পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের কেন্দ্রস্থলে আবাসন সংকট ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে গড়ে তোলা শিবির উচ্ছেদ করেছে পুলিশ। রোববার (২৫ অক্টোবর) ভোরে পরিচালিত অভিযানে বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হন পুলিশ সদস্যরা এবং কয়েকজনকে আটক করা হয়। এ সময় সামান্য আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেলেও আহতের সঠিক সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপের অন্যতম তীব্র আবাসনসংকটের মুখে রয়েছে পর্তুগাল। দেশটিতে বাড়ির দাম ও ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে তরুণদের, আবাসন কেনা বা ভাড়া নিয়ে বসবাস করা কঠিন হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে শনিবার হাজারো মানুষ লিসবনের একটি প্রধান সড়ক ধরে মিছিল করেন। পরে বিক্ষোভকারীরা শহরের রসিও স্কয়ারে শতাধিক তাঁবু স্থাপন করেন।
গভীর রাতে শিবিরে পুলিশের অভিযান
রোববার রাত ২টার কিছু পর কয়েক ডজন পুলিশ সদস্য রসিও স্কয়ারের শিবিরে অভিযান চালান। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে পুলিশ কুকুরও ছিল। এর আগে বিক্ষোভকারীদের তাঁবু সরিয়ে নিতে বলা হয়েছিল। নির্দেশ না মানলে তাঁবু ভেঙে ফেলার পাশাপাশি প্রতিরোধকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের নির্দেশ অমান্যের অভিযোগ আনার হুঁশিয়ারিও দেওয়া হয়।
পুলিশ শিবির উচ্ছেদ করতে গেলে সেখানে অবস্থানরত বিক্ষোভকারীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। অভিযান চলাকালে কয়েকজনকে আটক করা হয় এবং সামান্য আহত হওয়ার খবর আসে। তবে আটক ব্যক্তিদের সংখ্যা ও আহতদের বিস্তারিত পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি।
এর আগে মঙ্গলবার একই এলাকায় আরেকটি প্রতিবাদী শিবির উচ্ছেদ করেছিল পুলিশ। শনিবারের মিছিলের পর নতুন করে তাঁবু স্থাপনের ঘটনায় আবারও অভিযান চালানো হয়। শিবির রক্ষায় পুলিশের পদক্ষেপের সময় সেখানে শত শত মানুষ জড়ো হয়েছিলেন।
পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনা
বামপন্থি ব্লকের আইনপ্রণেতা ফাবিয়ান ফিগেইরেদো পুলিশের অভিযানকে ‘সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্য, সেখানে জনশৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা না ঘটলেও শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান নেওয়া মানুষের বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্যের অভিযান চালানো অযৌক্তিক।
তিনি শিবিরে উপস্থিত থেকেই পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনা করেন। তবে পুলিশ কেন ওই সময় অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদনে কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য উল্লেখ করা হয়নি।
বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, আবাসন ভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় পরিবারগুলোর ওপর আর্থিক চাপ ক্রমেই বাড়ছে। আবাসন এখন দেশটিতে জনঅসন্তোষের অন্যতম বড় কারণ হয়ে উঠেছে।
বাড়ির দাম দ্বিগুণ, ঘাটতি তিন লাখ
পর্তুগালে ২০১৭ সালের পর থেকে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। নতুন চুক্তিতে ভাড়ার পরিমাণও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে বিশেষ করে তরুণদের জন্য বাসস্থান নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
পর্তুগালের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায় তিন লাখ বাড়ির ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির পরিমাণ লিসবন শহরের মোট আবাসনসংখ্যার সমান।
২১ বছর বয়সী মাল্টিমিডিয়া যোগাযোগবিদ্যার শিক্ষার্থী ভিতর গোমেস বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বলেন, আবাসন নিয়ে জল্পনামূলক বিনিয়োগ, সম্পদের কেন্দ্রীভবন ও বৈষম্য বৃদ্ধি ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তাঁকে হতাশ করে তুলছে। তবে নিজের বিশ্বাসের পক্ষে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও উচ্ছেদ আইন নিয়ে বিরোধ
বিক্ষোভকারীদের অন্যতম দাবি, ভাড়াটেদের উচ্ছেদ সহজ করা এবং নতুন ভাড়ার চুক্তিতে ভাড়া নিয়ন্ত্রণ তুলে দেওয়ার প্রস্তাবিত বিল বাতিল করতে হবে। বিলটি পর্তুগালের পার্লামেন্টে প্রথম দফার পাঠে অনুমোদন পেয়েছে। উগ্র ডানপন্থি চেগা দল ভোটাভুটিতে বিরত ছিল।
আবাসনসংকট নিয়ে পর্তুগালের এই প্রতিবাদ ইউরোপের অন্যান্য দেশেও চলমান বিক্ষোভের ধারাবাহিকতার অংশ। এর আগে বেলজিয়াম, ফ্রান্স, ইতালি ও স্পেনেও একই ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে।
লিসবনে শিবির উচ্ছেদের মধ্য দিয়ে আবাসনসংকট নিয়ে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পদক্ষেপ ঘিরে বিতর্ক আরও সামনে এসেছে।












