যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাত্র ১০ দিন আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতার ব্যবহার এবং ইরাননীতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে নেমে তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের পাশাপাশি হোয়াইট হাউসের সংস্কারকাজ নিয়েও কটাক্ষ করেন।
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। বর্তমানে দুই দলের মধ্যে ব্যবধান কম থাকায় এই নির্বাচনকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। নির্বাচনে ভোটারদের কাছে ট্রাম্প নিজের উপস্থিতিকে অন্যতম প্রধান বিষয় হিসেবে তুলে ধরছেন। এর জবাবে ওবামাও নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পের শাসনামলকে সামনে এনে ভোটারদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের ক্লিভল্যান্ড ও মিশিগানের ডেট্রয়েটে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের পক্ষে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেন ওবামা। মিশিগানে ডেমোক্র্যাটদের সিনেট প্রার্থী আবদুল এল-সায়েদের পক্ষে প্রচারে তিনি ৩ নভেম্বরের ভোটকে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকাণ্ডে লাগাম টানার সুযোগ হিসেবে বর্ণনা করেন।
ওবামা বলেন, এই নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি করতে হবে। তাঁর ভাষায়, ভোটের ফলাফল এমন একটি ‘সার্কিট ব্রেকার’ বা নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা হিসেবে কাজ করতে পারে, যা ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির কিছু অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড থামাতে সাহায্য করবে।
২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন ওবামা। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এখনো তাঁর জনপ্রিয়তা রয়েছে। তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনগুলোতে দলের সমর্থকদের সক্রিয় করতে তাঁর প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দিচ্ছে ডেমোক্র্যাটরা।
মিশিগানে সিনেট নির্বাচনে আবদুল এল-সায়েদের প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স। তিনি আগে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ছিলেন। এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ওবামা রিপাবলিকানদের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করার অভিযোগ তোলেন।
দুর্নীতি ও ব্যক্তিগত স্বার্থে ক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগ
সমাবেশে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ক্ষমতা ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ করেন ওবামা। তিনি বলেন, মার্কিন জনগণের অর্থ ও স্বার্থকে উপেক্ষা করে ব্যক্তিগত লাভের সুযোগ তৈরির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের মতো প্রেসিডেন্ট আগে দেখা যায়নি। তাঁর অভিযোগ, সুবিধা বিক্রি এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে সরকারি ক্ষমতা ব্যবহারের প্রবণতা ট্রাম্প প্রশাসনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ওবামার মতে, রিপাবলিকান পার্টিও এখন দুর্নীতিগ্রস্ত, অদক্ষ অথবা কার্যকরভাবে সরকার পরিচালনায় অনিচ্ছুক প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে। তবে এসব বক্তব্য ছিল ট্রাম্প প্রশাসন ও রিপাবলিকান পার্টির বিরুদ্ধে ওবামার রাজনৈতিক সমালোচনা।
আগস্টে প্রকাশিত রয়টার্স ও ইপসোসের এক জরিপেও ট্রাম্পের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থ নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের উদ্বেগের চিত্র উঠে আসে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৩ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন, ট্রাম্প গত বছর হোয়াইট হাউসে ফেরার পর তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড থেকে অনুচিতভাবে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ৬৯ শতাংশ মনে করেন, ট্রাম্পের নীতিগত সিদ্ধান্তে তাঁর ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রভাব ফেলছে।
তবে জরিপের ফলাফল নাগরিকদের ধারণা তুলে ধরে; এগুলো নিজে থেকে কোনো অনিয়মের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
ইরাননীতি নিয়ে প্রশ্ন তুললেন ওবামা
ট্রাম্প প্রশাসনের ইরাননীতি নিয়েও সমালোচনা করেন সাবেক এই প্রেসিডেন্ট। ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্র বিজয়ের দাবি করলেও ওবামার মতে, সংঘাতটি উল্টো তেহরানের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে হামলার হুমকি দিয়ে ইরান তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিশ্ববাজারে তেল পরিবহনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথের ওপর ইরানের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ওবামা বলেন, এখন হরমুজ প্রণালিতে তেল পরিবহনের ক্ষেত্রে ইরান কার্যত ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছে।
তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, সামরিক সংঘাতের ফলাফল কেবল যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্য দিয়ে বিচার করা যায় না। এর অর্থনৈতিক প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ওপরও নজর দেওয়া জরুরি।
হোয়াইট হাউসের সংস্কার নিয়েও কটাক্ষ
ট্রাম্প প্রশাসনের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে গিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকেও কটাক্ষ করেন ওবামা। সেনাসদস্যদের চোয়ালের গঠন ও টেস্টোস্টেরনের মাত্রার মতো বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরার প্রবণতা নিয়ে তিনি বিদ্রূপ করেন।
এ ছাড়া হোয়াইট হাউসের সংস্কারকাজের নকশা ও সাজসজ্জা নিয়েও ব্যঙ্গ করেন সাবেক প্রেসিডেন্ট। তাঁর মন্তব্য, হোয়াইট হাউসের বর্তমান সাজসজ্জা এমন হয়েছে, যেন ইরাকের সাবেক শাসক সাদ্দাম হোসেন একটি চিজকেক ফ্যাক্টরি রেস্তোরাঁ খুলেছেন।
এই মন্তব্যের মাধ্যমে ওবামা ট্রাম্প প্রশাসনের নান্দনিক পছন্দের পাশাপাশি সরকারের অগ্রাধিকার নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় হোয়াইট হাউস ওবামার বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।
আগামী ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে। ফলে ট্রাম্পের নীতির পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার, সরকারের জবাবদিহি এবং অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব ভোটারদের আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।












