ইংল্যান্ডের পরিবেশ ও দূষণ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার সাবেক এক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, বছরের পর বছর ধরে সংস্থাটি বিভিন্ন তদন্তে বাধা দিয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ গোপন করেছে।
জুলাই মাসে সাউদার্ন ওয়াটারের সাবেক প্রধান নির্বাহী ম্যাথিউ রাইটের বিরুদ্ধে পরিবেশ সংস্থা এবং পানি নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে প্রতারণার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়। ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছর ধরে পানির গুণমান পরীক্ষার ফলাফল কারসাজি করার অভিযোগে তাঁর সাবেক আরও তিন সহকর্মীর বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে।
২০০৯ সাল থেকে পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের পরিশোধিত বর্জ্যপানি নিজেরাই পরীক্ষা করে এর ফলাফল পরিবেশ সংস্থাকে জানাতে হয়। পরীক্ষায় দেখা গেলে যে নদী বা জলাশয়ে ফেলা বর্জ্যপানি পরিবেশগত অনুমতিতে নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করেছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে বড় অঙ্কের জরিমানা দিতে হয় এবং গ্রাহকদের জন্য সম্ভাব্য অর্থ ফেরতের ব্যবস্থাও হতে পারে।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, রাইটের নেতৃত্বে সাউদার্ন ওয়াটার বিভিন্ন স্থাপনা থেকে বর্জ্যপানি সরিয়ে নিতে ট্যাংকার ব্যবহার করত। এর ফলে পরীক্ষার সময় কৃত্রিমভাবে ‘প্রবাহহীন’ পরিস্থিতি তৈরি হতো। অর্থাৎ বর্জ্যপানির প্রবাহ এত কম থাকত যে নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হতো না। ফলে পরীক্ষায় ব্যর্থতার তথ্য নথিভুক্ত হতো না এবং নির্ধারিত পরীক্ষাকাল শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর কোনো নমুনাও নেওয়া হতো না। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি আনুমানিক ৪ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড জরিমানা এড়াতে পেরেছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভিযোগ ওঠার পর পরিবেশ সংস্থার এক মুখপাত্র জানান, পরিবেশ সুরক্ষার দায়িত্বকে সংস্থাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখে এবং গুরুতর অপরাধের অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে।
নতুন পরিবেশ, খাদ্য ও গ্রামীণ বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা ঈগলও কথিত এই ঘটনাকে ‘ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেন। তাঁর ভাষায়, অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ করা হবে।
তবে পরিবেশ সংস্থার সাবেক কর্মকর্তা রবার্ট ফরেস্টার এসব বক্তব্যে সন্তুষ্ট নন। তাঁর প্রশ্ন, এক দশকেরও বেশি সময় আগে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা নিয়ে পরিবেশমন্ত্রী এমন মন্তব্য করছেন, অথচ বর্তমান পরিস্থিতিতে কী হচ্ছে?
প্রায় এক দশক ধরে ফরেস্টার পরিবেশ সংস্থার ভেতরের একজন তথ্যফাঁসকারী হিসেবে কাজ করেছেন। সংস্থাটির নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বেশ কিছু গুরুতর ব্যর্থতা তিনি প্রকাশ্যে এনেছেন। একই সঙ্গে তিনি পরিবেশ সংস্থার দীর্ঘদিনের প্রচারিত সেই ধারণাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন যে, তাদের ব্যর্থতার প্রধান কারণ কেবল অর্থের অভাব।
ফরেস্টারের মতে, বাস্তবতা এর চেয়েও অনেক বেশি অন্ধকার।
ঘটনার সূত্রপাত প্রায় ২০১৭ সালে। তখন তিনি ভূগর্ভস্থ পানিদূষণের একটি গুরুতর ঘটনা তদন্ত করছিলেন। একটি প্রতিষ্ঠান বর্জ্য ব্যবস্থাপনার খরচ এড়াতে একটি ভাঙা পয়োনিষ্কাশন পাইপে বিপজ্জনক তরল বর্জ্য ঢেলে দিয়েছিল। সেখান থেকে বিষাক্ত বর্জ্য ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যায়। এমনকি কাছের একটি বাড়িতে পানি সরবরাহকারী পানির পাইপও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
কয়েক সপ্তাহ ধরে ওই বাড়ির বাসিন্দারা না জেনেই দূষিত পানি পান করেন। এতে তারা আইনগতভাবে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে হাজার গুণ বেশি মাত্রায় ক্যানসার সৃষ্টিকারী রাসায়নিক গ্রহণ করেন বলে ফরেস্টারের দাবি। বিষাক্ত বর্জ্যের একটি অংশ পাশের নদীতেও গিয়ে পড়ে।
ফরেস্টারের ভাষায়, ঘটনাটি ছিল ‘প্রথম শ্রেণির’ পর্যায়ের—অর্থাৎ পরিবেশ সংস্থার বিবেচনায় সবচেয়ে গুরুতর ধরনের ঘটনা। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল ‘সব দিক থেকেই বিপজ্জনক’।
ফরেস্টার মনে করেন, অতীতে এমন ঘটনায় পরিবেশ সংস্থার আইনজীবীরা ব্যবস্থা নিতে দ্বিধা করতেন না। সামান্য পরিবেশগত অপরাধের জন্যও তারা পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে আদালতে যেতেন। একবার একটি ছোটখাটো পানির লিক মেরামতের জন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে চাপ দেওয়ার সময় তাঁকে বলা হয়েছিল, প্রতিষ্ঠানের ‘খারাপ মনোভাব’ই শেষ পর্যন্ত মামলা করার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, অন্যদের জন্যও একটি শিক্ষা তৈরি করা।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হওয়া সত্ত্বেও মামলাটি এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভেতর থেকেই বাধা আসে।
ফরেস্টারের মতে, একই সময় পরিবেশ সংস্থায় নতুন একটি মামলা পরিচালনা ও বিচারপ্রক্রিয়া চালু করা হয়। এর ফলে তদন্তকারীরা সরাসরি আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারতেন না। প্রতিটি মামলা একাধিক স্তরের ব্যবস্থাপনা অনুমোদনের মধ্য দিয়ে যেতে হতো।
শেষ পর্যন্ত মামলাটি বাদ দেওয়া হয়। কেন তা করা হলো, সে বিষয়ে তাঁকে কোনো কার্যকর ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন ফরেস্টার।
এদিকে একই সময়ের মধ্যে পরিবেশ সংস্থার নদী পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার সক্ষমতাও নাটকীয়ভাবে কমে যায় বলে তিনি জানান। নমুনা সংগ্রহের স্থান ১০ হাজার ৭৯৭টি থেকে কমিয়ে ৫ হাজার ৭৯৬টিতে নামিয়ে আনা হয়। একই সঙ্গে সংগ্রহ করা পানির নমুনার সংখ্যাও ৪৫ শতাংশ কমে যায়।
এরপর ফরেস্টার এমন একটি জনসাধারণের জন্য প্রস্তুত প্রতিবেদন দেখেন, যেটিকে তিনি অত্যন্ত বিস্তৃত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন হিসেবে বর্ণনা করেন। এতে উঠে এসেছিল, বিষাক্ত দূষকযুক্ত কোটি কোটি টন পয়োনিষ্কাশন কাদা নিয়মিতভাবে ইংল্যান্ডের কৃষিজমিতে সার হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
কিন্তু প্রতিবেদনটি শেষ পর্যন্ত প্রকাশের বদলে গোপন করা হয় বলে ফরেস্টারের অভিযোগ। তাঁর দাবি, এটি পরিবেশ সংস্থার অভ্যন্তরীণ নথি থেকেও সরিয়ে ফেলা হয়েছিল।
এই পর্যায়েই তিনি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগ করার সিদ্ধান্ত নেন।
ফরেস্টার চলতি বছরের জানুয়ারিতে পরিবেশ সংস্থার চাকরি ছাড়েন। তখন চ্যানেল ফোরের তিন পর্বের নাটক ‘ডার্টি বিজনেস’-এর নির্মাণের শেষ পর্যায় চলছিল। সিরিজটিতে দুই অপেশাদার অনুসন্ধানকারীকে দেখানো হয়েছে, যারা নিজেদের এলাকার একটি নদীতে মাছ মারা যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করেন।
চরিত্রগুলোর গল্প বাস্তব জীবনের সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা অ্যাশলি স্মিথ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পিটার হ্যামন্ডের কাজ থেকে অনুপ্রাণিত।
সিরিজটিতে ১৯৯৯ সালে ডেভনের ডাওলিশ ওয়ারেন সমুদ্রসৈকতে পরিবারের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে গুরুতর ই. কোলাই সংক্রমণে মারা যাওয়া আট বছর বয়সী হিদার প্রিনের ঘটনাটিও তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর পরিবার জানিয়েছিল, তারা সমুদ্রসৈকতে পয়োনিষ্কাশনের বর্জ্য দেখতে পেয়েছিল।
ফরেস্টারের পরিচয় গোপন রাখার জন্য ‘ডার্টি বিজনেস’-এ তাঁকে সরাসরি তুলে না ধরে তাঁর আদলে একটি কাল্পনিক চরিত্র তৈরি করা হয়েছে। তবে ততদিনে পরিবেশ সংস্থার কাছে তিনি একজন তথ্যফাঁসকারী হিসেবে পরিচিত হয়ে গিয়েছিলেন। ফলে নিজের পেশাগত ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য তাঁকে কঠিন লড়াই করতে হয়েছে।
লরা কোল ও ব্রায়নি কটাম 


















