লাওস, মিয়ানমার আর থাইল্যান্ডের সীমান্ত ঘেঁষা পাহাড়ি বনাঞ্চল “গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল” একসময় ছিল বিশ্বের আফিম উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। মাদক ব্যবসায়ীরা একে বলতেন কালো সোনা, যা পরিশোধন করে তৈরি হতো হেরোইন। নব্বইয়ের দশকে বিশ্বের মোট আফিম পপি চাষের দুই-তৃতীয়াংশই ছিল এই অঞ্চলে। সরকারি অভিযান আর নানা পরিবর্তনের পর ২০০৬ সাল নাগাদ বিশ্বের অবৈধ আফিম উৎপাদনে এই অঞ্চলের অংশ নেমে আসে মাত্র ৫ শতাংশে।
তবে মিয়ানমারে সেই কালো সোনা আবার ফিরে এসেছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশটি আবারও বিশ্বের অবৈধ আফিমের প্রধান উৎস হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে পূর্বের শান রাজ্যে ব্যাপক হারে পপি চাষ হচ্ছে। আফগানিস্তানে তালেবান সরকার ২০২১ সালে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার পর পপি চাষে নিষেধাজ্ঞা জারি করায় বিশ্ববাজারে দাম বেড়েছে, যার সুবিধা পাচ্ছেন মিয়ানমারের চাষিরা।
তবে মূল কারণ মিয়ানমারের নিজস্ব সংকট। জাতিসংঘের কর্মকর্তা জেরেমি ডগলাসের ভাষায়, এটি মূলত দারিদ্র্যের সমস্যা। পাঁচ বছর আগে সেনা অভ্যুত্থানের পর শুরু হওয়া গৃহযুদ্ধে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন প্রায় ৫২ লাখ মানুষ, নিহত হয়েছেন হাজার হাজার। জনসংখ্যার অর্ধেকই এখন দরিদ্র, ২০১৭ সালের তুলনায় যা দ্বিগুণ। স্থানীয় কৃষকদের কাছে আফিম হয়ে উঠেছে টিকে থাকার প্রধান উপায়। গত বছর মিয়ানমারে পপি চাষের জমি বেড়েছে ১৭ শতাংশ, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ।
প্রতিবেশী দেশগুলো এতে উদ্বিগ্ন। ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম রাজ্য ঘেঁষা মিয়ানমারের চিন রাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে পপি চাষ। মণিপুরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বিরেন সিং ইতিমধ্যে সতর্ক করেছেন গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল ভারতের দিকে সরে আসার বিষয়ে। থাইল্যান্ডও উদ্বিগ্ন, কারণ দেশটির উন্নত সড়ক ব্যবহার করে মাদক পাচার হয়। থাই সীমান্ত শহরগুলোতে মাদক ব্যবহারের হার গত পাঁচ বছরে তিন গুণ বেড়েছে।
আগস্টে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং লাইং ব্যাংককে থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন, অভ্যুত্থানের পর যা প্রথম। দুই পক্ষ যৌথভাবে সমস্যা মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাতিসংঘের সহায়তায় থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ফসল বদলের কর্মসূচি চালানো হচ্ছে, যেখানে কৃষকদের পপির বদলে অন্য অর্থকরী ফসল, যেমন কফি চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে চ্যালেঞ্জ অনেক, কারণ পপি চাষ থেকে আয় কফির তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
সামরিক জান্তার আন্তরিকতা নিয়েও প্রশ্ন আছে, কারণ দীর্ঘদিন ধরেই তাদের বিরুদ্ধে আফিম বাণিজ্য থেকে লাভবান হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সীমান্ত এলাকার নিয়ন্ত্রণ বিভক্ত জান্তা আর বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে, যা সমস্যা সমাধানকে আরও জটিল করে তুলেছে। থাইল্যান্ডের নিজের পপি চাষ পুরোপুরি বন্ধ করতে সময় লেগেছিল প্রায় অর্ধশতাব্দী, আর তখন দেশটির ছিল শান্তি ও পর্যাপ্ত অর্থ, মিয়ানমারের কাছে যার কোনোটিই নেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















