিনিদের বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকটের অভিযোগ। উত্তর পশ্চিম তীরে একটি বসতির কাছাকাছি কবর দেওয়ার পর ৮৫ বছর বয়সী হুসেইন আসা’আসাহর মরদেহ কবর থেকে তুলে অন্যত্র দাফন করতে তার পরিবারকে বাধ্য করা হয়েছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন। বসতিস্থাপনকারীরা দাবি করেছিল, কবরটি তাদের বসতির খুব কাছে। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, হুমকির মুখে তারা মরদেহটি তুলে অন্য শহরে পুনরায় দাফন করে।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। যুক্তরাজ্য সম্প্রতি ইসরায়েলি বসতিতে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতাকে ফিলিস্তিনিদের ‘জাতিগত নির্মূলের’ সঙ্গে তুলনা করেছেন। ইউরোপের কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও ইসরায়েলকে বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইসরায়েলবিষয়ক রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবিও আগস্টে উত্তর পশ্চিম তীরের কুসরায় ফিলিস্তিনি বাড়িঘর অবরোধের ঘটনায় সহিংস বসতিস্থাপনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। তবে মার্কিন নীতিতে বসতিস্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে চাপ অনেকটাই কমে এসেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনই বাইডেন আমলের পশ্চিম তীরের বসতিস্থাপনকারীদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেন।
ট্রাম্প সরাসরি পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু সমালোচকদের মতে, পশ্চিম তীরকে কার্যত ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার মতো পদক্ষেপের বিরুদ্ধেও তাঁর প্রশাসনের পক্ষ থেকে শক্ত অবস্থান দেখা যাচ্ছে না।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অবশ্য সহিংস বসতিস্থাপনকারীদের একটি অংশকে নিন্দা করেছেন। কিন্তু আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং সরকারের কিছু বক্তব্যের পরও বসতি সম্প্রসারণের গতি থামেনি। ফলে পশ্চিম তীরে নতুন বসতি, ভূমি নিয়ন্ত্রণ ও ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুতির যে প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সমাধানকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে।













