ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা বন্ধ, হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল পুনরায় চালু এবং ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি সহিংসতা অবসানের আহ্বান জানিয়েছে চার দেশের জোট ‘আর-৪ গোষ্ঠী’। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাতের সমাধানে সংলাপ ও কূটনীতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে জোটটি। তাদের মতে, আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকলে নিরাপত্তার পাশাপাশি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহও গুরুতর ঝুঁকিতে পড়বে।
কোয়াড্রিল্যাটারাল মেকানিজম নামে পরিচিত এই গোষ্ঠীর চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন ও সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে এর আগে গত সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্কে আলোচনা করেছিলেন। সম্প্রতি ইস্তাম্বুলে বৈঠকে তাঁরা মধ্যপ্রাচ্যের সংকটগুলো নিয়ে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন।
হুতিদের হামলা বন্ধের আহ্বান
ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক তৎপরতাকে ‘অগ্রহণযোগ্য উত্তেজনা বৃদ্ধি’ হিসেবে বর্ণনা করে এর কঠোর নিন্দা জানিয়েছেন চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। তাঁদের মতে, এসব কর্মকাণ্ডে দেশটির মানবিক দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
সৌদি আরবে অব্যাহত হামলার নিন্দা জানিয়ে তাঁরা বিশেষভাবে বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে চালানো আক্রমণের বিষয়টি তুলে ধরেন। লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলারও নিন্দা জানায় জোটটি।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ইয়েমেনের সরকার ও সৌদি আরবের প্রতি পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে হুতিদের সব ধরনের সামরিক অভিযান, হুমকি ও হামলা অবিলম্বে বন্ধ করে আন্তরিকভাবে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এর আগে ১৮ অক্টোবর মিসরের জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদ আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি সৌদি আরবকে সমর্থনের অঙ্গীকার করেছিল।
হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল চায় জোট
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানকে ঘিরে সংঘাতের বিষয়ে আর-৪ গোষ্ঠী বলেছে, এর সমাধান হতে হবে সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমেই। বেসামরিক নাগরিক, অবকাঠামো এবং জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দিয়েছেন মন্ত্রীরা।
তাঁরা ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন। পাশাপাশি সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো এবং আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সমঝোতা স্মারকে সংঘাত বন্ধ, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি নিয়ে আলোচনার একটি প্রাথমিক কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল।
আর-৪ গোষ্ঠী এমন যেকোনো পদক্ষেপ বা বিধিনিষেধের বিরোধিতা করেছে, যা আন্তর্জাতিক আইনসম্মত নৌ চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে। তাদের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে দ্রুত ও সম্পূর্ণভাবে নিরাপদ, সুরক্ষিত এবং নির্বিঘ্ন নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে।
মন্ত্রীরা সতর্ক করে বলেছেন, সমুদ্রপথে চলাচল ব্যাহত হলে সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং জ্বালানি, সার ও খাদ্যের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এর প্রভাব আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং সমৃদ্ধির ওপর পড়ে, বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আরও সংকটে ফেলে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তাঁরা আন্তর্জাতিকভাবে সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন।
ফিলিস্তিনে সহিংসতা বন্ধ ও দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের দাবি
ফিলিস্তিন প্রশ্নে আর-৪ গোষ্ঠী ইসরায়েলি দখলদারত্বকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বৃহত্তর অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার ‘মৌলিক উৎস’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। তাদের বক্তব্য, ইসরায়েলের নীতিগুলো বিশ্বজুড়ে জনমনে গভীর অবিচারের অনুভূতি তৈরি করেছে।
জাতিসংঘের প্রাসঙ্গিক প্রস্তাব অনুযায়ী দ্বিরাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে জোটটি। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং ১৯৬৭ সালের ৪ জুনের সীমারেখা অনুযায়ী পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী করে একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, কার্যকর ও ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান জানিয়েছে।
মন্ত্রীরা ফিলিস্তিনে চলমান ইসরায়েলি সহিংসতা অবিলম্বে বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন। জেরুজালেমের আইনি ও ঐতিহাসিক অবস্থান পরিবর্তনের প্রচেষ্টারও নিন্দা করেছেন তাঁরা। পশ্চিম তীর ও জেরুজালেমে অতীত ও বর্তমানের ইসরায়েলি বসতি স্থাপন কার্যক্রম এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার বিরুদ্ধেও অবস্থান নিয়েছে গোষ্ঠীটি।
গাজায় নিরবচ্ছিন্ন মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং অঞ্চলটির পুনর্গঠনও জরুরি বলে উল্লেখ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। মিসর চলতি মাসের শুরুতে জানিয়েছিল, গাজা পরিকল্পনায় প্রতিদিন ৬০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা এখনো পূরণ হয়নি। ক্লিনিক ও স্কুল পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতিও বাস্তবায়িত হয়নি।
ইস্তাম্বুলের বৈঠকে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে আর-৪ গোষ্ঠীর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ঘনিষ্ঠ পরামর্শ ও সমন্বয় অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন। জাতিসংঘ সনদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় কাজ করার প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেন তাঁরা।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত প্রশমন, আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রশ্নগুলোকে একই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবে দেখছে জোটটি।
আর-৪ গোষ্ঠীর আহ্বান: হরমুজ প্রণালিতে নিরাপদ নৌ চলাচল, ইয়েমেনে হুতিদের হামলা বন্ধ এবং ফিলিস্তিনে ইসরায়েলি সহিংসতার অবসান।












