একসময় বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম হ্রদ ছিল মধ্য এশিয়ার আরাল সাগর। কিন্তু মানুষের ভুল পরিকল্পনা ও অতিরিক্ত কৃষিকাজের কারণে কয়েক দশকের মধ্যে প্রায় মরুভূমিতে পরিণত হয় বিশাল এই জলভাগ। ১৯৬০-এর দশকে তুলা চাষ বাড়াতে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আরাল সাগরে পানি সরবরাহকারী নদীগুলোর গতিপথ পরিবর্তন করে। এরপর থেকেই দ্রুত শুকাতে শুরু করে সাগরটি। তবে দীর্ঘদিনের সেই পরিবেশগত বিপর্যয়ের মধ্যে এখন আশার আলো দেখা যাচ্ছে। কাজাখস্তানের উদ্যোগে উত্তর আরাল সাগরে আবার পানি বাড়ছে, ফিরছে মাছ এবং পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে স্থানীয় পরিবেশ।
আরাল সাগর একসময় কাজাখস্তান ও উজবেকিস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে ছিল। কিন্তু নদীর পানি কৃষিকাজে সরিয়ে নেওয়ায় সাগরটির আয়তন ক্রমাগত কমতে থাকে। একপর্যায়ে উন্মুক্ত হয়ে পড়ে এর বিশাল তলদেশ। সেখানে জমে থাকা সার, শিল্পবর্জ্য ও অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ বাতাসের সঙ্গে মিশে আশপাশের জনপদে ছড়িয়ে পড়ে। বিষাক্ত ধুলাবালু স্থানীয় মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বড় হুমকি হয়ে ওঠে।
এখন আরাল সাগরের জায়গায় মূলত দুটি ছোট জলভাগ টিকে আছে। দক্ষিণের অংশটি হ্রদের পুরোনো তলদেশের গভীর খাদে অবস্থান করছে। আশপাশের ভূগর্ভস্থ পানির প্রবাহের ওপর নির্ভর করে সেটি কোনোভাবে টিকে আছে। কিন্তু এই অংশের আয়তন বাড়ানোর সুযোগ খুবই সীমিত।
উত্তর আরাল সাগরের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে আলাদা। চারপাশের উঁচু ভূমি একে মরুভূমি থেকে অনেকটাই বিচ্ছিন্ন রেখেছে। কেবল ছোট কোকআরাল প্রণালি দিয়ে এর পানি বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। ২০০৫ সালে কাজাখস্তান সেখানে বাঁধ নির্মাণ করে পানি ধরে রাখার উদ্যোগ নেয়। তবে দীর্ঘদিন প্রত্যাশিত মাত্রায় পানি ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।

দুই দশক পর ঘুরে দাঁড়ানোর লক্ষণ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয়েছে। ২০২২ সালের পর থেকে উত্তর আরাল সাগরের পানির পরিমাণ প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। কাজাখস্তান সরকারের হিসাবে, এই উদ্যোগে প্রায় ৮৭০ বর্গকিলোমিটার মরুভূমি আবার জলভাগে পরিণত হয়েছে। একই সময়ে পানির লবণাক্ততাও ৭৫ শতাংশ কমেছে।
এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় অর্থনীতিতে। একসময় হারিয়ে যাওয়া মাছ আবার এই জলভাগে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। গত বছর স্থানীয় জেলেরা প্রায় ৮ হাজার টন মাছ ধরেছেন। মাছের এই প্রত্যাবর্তন শুধু পরিবেশের উন্নতির ইঙ্গিত নয়, স্থানীয় মানুষের জীবিকা ফিরে আসারও একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
কাজাখস্তান এখন কোকআরাল বাঁধের আরও উন্নয়ন করার পরিকল্পনা করছে। এর মাধ্যমে উত্তর আরাল সাগরে আরও পানি ধরে রাখার লক্ষ্য রয়েছে। ১৯৮৭ সালে উত্তর ও দক্ষিণ অংশ আলাদা হয়ে যাওয়ার পর হ্রদটিকে সর্বোচ্চ পানির স্তরে ফিরিয়ে নেওয়াই দেশটির পরিকল্পনা।
নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন
উত্তর আরালের পুনরুদ্ধারের পেছনে কয়েকটি বিষয় কাজ করছে। সির দরিয়া নদীর পানি প্রবাহ বাড়াতে খাল ও বাঁধের উন্নয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত ও পানির প্রবাহ প্রত্যাশার চেয়ে বেশি থাকায় হ্রদে পানি জমেছে।

আঞ্চলিক সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০২৫ সালে কাজাখস্তান উজানে অবস্থিত কিরগিজস্তান ও উজবেকিস্তানের সঙ্গে নতুন পানি বণ্টন চুক্তি করে। চুক্তি অনুযায়ী, কিরগিজস্তানকে বিদ্যুৎ সরবরাহের বিনিময়ে কাজাখস্তান বেশি পানি পাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এর ফলে নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পুনরুদ্ধারের পথে এখনো বড় বাধা
তবে উত্তর আরাল সাগরের এই অগ্রগতি এখনো নিশ্চিত সাফল্য নয়। কাজাখস্তানের অংশে নদীর প্রায় ৬০ শতাংশ পানি কৃষিকাজে ব্যবহার হয়। অথচ দেশটির এক-চতুর্থাংশেরও কম কৃষক পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। আধুনিক স্প্রিংকলার ও ফোঁটা ফোঁটা সেচব্যবস্থার ব্যবহার সীমিত থাকায় বিপুল পরিমাণ পানি অপচয় হচ্ছে।
পুরোনো সেচ অবকাঠামোর অবস্থাও ভালো নয়। অন্যদিকে সির দরিয়া নদীর পানির দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এই নদীর পানির বড় একটি উৎস পাহাড়ি হিমবাহ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেগুলো ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে গ্রীষ্মকালে পানির চাহিদা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই নদীর প্রবাহ কমে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।
তারপরও উত্তর আরাল সাগরের পুনরুদ্ধার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। মানুষের অপরিকল্পিত কর্মকাণ্ডে যে জলভাগ একসময় প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল, পরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সহযোগিতায় তার একটি অংশ আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। তবে এই অগ্রগতি ধরে রাখতে হলে কৃষিতে পানির অপচয় কমানো এবং নদীর দীর্ঘমেয়াদি প্রবাহ নিশ্চিত করা জরুরি।












