যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য ও নিরাপত্তা ইস্যুতে বড় ধরনের সমঝোতার সম্ভাবনা এখনো অনিশ্চিত। দুই দেশের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং চলতি বছরের শেষ নাগাদ আরও দুইবার বৈঠকে বসতে সম্মত হলেও তাইওয়ান প্রশ্নে তাদের অবস্থানের ব্যবধান স্পষ্ট রয়ে গেছে। কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখার আগ্রহ থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ বিরোধগুলো কাটিয়ে ওঠার মতো অগ্রগতি এখনো দেখা যাচ্ছে না।
গত সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রীয় সফরে যান চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা ও জাঁকজমকপূর্ণ ভোজের মাধ্যমে স্বাগত জানান। তবে এই আয়োজনের বিপরীতে বৈঠক থেকে দৃশ্যমান অর্জন এসেছে সামান্যই। দুই দেশের বাণিজ্যযুদ্ধ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার মেয়াদ মাত্র দুই মাস বাড়িয়ে জানুয়ারি পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবস্থাপনা নিয়েও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
তারপরও একই বছরে দুই নেতা পরস্পরের দেশে দুইবার করে সফর করার পরিকল্পনা করেছেন। এতে কেউ কেউ বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে বড় কোনো সমঝোতার প্রস্তুতি দেখছেন। তবে বাস্তবতা হতে পারে ভিন্ন। ধারাবাহিক বৈঠক সম্পর্কের অবনতি ঠেকাতে সহায়ক হলেও তা যে বড় ধরনের চুক্তি নিশ্চিত করবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
স্থিতিশীলতা চায় দুই পক্ষ
ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মিল রয়েছে। কোনো পক্ষই দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাক, তা চায় না।
বিরল মৃত্তিকা বা রেয়ার আর্থের মতো গুরুত্বপূর্ণ খনিজের সরবরাহের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখনো চীনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বিভিন্ন শিল্পপণ্য তৈরিতে এসব খনিজ অপরিহার্য। বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা গড়ে না ওঠা পর্যন্ত চীনের সঙ্গে সম্পর্কের বড় ধরনের অবনতি এড়াতে চান ট্রাম্প।
অন্যদিকে, শি জিনপিংয়ের সামনে রয়েছে ২০২৭ সালের শরতে অনুষ্ঠেয় চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জাতীয় কংগ্রেস। দেশের অভ্যন্তরে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—এমন বার্তা দেওয়া তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার অভিন্ন স্বার্থ থাকলেই যে দুই দেশ গুরুত্বপূর্ণ বিরোধে একমত হবে, তা নয়। সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত শীর্ষ বৈঠক বরং তাইওয়ান ইস্যুতে তাদের মতপার্থক্যের গভীরতাই তুলে ধরেছে।
বৈঠক সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানা যায়, শি জিনপিং ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে এবং স্বশাসিত দ্বীপটিতে মার্কিন অস্ত্র বিক্রি বন্ধ করতে চাপ দেন। কিন্তু ট্রাম্প এ বিষয়ে কোনো স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি।
এর প্রতিক্রিয়ায় বেইজিংও বড় কোনো বাণিজ্যিক ছাড়ের ঘোষণা দেয়নি। রাষ্ট্রীয় সফরের আনুষ্ঠানিকতা সত্ত্বেও নতুন কেনাকাটার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি ছিল ২০২৭ ও ২০২৮ সালে প্রতিবছর যুক্তরাষ্ট্র থেকে এক কোটি মেট্রিক টন কয়লা কেনা।
এর মধ্য দিয়ে চীনের অবস্থান স্পষ্ট হয়েছে। তাইওয়ান প্রশ্নে ওয়াশিংটন আরও নমনীয় না হলে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ব্যাপক পরিমাণে কেনার বিষয়ে বেইজিং বড় প্রতিশ্রুতি দিতে আগ্রহী হবে না।
তাইওয়ান প্রশ্নে ছাড় দেওয়া কঠিন ট্রাম্পের জন্য
ট্রাম্পও এ বিষয়ে আপস করতে আগ্রহী বলে মনে হচ্ছে না। গত বছরের অক্টোবর থেকে শি জিনপিংয়ের সঙ্গে তার তিনটি শীর্ষ বৈঠকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সমঝোতা করাকে নিজের বিশেষ দক্ষতা হিসেবে তুলে ধরা একজন প্রেসিডেন্টেরও তাইওয়ান প্রশ্নে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও অংশীদার দেশগুলোর আশঙ্কা ছিল, চীনের সঙ্গে বাণিজ্যিক সমঝোতার বিনিময়ে ট্রাম্প তাইওয়ানকে ছাড় দিতে পারেন। বিশেষ করে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করা কিংবা দ্বীপটিতে অস্ত্র বিক্রি বন্ধের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ ছিল তাদের।
তবে বছরের শেষ নাগাদ পরিকল্পিত দুই বৈঠকেও এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা ক্রমেই কমছে। এর কারণ তাইওয়ানের প্রতি ট্রাম্পের বিশেষ অনুরাগ নয়। বরং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, তিনি বিষয়টিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করেন।
তাইওয়ান প্রশ্নে বেইজিংকে বড় ধরনের ছাড় দিলে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে চীনের কাছে নতি স্বীকারের অভিযোগ উঠতে পারে। এতে মার্কিন কংগ্রেস ও রক্ষণশীল ভোটারদের সমালোচনার মুখে পড়তে পারেন তিনি। একই সঙ্গে ইতিহাসে একজন ‘মহান প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এই ব্যাখ্যার পক্ষে কিছু ইঙ্গিতও রয়েছে। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে চীনে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ বলেন, ট্রাম্প শি জিনপিংকে বারবার জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কাছে অস্ত্র বিক্রি করে। মার্কিন প্রশাসনের একজন কর্মকর্তা এই বক্তব্যকে তাইওয়ানে অস্ত্র বিক্রি অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন।
অন্যদিকে, তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ছাড় আদায় করতে চান শি জিনপিং। কিন্তু ট্রাম্পের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাকে নমনীয় হওয়ার সুযোগ কম দিচ্ছে। দুই নেতার অবস্থানে পরিবর্তন না এলে বড় ধরনের মার্কিন-চীন সমঝোতা অধরাই থেকে যাবে।
কূটনৈতিক আয়োজনেও মতপার্থক্যের ইঙ্গিত
শি জিনপিংয়ের সফরের আয়োজনেও দুই দেশের দূরত্বের প্রতিফলন দেখা গেছে। হোয়াইট হাউসে রাষ্ট্রীয় ভোজ এবং দুই নেতার ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনের ঘটনাগুলো বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
ভোজসভায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর একটি কোরাস দল ও ব্যান্ড ‘লেস মিজেরাবল’ সংগীতনাট্যের গান পরিবেশন করে। ফরাসি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের কাহিনিনির্ভর এই নাটকের বিষয়বস্তু চীনা কমিউনিস্ট পার্টির কাছে খুব একটা স্বস্তিকর হওয়ার কথা নয়।
অন্যদিকে, ন্যাশনাল আর্কাইভস পরিদর্শনের সময় ১৯৫১ সালে স্বাক্ষরিত সান ফ্রান্সিসকো শান্তিচুক্তি-সম্পর্কিত একটি প্রদর্শনীতে শেষ মুহূর্তে পরিবর্তন আনার খবরও আলোচনার জন্ম দেয়। বেইজিংয়ের তীব্র আপত্তির পর এই পরিবর্তন করা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ওই চুক্তিতে তাইওয়ানের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নটি নির্দিষ্ট করে উল্লেখ করা হয়নি এবং চীনও চুক্তিটির স্বাক্ষরকারী ছিল না।
এসব ঘটনা থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না যে ওয়াশিংটন ইচ্ছাকৃতভাবে রাজনৈতিক বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করেছে। তবে ঘটনাগুলো দুই দেশের মধ্যকার দূরত্বের ইঙ্গিত দিয়েছে। প্রকাশ্যে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানানো হলেও তাইওয়ান ও চীনা কমিউনিস্ট পার্টির রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে মতপার্থক্য যে এখনো গভীর, তা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা মার্কিন পক্ষের আচরণে দেখা গেছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বাড়তে পারে চাপ
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে চীনবিষয়ক পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ম্যাথিউ টারপিনের মতে, ট্রাম্প মনে করতে পারেন, তিনি শি জিনপিংকে সহযোগিতার সুযোগ দিয়েছিলেন, কিন্তু বেইজিং তার প্রত্যাশা পূরণে যথেষ্ট পদক্ষেপ নেয়নি। বিশেষ করে মার্কিন কৃষিপণ্য কেনা বাড়ানো এবং বিরল মৃত্তিকা রপ্তানিতে বিধিনিষেধ শিথিল করার ক্ষেত্রে চীনের কাছ থেকে আরও বেশি সহযোগিতা আশা করেছিলেন তিনি।
টারপিনের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর বর্তমান বাণিজ্যিক সমঝোতা বজায় রাখার বিষয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ কমে যেতে পারে। এর পরিবর্তে তিনি চীনের ওপর চাপ বাড়ানোর পথ বেছে নিতে পারেন। এমনকি শি জিনপিংয়ের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য ওই সময়কে উপযুক্ত সুযোগ হিসেবেও বিবেচনা করতে পারেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
টারপিন আরও বলেছেন, তাইওয়ানের জন্য রেকর্ড ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ অনুমোদন করলে তিনি অবাক হবেন না।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বড় ধরনের সমঝোতার প্রত্যাশা দুর্বল হয়ে পড়লেও ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের নির্ধারিত বৈঠকগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। দুই নেতা প্রকাশ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ ও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রাখতে পারেন। কিন্তু সেই সৌহার্দ্যের আড়ালে তাইওয়ান, বাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে দুই দেশের গভীর বিরোধ আরও তীব্র হওয়ার ঝুঁকি রয়ে গেছে।












