এশিয়ার অর্থনীতি জ্বালানি সরবরাহে সংকট ও জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের চাপ সামলেও প্রবৃদ্ধির ধারায় রয়েছে। তবে এই সাফল্য পুরো অঞ্চলে সমানভাবে ছড়িয়ে পড়ছে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির উত্থান, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতা—এই তিন ক্ষেত্রে দেশগুলোর মধ্যে ব্যবধান বাড়ছে। ফলে এশিয়ার কিছু অর্থনীতি নতুন প্রবৃদ্ধির সুযোগ কাজে লাগালেও অন্য দেশগুলো পিছিয়ে পড়ছে।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে সপ্তাহব্যাপী বৈঠক শেষে রোববার (১৮ অক্টোবর) শেষ হওয়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হতে পারে। ২০২৭ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংস্থাটি আগের বসন্তকালীন পূর্বাভাসের তুলনায় ০ দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বাড়িয়েছে।
এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চলতি বছর ৪ দশমিক ৮ শতাংশ এবং আগামী বছর ৪ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। আগের পূর্বাভাসের তুলনায় এই হার যথাক্রমে ০ দশমিক ৪ ও ০ দশমিক ১ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগের ব্যাপক বৃদ্ধি এবং জ্বালানির উচ্চমূল্যের মধ্যে পরিবারগুলোকে সহায়তা দিতে বিভিন্ন সরকারের আর্থিক সক্ষমতা অর্থনীতিকে ধাক্কা সামলাতে সাহায্য করেছে। তবে সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানের আড়ালে দেশভেদে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে।
আইএমএফের উপপরিচালক নাদা চৌয়েরি বলেন, এশিয়ার অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার পেছনে বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি ও সক্ষমতার ভিন্নতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ব্যাংককের সম্মেলনের আলোচনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং বেসরকারি পুঁজি পাওয়ার সুযোগ—এই তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে।
এআইয়ের সুবিধা পাচ্ছে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিগুলো
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো নির্মাণ, বিশেষ করে ডেটা সেন্টার স্থাপনের কারণে সেমিকন্ডাক্টর ও সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতির চাহিদা দ্রুত বেড়েছে। এতে এশিয়ার কয়েকটি দেশের রপ্তানি ও পুঁজিবাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, ভারত, জাপান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর এ প্রবণতার প্রধান সুবিধাভোগী। এসব দেশের প্রযুক্তি উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যবস্থার সঙ্গে এআই অবকাঠামোর সরাসরি সংযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, এআই প্রযুক্তির উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যেসব দেশের সংযোগ দুর্বল, তারা এই উত্থানের সুফল পাচ্ছে না। ভবিষ্যতেও তাদের পিছিয়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছেন আইএমএফের উপপরিচালক নাদা চৌয়েরি।
অর্থনৈতিক চাপের কারণে ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে আইএমএফ। ফিলিপাইন, মিয়ানমার, কম্বোডিয়া, বাংলাদেশ, ফিজি ও পাপুয়া নিউগিনির জন্য পূর্বাভাস কমানো হয়েছে।
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাও বলেছেন, অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের আড়ালে দেশগুলোর মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। এআই সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত অর্থনীতি এবং যুদ্ধের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নয়—এমন জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশগুলো তুলনামূলক ভালো করছে।
অন্যদিকে, নিম্ন আয়ের, দুর্বল অর্থনৈতিক ভিত্তির এবং সংঘাতকবলিত দেশগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুবিধা থেকে বঞ্চিত, তাদের পরিস্থিতি বেশি কঠিন।
জলবায়ু পরিবর্তনে বাড়ছে অর্থনৈতিক ঝুঁকি
ব্যাংককে আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন এর প্রায় দুই সপ্তাহ আগে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। বন্যার পাশাপাশি খরা এবং পানির ক্রমবর্ধমান সংকটও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।
এসব দুর্যোগ পণ্য উৎপাদন, সার উৎপাদন ও পরিবহনব্যবস্থাকে ব্যাহত করছে। ফলে কৃষি ও শিল্প খাতের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।
ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর এলি রেমোলোনা জুনিয়র সম্মেলনের এক আলোচনায় আগামী বছরের শুরুতে সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি একে ‘গডজিলা এল নিনো’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুপ্রক্রিয়া, যা বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। অতীতের এল নিনো পরিস্থিতিতে খাদ্য ও পণ্যের দাম বেড়েছে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে সতর্ক করেছে আইএমএফ। নিম্ন আয়ের দেশগুলো সাধারণত এসব ধাক্কায় বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আইএমএফের উপপরিচালক রূপা দত্তগুপ্ত বলেন, অবকাঠামো ধ্বংসের তাৎক্ষণিক ক্ষতির বাইরেও মানুষের প্রাণহানির মতো আরও গুরুতর পরিণতি রয়েছে। কোনো কোনো দেশে কৃষি উৎপাদন কমে যেতে পারে, আবার কোথাও জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে।
এ ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারের আর্থিক সুরক্ষা বাড়ানো, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামোতে বিনিয়োগ এবং জ্বালানির ব্যবহার দক্ষ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বেসরকারি সংস্থা গ্লোবাল এনার্জি অ্যালায়েন্স ফর পিপল অ্যান্ড প্ল্যানেটের প্রধান নির্বাহী উচং উম বলেন, চরম আবহাওয়ার ঘটনা ক্রমেই ঘন ঘন ঘটছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানো এবং এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি—দুই ক্ষেত্রেই সরকারগুলোকে আরও গুরুত্ব দিতে হচ্ছে।
তার মতে, আগে যেসব দুর্যোগকে শত বছরে একবার ঘটতে পারে বলে বিবেচনা করা হতো, এখন সেগুলোর মতো ঘটনা প্রায় প্রতিবছরই দেখা যাচ্ছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার উদ্যোগ আর পিছিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
তিনি আরও বলেন, প্রকল্পের নকশা ও পরিকল্পনায় এখন জলবায়ুজনিত দুর্যোগের ঝুঁকি বিবেচনা করা হচ্ছে, যাতে বড় সংকট দেখা দেওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
বেসরকারি বিনিয়োগে বড় ব্যবধান
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বেসরকারি পুঁজি আকর্ষণের সক্ষমতার পার্থক্যও সম্মেলনে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয় ছিল। সরকারের সীমিত বাজেট এবং অবকাঠামো খাতে বিপুল বিনিয়োগের চাহিদার কারণে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
মুডিস রেটিংসের প্রধান ঋণমান কর্মকর্তা আতসি শেথ বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সংগ্রহের প্রতিযোগিতা বেড়েছে। সরকারগুলোকে ঋণ নিতে হচ্ছে, এআই খাতে অবকাঠামো ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হচ্ছে। একই সঙ্গে জলবায়ু সহনশীলতা তৈরি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অবকাঠামো নির্মাণেও বিপুল পুঁজি দরকার।
তার মতে, এসব চাহিদার মধ্যে সাধারণ প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সংগ্রহ করা ভবিষ্যতে আরও কঠিন হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি বাজারবিষয়ক পরিচালক উফুক আকচিগিতের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ প্রায় ৩২ হাজার ৯০০ কোটি ডলার বেসরকারি পুঁজি সংগ্রহে ভূমিকা রেখেছে।
তবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের পাশাপাশি যে পরিমাণ বেসরকারি বিনিয়োগ আসার প্রত্যাশা রয়েছে, তাতে বড় পার্থক্য দেখা যায়। ভারতে এ ধরনের বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কম্বোডিয়া, ফিলিপাইন ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে এই অঙ্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
বিশ্বব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান জ্ঞান কর্মকর্তা পাসকাল ডোনোহো বলেন, অর্থায়নের ঘাটতি এখনো বড় সমস্যা। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের কৌশল, নীতি ও অংশীদারত্ব বিভাগের মহাপরিচালক সিনিং জিয়া বলেন, বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ থাকলেও সব দেশ সেই আগ্রহকে বাস্তব বিনিয়োগে রূপ দিতে পারে না।
তার মতে, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর অন্যতম দায়িত্ব হলো সম্ভাবনাকে বাস্তব বিনিয়োগের সুযোগে পরিণত করা। এ জন্য উপযুক্ত নীতি, আইনগত কাঠামো এবং কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন। বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে আগ্রহী নন।
দুর্বল অর্থনীতির দেশ এবং ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে শুরুতে বাজার গড়ে তুলতে উন্নয়ন ব্যাংকগুলোর সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সহজ শর্তের অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য কী বার্তা
এশিয়ার অর্থনৈতিক পরিস্থিতির এই চিত্র বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে এআই ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের বৈশ্বিক সম্প্রসারণ নতুন বাণিজ্যিক সুযোগ তৈরি করছে, অন্যদিকে প্রযুক্তির সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে দুর্বল সংযোগ, জলবায়ু ঝুঁকি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা প্রবৃদ্ধির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আইএমএফের ২০২৬ সালের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাসে বাংলাদেশের হার কমানো হয়েছে। তবে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য সংশোধিত প্রবৃদ্ধির নির্দিষ্ট হার উল্লেখ করা হয়নি।
দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ও রপ্তানির সুযোগ সম্প্রসারণ, জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো গড়ে তোলা এবং দেশি-বিদেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের পরিবেশ উন্নত করা গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, এশিয়ার অর্থনীতি সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল থাকলেও এই প্রবৃদ্ধির সুফল সব দেশে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে না। এআই প্রযুক্তির সঙ্গে সংযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার প্রস্তুতি এবং দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সংগ্রহের সক্ষমতাই আগামী দিনে দেশগুলোর অর্থনৈতিক অগ্রগতির ব্যবধান নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।












