মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পুনরায় কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে থাইল্যান্ড। দেশটিকে আন্তর্জাতিকভাবে বিচ্ছিন্ন না রেখে শান্তিপূর্ণভাবে সংঘাত নিরসন ও বিরোধী পক্ষের সঙ্গে সমঝোতার পথ খুঁজে বের করার পক্ষে ব্যাংকক। একই সঙ্গে আগামী নভেম্বরে ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোট আসিয়ানের শীর্ষ সম্মেলনে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আশা করছে থাইল্যান্ড।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ অবস্থান তুলে ধরেন থাইল্যান্ডের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেতকেও। তাঁর মতে, মিয়ানমারকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা কিংবা দেশটিকে বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্র হতে দেওয়া উচিত নয়।
মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগে সমর্থন
২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শীতল হয়ে পড়ে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ওয়াশিংটন আবার যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে দুই সপ্তাহ আগে টোকিওতে যুক্তরাষ্ট্র ও মিয়ানমারের সামরিক-সমর্থিত সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হয়। এক মাসের মধ্যে এটি ছিল দুই পক্ষের দ্বিতীয় বৈঠক।
সিহাসাক বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই উদ্যোগকে থাইল্যান্ড ইতিবাচকভাবে দেখছে। তবে যোগাযোগ বাড়ানোর অর্থ মিয়ানমারের বর্তমান শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া নয়। বরং এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত শান্তিপূর্ণভাবে সংঘাতের অবসান ঘটানো এবং বিরোধী পক্ষগুলোর সঙ্গে সমঝোতার সুযোগ তৈরি করা।
আসিয়ানের অবস্থানে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারের সামরিক নেতৃত্বকে আসিয়ানের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পূর্ণ প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তবে সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা জোটটির অবস্থানে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করেন থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
তিনি উল্লেখ করেন, মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং সম্প্রতি লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়া সফর করেছেন। এসব যোগাযোগের মধ্য দিয়ে আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্কের নতুন গতিশীলতা তৈরি হয়েছে।
তবে নভেম্বরে ম্যানিলায় অনুষ্ঠিতব্য আসিয়ান সম্মেলনে মিয়ানমারকে আবার পূর্ণ প্রতিনিধিত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় আসবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। সিহাসাক বলেন, মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে সম্মেলনে বিস্তৃত ও গভীর আলোচনা হবে বলে তিনি আশা করছেন।
থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া সীমান্ত বিরোধ সমাধানের আশা
সাক্ষাৎকারে থাইল্যান্ড ও কম্বোডিয়ার দীর্ঘদিনের স্থল ও সমুদ্রসীমা বিরোধের বিষয়েও কথা বলেন সিহাসাক। তাঁর আশা, দুই দেশ আগামী ১২ থেকে ১৮ মাসের মধ্যে বিরোধগুলোর সমাধানে পৌঁছাতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে অগ্রগতি সীমিত বলে স্বীকার করেন তিনি।
সিহাসাকের মতে, সমাধানের আগে স্থলসীমান্তে আস্থা তৈরি এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগ দূর করা জরুরি। অতীতে ওই সীমান্তে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।
সমুদ্রসীমা বিরোধ নিরসনে জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশনের আওতায় গত জুনে সমঝোতা প্রক্রিয়া শুরু করে কম্বোডিয়া। এর আগে মে মাসে প্রাণঘাতী সীমান্ত সংঘর্ষের পর ২০০১ সালের যৌথ উন্নয়ন কাঠামো থেকে সরে দাঁড়ায় থাইল্যান্ড। প্রায় এক মাস আগে এ বিষয়ে প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
থাইল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি। থাইল্যান্ডের উপসাগরে প্রায় ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে দুই দেশের দাবি পরস্পরের সঙ্গে মিলে গেছে। এলাকাটিতে আনুমানিক ৩০০ বিলিয়ন ডলারের তেল ও গ্যাসের মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। থাইল্যান্ডের অবস্থান হলো, সম্পদ ভাগাভাগির আলোচনা শুরুর আগে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করতে হবে।
এদিকে থাইল্যান্ড ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে বছরের শেষ নাগাদ আলোচনা শেষ হতে পারে বলেও জানান সিহাসাক।
মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ, সীমান্ত বিরোধ এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক—এই তিন ক্ষেত্রেই আঞ্চলিক কূটনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে থাইল্যান্ড।
মিয়ানমারকে বিচ্ছিন্ন না রেখে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে এগোনোর পক্ষে থাইল্যান্ড। নভেম্বরে আসিয়ান সম্মেলনে দেশটির ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি কম্বোডিয়ার সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ সমাধানেও সময়সীমার আশা জানিয়েছেন থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী।












