রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলায় একটি গুদামে জমাট বাঁধা টিএসপি সার হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়া করার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর গুদামটি ঘিরে বিক্ষোভ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে প্রশাসনের উপস্থিতিতে গুদামের তালা খুলে ৫৫৩ বস্তা সার পাওয়া যায়। সারগুলো ব্যবহারের উপযোগী কি না, তা নিশ্চিত করতে রাসায়নিক পরীক্ষার উদ্যোগ নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। পাশাপাশি সারগুলো কীভাবে আনা হয়েছে এবং এর বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার বানেশ্বর ইউনিয়নের বালিয়াঘাটা সোনারপাড়া গ্রামের একটি বাড়িসংলগ্ন গুদামে। গত শনিবার, ২৪ অক্টোবর বিকালে স্থানীয় বাসিন্দারা গুদামটি ঘিরে রাখেন। খবর পেয়ে রাতে ঘটনাস্থলে যান পুঠিয়ার সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রসনজিৎ সাহা। তাঁর উপস্থিতিতে গুদামের তালা খোলা হলে ভেতরে ৫৫৩ বস্তা টিএসপি সার পাওয়া যায়।
রাসায়নিক পরীক্ষার উদ্যোগ
পুঠিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিয়াকত সালমান রোববার, ২৫ অক্টোবর বিকালে জানান, সারগুলোর কার্যকারিতা নির্ধারণে রাসায়নিক পরীক্ষা প্রয়োজন। পরীক্ষায় সেগুলো ব্যবহারের উপযোগী প্রমাণিত হলে কৃষকদের কাছে বিক্রি করে পাওয়া অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হবে। আর ব্যবহারের অনুপযোগী হলে সারগুলো ধ্বংস করা হবে।
ইতিমধ্যে সারের নমুনা পরীক্ষার জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৫৫৩ বস্তা সার স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের জিম্মায় রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্মৃতি রানী সরকার রোববার সকালে গুদামটি পরিদর্শন করেন। এ সময় সারের মালিক মাইনুল ইসলাম উপস্থিত ছিলেন। সারগুলোর প্রকৃত অবস্থা ও ব্যবহারের উপযোগিতা যাচাইয়ের পাশাপাশি সেগুলো আনার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম থেকে আনা হয় সার
উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, গত শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে সারগুলো আনা হয়। সেগুলোর মালিক মাইনুল ইসলাম। বানেশ্বর বাজারে তাঁর রহমান স্টোর নামে একটি মুদিদোকান রয়েছে। তিনি স্থানীয় মতিউর রহমানের কাছ থেকে গুদাম ভাড়া নিয়ে সেখানে সার রেখেছিলেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সার আনার পর থেকেই এলাকাবাসী গুদামটির ওপর নজর রাখছিলেন। জমাট বাঁধা সার হাতুড়ি দিয়ে গুঁড়া করার সময় কেউ একজন ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা গুদামটি ঘিরে বিক্ষোভ শুরু করেন।
ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে গুদামের সামনে স্থানীয় লোকজনের জড়ো হওয়ার দৃশ্য দেখা যায়। অন্য একটি ভিডিওতে ভেজা ও জমাট বাঁধা সার হাতুড়ি দিয়ে ভাঙতে দেখা যায়।
সার আনার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন
ঘটনাস্থলে গিয়ে সারের মালিককে না পেয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রসনজিৎ সাহা চলে যেতে চাইলে এক বাসিন্দা গুদামটি সিলগালা ও পাহারার ব্যবস্থা না করার বিষয়ে উদ্বেগ জানান। জবাবে প্রসনজিৎ সাহাকে বলতে শোনা যায়, অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই তাঁরা সেখানে গেছেন। মামলা হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গুদাম থেকে উদ্ধার করা একটি রসিদে ‘ডেলিভারি চালান, ভেজা/নষ্ট পণ্য’ লেখা রয়েছে। এতে এমভি মুনতাহা হোসেন নামের একটি লাইটার জাহাজ থেকে মি. ওসমানকে (আফসার) পণ্য সরবরাহের অনুমতির উল্লেখ আছে। রসিদটিতে সাল সা বিলা শিপিং লাইনসের অ্যাকাউন্টস অফিসার আবদুল কাদেরের স্বাক্ষর রয়েছে।
সারের মালিক মাইনুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে তাঁর বরাত দিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্মৃতি রানী সরকার জানান, মাইনুল কোনো সারের ডিলার নন। এসব সার আনার বিষয়ে কৃষি অফিসকেও জানানো হয়নি। পুকুর ও বাগানে ব্যবহারের জন্য সারগুলো আনা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন। তবে পুকুর ও বাগান কোথায়, তা জানতে চাইলে কোনো উত্তর দেননি।
সারের গুণগত মান, ব্যবহারের উপযোগিতা এবং আনার বৈধতা—সবকিছুই এখন যাচাই করছে প্রশাসন। রাসায়নিক পরীক্ষার ফল ও তদন্তের ভিত্তিতে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।












