মিয়ানমারে মেথামফেটামিন উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কম দামে মাদক সরবরাহের কারণে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মাদক জব্দের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। সহজলভ্যতা ও দাম কমে যাওয়ায় থাইল্যান্ডে মাদকটির ব্যবহার বাড়ছে। একই সঙ্গে মাদক পাচারের বিস্তার জনস্বাস্থ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করছে।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মোট ৩৪৯ মেট্রিক টন মেথামফেটামিন জব্দ করা হয়েছে। ২০২৪ সালের তুলনায় এ পরিমাণ ৪৮ শতাংশ বেশি। এক দশক আগের তুলনায় মাদক জব্দের পরিমাণ বেড়েছে পাঁচ গুণেরও বেশি। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, ওজনের ভিত্তিতে বিশ্বে জব্দ হওয়া মেথামফেটামিনের প্রায় অর্ধেকই এসেছে এই দুই অঞ্চল থেকে।
থাইল্যান্ডে কমছে মাদকের দাম
থাইল্যান্ড এখন মেথামফেটামিনের অন্যতম বৃহৎ বাজারে পরিণত হয়েছে। দেশটিতে অনলাইনে মাদক পাওয়া সহজ হওয়ার পাশাপাশি এর দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সায়ামল চারোয়েনরাতানার তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে থাইল্যান্ডে মেথামফেটামিনের বড়ি বা ট্যাবলেটের দাম ব্যাপকভাবে কমেছে। বর্তমানে একটি বড়ি বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৩০ বাথে, যা মার্কিন মুদ্রায় প্রায় ৮৯ সেন্ট। আগে দাম ছিল বর্তমানের প্রায় পাঁচ গুণ।
মাদকের সহজলভ্যতা ও কম দাম দেশটিতে মাদক ব্যবহারের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। গত মে মাসের মাঝামাঝি ব্যাংককের কেন্দ্রীয় এলাকায় একটি মালবাহী ট্রেনের সঙ্গে বাসের সংঘর্ষে অন্তত আটজন নিহত হন। পরে ট্রেনচালকের মূত্র পরীক্ষায় মেথামফেটামিনের উপস্থিতি পাওয়া যায়। ঘটনাটি মাদক ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি করে।
মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতায় বাড়ছে উৎপাদন
মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও লাওসের সীমান্তবর্তী গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল দীর্ঘদিন ধরে আফিম ও হেরোইন উৎপাদনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। তবে ১৯৯০-এর দশক থেকে এ অঞ্চলের মাদকচক্রগুলো ক্রমেই মেথামফেটামিন উৎপাদনের দিকে ঝুঁকেছে। পরীক্ষাগারে বিপুল পরিমাণে এই কৃত্রিম মাদক তৈরি করা সম্ভব হওয়ায় এর উৎপাদন ও সরবরাহ দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে।
২০২১ সালে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর ক্ষমতা দখলের পর দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সংঘাত বাড়ে। এর প্রভাব পড়েছে মাদক উৎপাদন ও পাচারের ওপরও।
২০২৩ সালের অক্টোবরের দিকে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজেদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা সম্প্রসারণ করতে শুরু করলে মেথামফেটামিনের ব্যবসা তাদের অস্ত্র কেনার অর্থের একটি উৎস হয়ে ওঠে। এসব গোষ্ঠীর সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর সংঘাতের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর পক্ষে মাদক উৎপাদন ও পাচার দমন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
মিয়ানমারের শান রাজ্যে মাদক উৎপাদনের পাশাপাশি অনলাইন প্রতারণার চক্রের উপস্থিতিও সামনে এসেছে। ইউএনওডিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সেখানে বড় ধরনের অভিযান চালানোর সময় মেথামফেটামিন উৎপাদনকেন্দ্রের কাছেই একটি অনলাইন জালিয়াতি পরিচালনাকারী স্থাপনের সন্ধান পাওয়া যায়।
একাধিক দেশজুড়ে বিস্তৃত মাদক সরবরাহব্যবস্থা
মেথামফেটামিন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় রাসায়নিক উপাদান সরবরাহে চীন ও ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে মিয়ানমারে এসব উপাদান পৌঁছানোর ক্ষেত্রে চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশের রুইলি শহরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
চীন সরকার মাদক তৈরিতে ব্যবহৃত প্রাথমিক রাসায়নিক উপাদানের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ কঠোর করেছে। তবে এসব উপাদানের অনেকগুলোর বিকল্প হিসেবে এমন রাসায়নিক ব্যবহার করা সম্ভব, যেগুলোর বৈধ শিল্পকারখানায়ও ব্যবহার রয়েছে। ফলে অপরাধী চক্রগুলোর পক্ষে প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করা পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন হচ্ছে।
এশিয়ার বাইরে উন্নত দেশগুলোতেও মেথামফেটামিন পাচার বাড়ছে। এসব বাজারে তুলনামূলক বেশি বিশুদ্ধতার মাদক সরবরাহের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
গত জুলাইয়ে জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ফুকুওকা বিমানবন্দরে থাইল্যান্ডের এক নারীর লাগেজ থেকে প্রায় ৯০০ গ্রাম স্ফটিকজাত মেথামফেটামিন উদ্ধার করেন কর্মকর্তারা।
জাপানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিমানযাত্রীদের মাধ্যমে উদ্দীপকজাতীয় মাদক পাচারের ৭৩টি ঘটনা শনাক্ত হয়। আগের বছরের তুলনায় এ সংখ্যা ২২ শতাংশ বেশি। একই সময়ে জব্দ করা মাদকের পরিমাণ ৯৩ শতাংশ বেড়ে ৬৬৪ কিলোগ্রামে দাঁড়ায়।
চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক আপিনুন আরামরাত্তানা জানান, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চ বিশুদ্ধতার স্ফটিকজাত মেথামফেটামিন বেশি প্রচলিত। এসব দেশে মাদকটি তুলনামূলক বেশি দামে বিক্রি হয়। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে মাদক পাচার ও অবৈধ উৎপাদন আরও বাড়তে পারে।
সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি মিয়ানমার ও থাইল্যান্ডের
মাদক পাচার মোকাবিলায় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে মিয়ানমার ও থাইল্যান্ড। গত আগস্টের শুরুতে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং এবং থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী আনুতিন চার্নভিরাকুল মাদকদ্রব্য ও সংশ্লিষ্ট রাসায়নিক উপাদানের প্রতিরোধ এবং দমন কার্যক্রমে সহযোগিতা বাড়ানোর অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তবে সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত অপরাধী নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক সংঘাত এবং রাসায়নিক উপাদানের বিকল্প ব্যবহারের সুযোগের কারণে মাদক নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।
ফেন্টানিলের মতো সংকটের আশঙ্কা
যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে ফেন্টানিল নামের কৃত্রিম ওপিওয়েড মাদককে কেন্দ্র করে বড় ধরনের মাদকসংকট রয়েছে। মাদকটি তৈরিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক উপাদান সরবরাহে চীনের কথিত ভূমিকার অভিযোগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দেশটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাও আরোপ করেছে।
মেথামফেটামিন এখনো ফেন্টানিলের মতো একই মাত্রার সংকট তৈরি করেনি। তবে সীমান্ত অতিক্রম করে মাদক পাচারের নেটওয়ার্ক দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছেন চুলালংকর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক সায়ামল চারোয়েনরাতানা।
তাঁর মতে, মাদক পাচার অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে এটি আরও বড় আন্তর্জাতিক সমস্যায় পরিণত হতে পারে।
এশিয়ায় মেথামফেটামিনের ক্রমবর্ধমান উৎপাদন, কম দাম এবং বিস্তৃত পাচারব্যবস্থা মোকাবিলায় শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট হবে না। সীমান্তবর্তী দেশগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ, রাসায়নিক উপাদানের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ এবং মাদকাসক্তি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।












