ইউরোপের দেশ ইতালিতে বৈধভাবে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে ৪৬ লাখ টাকা নেওয়ার পর মানব পাচারকারীদের নির্যাতনের শিকার হয়ে লাটভিয়ায় মারা গেছেন ঝিনাইদহের ৪৫ বছর বয়সী সোহেল রানা। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় দেশটির একটি বন থেকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধে গঠিত ট্রাইব্যুনালে নয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তাঁর স্ত্রী জেসমিন সুলতানা।
সোহেল ঝিনাইদহ সদর উপজেলার হলিধানী ইউনিয়নের আবুল হাশেমের ছেলে। পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ অক্টোবর লাটভিয়ার লাটগালে অঞ্চলের দৌগাভপিলস শহরের একটি হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সোহেলকে বৈধভাবে ইতালি পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রথমে ২৬ লাখ টাকা নেন। এরপর ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল তাঁকে কাতারে পাঠানো হয়। ৯০ দিনের মধ্যে ইতালি পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও তাঁকে কোনো কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন তাঁর স্ত্রী।
পরে দেশে ফেরার জন্য টিকিট পাঠানো হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাঁকে ফিরতে বাধা দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় ইতালিতে পাঠানোর কথা বলে আরও পাঁচ লাখ টাকা দাবি করা হয়। টাকা নেওয়ার পর মিসরের মাধ্যমে ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে ২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট তাঁকে মিসরে পাঠানো হয়।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত ২৫ আগস্ট সোহেলের ফোন ব্যবহার করে পরিবারের কাছে ২০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। এরপর ৯ অক্টোবর আরও সাড়ে চার লাখ টাকা চাওয়া হয়। সোহেলের জীবন বাঁচানোর আশায় তাঁর পরিবার পাঁচ দফায় টাকা পাঠায় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
গত ১২ অক্টোবর লাটভিয়ার পুলিশ বার্তার মাধ্যমে পরিবারকে জানায়, ৭ অক্টোবর একটি বন থেকে সোহেলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। পরদিন, অর্থাৎ ৮ অক্টোবর, চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
সোহেলের ভগ্নিপতি ইশতিয়াক আহমেদ জানান, বৈধভাবে ইতালি পাঠানোর কথা বলে তাঁকে বিদেশে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রায় দেড় বছর ধরে তাঁকে বিভিন্ন দেশে ঘোরানো হয়। পরে লাটভিয়া ও বেলারুশ সীমান্তের কাছাকাছি একটি বনে তাঁকে নির্যাতনের পর ফেলে রাখা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।
ইশতিয়াক আরও জানান, পরে পোল্যান্ডে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে পরিবার জানতে পারে, লাটভিয়ার সীমান্তরক্ষীরা অসুস্থ অবস্থায় সোহেলকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন।
মামলায় যাঁদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন শামসুন্নাহার, তাঁর স্বামী শাহজাহান সরকার, তাঁদের দুই ছেলে ইতালিপ্রবাসী সোহাগ ও কাতারপ্রবাসী নাসির সরকার। এ ছাড়া আবুল কালাম সরকারের ছেলে সোহেল রানা, শাহজাহানের জামাতা আবদুর রাজ্জাক, সোহাগের স্ত্রী টনি সরকার, মিসরপ্রবাসী রিয়াদ দেওয়ান এবং রামচন্দ্রপুর গ্রামের শরিফুল সরকার রয়েছেন। মামলার অভিযোগ এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, একই চক্র অন্তত ১২ জনকে বিভিন্ন দেশে নিয়ে গেছে। ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাঁদের কাছ থেকে কয়েক কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, গড়ামারা গ্রামের রিপন মিয়া, রামচন্দ্রপুর গ্রামের হামেদ আলী এবং প্রয়াত তাইজেল মাস্টারের ছেলে জগত আলী প্রায় ১২ বছর ধরে নিখোঁজ। তাঁদের পরিবারও সন্দেহ করছে, তাঁরা ওই কথিত পাচারচক্রের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
হলিধানী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, রামচন্দ্রপুরসহ ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকার অন্তত ১৫ জনের কাছ থেকে ইতালিতে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এখন বিভিন্ন দেশে আটকে আছেন, কিন্তু কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেননি।
হলিধানী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এনামুল হক নিলু জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি সোহেলের মৃত্যুর খবর জেনেছেন। বন থেকে উদ্ধারের পর বিদেশের হাসপাতালে তাঁর মৃত্যুর ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন জানান, মঙ্গলবার পর্যন্ত পুলিশ সদর দপ্তর বা বিদেশি কোনো দূতাবাস থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি। তথ্য পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।












