ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা লোহিত সাগরের প্রবেশপথ বাব এল মান্দেব প্রণালীর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ এবং মূল ভূখণ্ডের ধুবাব শহরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। ইয়েমেন সরকারের একাধিক সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী পেরিম দ্বীপ থেকে সরে যাওয়ার পর হুথিরা দ্বীপ ও এর বিপরীতে অবস্থিত লোহিত সাগর উপকূলীয় শহর ধুবাবের নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করে। চারজন ইয়েমেন সরকারি সূত্র এবং সৌদি সমর্থিত সরকারের দুটি সূত্র এই পশ্চাদপসরণ ও হুথিদের অগ্রগতির বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
কেন এই প্রণালী গুরুত্বপূর্ণ
হরমুজ প্রণালীর বিপরীত দিকে আরব উপদ্বীপে অবস্থিত বাব এল মান্দেব প্রণালীকে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই প্রণালীর ওপর হুথিরা পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে তাদের মিত্র ইরান একটি দ্বিতীয় বড় পরিবহন করিডোরে প্রভাব বিস্তারের কৌশলগত সুবিধা পাবে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান উত্তেজনায় তেহরানকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
তেল সরবরাহেও শঙ্কা
স্যাটেলাইট চিত্রে সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনের কাছাকাছি ধোঁয়া দেখা গেছে, যা এই গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রপ্তানি রুটে সম্ভাব্য ক্ষতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল করে, ফলে পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য অর্থনৈতিক ঝুঁকি
বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ লোহিত সাগর হয়ে পরিচালিত হয়। এই প্রণালীতে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জাহাজ চলাচলের খরচ ও বিমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি পেতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে আঞ্চলিক অর্থনীতিতেও। ইয়েমেনে বছরের পর বছর ধরে চলা এই সংঘাত এখন আন্তর্জাতিক শিপিং নিরাপত্তার এক নতুন সংকটবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সরকারি বাহিনীর পশ্চাদপসরণ
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী দীর্ঘদিন পেরিম দ্বীপ প্রতিরক্ষা করে এলেও সাম্প্রতিক সময়ে হুথিদের অগ্রগতির মুখে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। এই পশ্চাদপসরণ ইয়েমেনের বছরের পর বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধে ক্ষমতার ভারসাম্যে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষা
এখন পর্যন্ত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ বা প্রধান শক্তিধর দেশগুলোর পক্ষ থেকে এই সর্বশেষ অগ্রগতি নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হুথিদের পূর্ববর্তী হামলার ইতিহাস বিবেচনায় নিলে, আন্তর্জাতিক নৌ বাহিনীগুলো এই অঞ্চলে সতর্কতা আরও বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার সংযোগ
ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ এই অগ্রগতিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। হরমুজ প্রণালীতে ইতিমধ্যে বিরাজমান উত্তেজনার মধ্যে বাব এল মান্দেবেও একই ধরনের ঝুঁকি তৈরি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খলে দ্বিমুখী চাপ তৈরি হতে পারে, যার আঁচ পড়তে পারে আমদানিনির্ভর দক্ষিণ এশীয় অর্থনীতিগুলোতেও।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















