সারাক্ষণ রিপোর্ট: চড়া অপরিশোধিত তেলের দাম এবং বড় দুই বেসরকারি ব্যাংকের ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফল ঘিরে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ভারতের শেয়ারবাজার। গত সপ্তাহে শক্তিশালী উত্থানের পর সোমবার, ১৯ অক্টোবর, বাজারের লেনদেনের শুরুতে বড় সূচকগুলোতে খুব সামান্য পরিবর্তন দেখা গেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন ব্যাংকগুলোর আয়ের হিসাব, তেলের দামের গতিপ্রকৃতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছেন।
সকালের লেনদেনের প্রাথমিক হিসাবে, নিফটি ৫০ সূচক শূন্য দশমিক শূন্য দুই শতাংশ কমে ২৩ হাজার ১৪০ দশমিক ৫ পয়েন্টে নেমে আসে। অন্যদিকে, বিএসই সেনসেক্স সূচক শূন্য দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৭৪ হাজার ৬৯১ দশমিক ৩৮ পয়েন্টে। তবে বাজারের সব খাতে একই ধরনের চাপ দেখা যায়নি। প্রধান ১৬টি খাতের মধ্যে ১১টিতে সূচকের উন্নতি হলেও ছোট ও মাঝারি মূলধনি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে সামান্য দুর্বলতা ছিল।
গত সপ্তাহের উত্থানের পর কেন সতর্ক বিনিয়োগকারীরা
গত সপ্তাহে ভারতের দুই প্রধান শেয়ারসূচক প্রায় ৩ শতাংশ বেড়েছিল। এটি ছিল প্রায় ছয় মাসের মধ্যে তাদের অন্যতম শক্তিশালী সাপ্তাহিক উত্থান। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশার চেয়ে ভালো আর্থিক ফলাফল বাজারে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। পাশাপাশি, বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিক্রির চাপ তৈরি হওয়ায় কিছু বিনিয়োগকারী তুলনামূলক কম দামে অন্য খাতের শেয়ার কেনার সুযোগ খুঁজেছেন।

তবে সাম্প্রতিক উত্থানের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কি না, তা নিয়ে এখনই নিশ্চিত হতে পারছেন না বিনিয়োগকারীরা। ব্যাংকগুলোর আর্থিক ফলাফল এবং জ্বালানি তেলের উচ্চ দাম বাজারের পরবর্তী গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
দুই বড় ব্যাংকের আর্থিক ফলে ভিন্ন চিত্র
বেসরকারি খাতের বড় ব্যাংক এইচডিএফসি ব্যাংকের দ্বিতীয় প্রান্তিকের মুনাফা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা কম হয়েছে। ঋণ বিতরণে ভালো প্রবৃদ্ধি থাকা সত্ত্বেও বিনিয়োগ ও সরকারি সিকিউরিটিজ থেকে আয় কমে যাওয়া এবং অনাদায়ী ঋণের সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় বেশি অর্থ সংরক্ষণের কারণে মুনাফায় চাপ পড়ে।
অন্যদিকে, আইসিআইসিআই ব্যাংকের ফলাফল ছিল তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক। ঋণ বিতরণে প্রবৃদ্ধি এবং অনাদায়ী ঋণের বিপরীতে সংরক্ষিত অর্থের পরিমাণ কমে আসায় প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে যায়।
দুটি ব্যাংকই নিফটি ৫০ সূচকের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে তাদের আর্থিক ফলাফলের পর শেয়ারের দামে কী ধরনের পরিবর্তন আসে, তা পুরো বাজারের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। ভালো ফলাফলের কারণে ব্যাংক খাতে কেনাকাটা বাড়লে বাজারে ইতিবাচক সমর্থন তৈরি হতে পারে। বিপরীতে, দুর্বল ফলাফল বিনিয়োগকারীদের সতর্কতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলারের কাছাকাছি তেলের দাম
ভারতের শেয়ারবাজারের জন্য আরেকটি বড় উদ্বেগের বিষয় অপরিশোধিত তেলের উচ্চ দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০৮ ডলারের কাছাকাছি রয়েছে। এর আগে দাম ১১০ ডলারের স্তরেও পৌঁছেছিল।
ভারত জ্বালানি তেলের বড় আমদানিকারক দেশ। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে তেলের দাম বেশি থাকলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে, মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি মুনাফার ওপরও চাপ পড়তে পারে।

রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা তেলের বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনা এবং সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে তেলের দাম দ্রুত কমে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এখন কোন বিষয়গুলো বাজারের গতিপথ নির্ধারণ করবে
আগামী দিনগুলোতে ভারতের শেয়ারবাজারের জন্য ব্যাংক ও অন্যান্য বড় প্রতিষ্ঠানের ত্রৈমাসিক আর্থিক ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে ঋণের প্রবৃদ্ধি, মুনাফার মান, অনাদায়ী ঋণের ঝুঁকি এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলবে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের ওঠানামা এবং বিদেশি বিনিয়োগের প্রবাহও পর্যবেক্ষণে থাকবে। গত শুক্রবার ১৫টি ধারাবাহিক লেনদেন-পর্বের পর বিদেশি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারবাজারে নিট ক্রেতা হয়েছিলেন। তবে শুধু এক দিনের কেনাকাটা দিয়ে বাজারে স্থায়ী ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, গত সপ্তাহের উত্থান ভারতীয় শেয়ারবাজারে আশাবাদ তৈরি করলেও ব্যাংকের মিশ্র ফলাফল এবং চড়া তেলের দাম সেই আশাবাদের সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। আগামী দিনের বাজারে বিনিয়োগকারীরা কতটা আস্থা ফিরে পান, তা নির্ভর করবে আর্থিক ফলাফল, জ্বালানি বাজার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
সংক্ষিপ্ত বিবরণ: চড়া তেলের দাম ও দুই বড় ব্যাংকের মিশ্র আর্থিক ফলে সতর্ক ভারতের শেয়ারবাজার। জানুন নিফটি, সেনসেক্স ও বিনিয়োগকারীদের পরবর্তী হিসাব।












