এটা বিশ্বাস করা কঠিন মনে হলেও গবেষকরা বলছেন––সব ধরনের কুকুরই মূলত নেকড়ের বংশধর।
তাদের প্রাচীন পূর্বপুরুষরা এখন বিলুপ্ত, আর বর্তমানে জীবিত সবচেয়ে নিকটাত্মীয় হলো গ্রে উলফ— যেটি বন্য পরিবেশে আজও ঘুরে বেড়ানো শক্তিশালী এক শিকারি।
কিন্তু ঠিক কখন নেকড়েরা মানুষের এত কাছাকাছি বসবাস শুরু করল, আর কেনই বা সারা বিশ্বের এত মানুষ কুকুর ভালোবাসে?

আমরা কীভাবে এই অবস্থায় এলাম?
ধারণা করা হয়, মানুষের গৃহপালিত প্রথম প্রাণী ছিল কুকুর।
২০১৭ সালে প্রাচীন কুকুরের ডিএনএ নিয়ে করা এক গবেষণায় দেখা যায়, প্রায় ২০ হাজার থেকে ৪০ হাজার বছর আগে ইউরোপের একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলে নেকড়ে থেকে কুকুরের বিবর্তন ঘটে।
এর আগে ধারণা করা হতো, হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা নেকড়ের দুটি ভিন্ন জাত থেকে মানুষের আয়ত্তে আসে কুকুরের পূর্বসূরিরা।
তবে নেকড়ে থেকে কীভাবে পোষ মানা প্রথম কুকুরের আবির্ভাব হলো—এই গল্পটি এখনো চলমান গবেষণার একটি বিষয়, যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এ বিষয়ে নানা তত্ত্বও প্রচলিত আছে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, গুরুত্বপূর্ণ একটি তত্ত্বে বলা হয়েছে—মানুষ নেকড়ের শাবক ধরে এনে বড় করত এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অপেক্ষাকৃত কম আক্রমণাত্মক নেকড়েগুলোকে বেছে নিয়ে প্রজনন করত, যাতে শিকারে সহায়তা পাওয়া যায়।
আরেকটি আলোচিত তত্ত্ব বলছে, নেকড়েরাই মূলত নিজেরা নিজেদের গৃহপালিত করে ফেলে। সবচেয়ে কম ভীরু নেকড়েরা মানুষের বসতির কাছে খাবারের খোঁজে আসত। একপর্যায়ে মানুষ বুঝতে শুরু করে, এই সম্পর্ক উভয়ের জন্যই উপকারী।
সাহসী ও কম ভীত নেকড়েরাই টিকে থাকত এবং বেশি বংশবিস্তার করত। প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে এই ‘পোষ মানার’ বৈশিষ্ট্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনমূলক জিনোমিক্সের অধ্যাপক ও জিনতত্ত্ববিদ গ্রেগার লারসন মনে করেন, বিষয়টি ছিল অনেকটাই এক ধরনের আকস্মিক সম্পর্ক, যার শুরু হয়েছিল পারস্পরিক সহায়তার উপলব্ধি থেকে।
অধ্যাপক লারসন ব্যাখ্যা করে বলেন, “আমরা নেকড়েকে গৃহপালিত করেছি—এভাবে বললে বিষয়টিতে এমন এক ইচ্ছাকৃত পরিকল্পনার ইঙ্গিত থাকে, যা আমাদের জীবনের অধিকাংশ সম্পর্কের ক্ষেত্রে সত্য নয়”।
“এতে মনে হয় যেন আমরা জানতাম আমরা কী করছি, আমাদের একটি পরিকল্পনা ছিল এবং আমরা খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কাজ করেছি”।

“আমার মনে হয় আমরা উপকৃত হয়েছিলাম, কারণ হলো যদি সেই নেকড়েরা আমাদের নিজেদের দলের অংশ হিসেবে ভাবত, তাহলে ওরা পাহারাদারের মতো কাজ করত, যা সবকিছুকে একটু নিরাপদ করত। আর নেকড়ের দিক থেকে দেখলে, খাবারের জোগান আরও নিয়মিত হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল,” যোগ করেন অধ্যাপক লারসন।
মানুষ হাজার হাজার বছর ধরে শিকার বা পশুপালনের মতো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের জন্য কুকুরের নির্বাচিত প্রজনন করতে শুরু করে। গুহা পাহারা দেওয়ার যুগ থেকে তাদের ‘ক্যারিয়ার’-এর ধরন আমূল বদলে গেছে; এখন তারা পথপ্রদর্শক কুকুর হিসেবে কাজ করা থেকে শুরু করে বিমানবন্দরে সন্দেহজনক প্যাকেট শনাক্ত করার কাজও করছে।
প্রাকৃতিক নির্বাচনে মানুষের এই হস্তক্ষেপের কারণেই আজ শত শত ভিন্ন জাতের কুকুর দেখা যায়। আর অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর তুলনায় কুকুরের আকারের বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি—এমনটাই বলছেন অ্যানথ্রোজুলজিস্ট জন ব্র্যাডশ।
ইতিহাসের এক পর্যায়ে কুকুরের ভূমিকা শুধু সহকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ না থেকে পরিবারের সদস্যে পরিণত হয়।
২০২০ সালে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় পোষা প্রাণীর কবরস্থানের সমাধিফলক বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ১৮৮১ সালে প্রথম পাবলিক পেট কবরস্থান চালুর পর থেকে পোষা প্রাণীর প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, ভিক্টোরীয় যুগে সমাধিফলকে পোষা প্রাণীদের ‘সঙ্গী’ বা ‘বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করা হতো, কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাদের পরিবারের সদস্যের মতো বিবেচনা করা শুরু হয়। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রাণীদের পরিবার-সদস্য হিসেবে দেখার প্রবণতা আরও বেড়ে যায়।
এই গবেষণায় বিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে পোষা প্রাণীর পরকাল নিয়ে বিশ্বাস বাড়তে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

এতটাই আদুরে যে উপেক্ষা করা যায় না?
কর্নেল ইউনিভার্সিটি কলেজ অব ভেটেরিনারি মেডিসিনের মত অনুসারে, কুকুরছানাদের জন্য মায়ের ও ভাইবোনদের সঙ্গে থাকার আদর্শ সময় হলো আট থেকে ১২ সপ্তাহ। সামাজিকতা ও বিকাশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময়।
একই সময়ে, ২০১৮ সালে অ্যারিজোনা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় বলা হয়, এই সময় থেকেই কুকুরের আদুরে ভাব বা ‘কিউটনেস’ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে।
অধ্যাপক লারসন বলেন, “এটি এমন এক সংকটকাল, যখন কুকুরছানারা মায়ের কাছ থেকে পরিত্যক্ত হওয়ার সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে এবং নিজে নিজে বেঁচে থাকার সক্ষমতা থাকে না। ঠিক তখনই তারা মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশি আদুরে লাগে, ফলে মানুষ তাদের তুলে নিয়ে বাড়িতে নিয়ে যায় ও খাবার দিতে শুরু করে”।
এছাড়া ২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, কুকুরের চোখের চারপাশে বিশেষ কিছু পেশির বিবর্তন ঘটেছে, যার মাধ্যমে তারা এমন অভিব্যক্তি তৈরি করতে পারে—যেমন ‘পাপি ডগ আইস’—যা মানুষের মন বিশেষভাবে গলিয়ে দেয়। গবেষণাটি বলছে, এতে গৃহপালিত কুকুরের সঙ্গে মানুষের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়েছে।
অ্যানথ্রোজুলজিস্ট ব্র্যাডশ বলেন, “মানুষ বন্ধুসুলভ এটি কোনো কুকুরছানা বুঝে গেলে তার প্রবৃত্তি তাকে জানিয়ে দেয়—বেঁচে থাকার সবচেয়ে ভালো সুযোগ হলো কোনো মানুষের সঙ্গে থাকা”।
বেশিরভাগ মানুষই বিশ্বাস করেন, তাদের কুকুরও তাদের ভালোবাসে। আর বিজ্ঞানীরা এখন প্রমাণ পেয়েছেন, মানুষের প্রতি এই স্নেহই কুকুরের আচরণের বড় চালিকাশক্তি।
এমোরি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ও নিউরোসাইন্টিস্ট গ্রেগরি বার্নস মানুষ ও কুকুরের সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি কুকুরদের ফাংশনাল ম্যাগনেটিক রিসোনেন্স ইমেজিং (ফাংশনাল এমআরআই) পরীক্ষার সময় স্থির বসে থাকতে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, যাতে তাদের মস্তিষ্ক পর্যবেক্ষণ করা যায়।
তার গবেষণায় দেখা গেছে, মস্তিষ্কের যে অংশটি ইতিবাচক প্রত্যাশার সঙ্গে জড়িত, ককুরের ক্ষেত্রে সেটি সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয় পরিচিত মানুষের গন্ধে।
তাই কুকুরকে ভালোবাসা আমাদের পক্ষে এড়ানো সম্ভব নয়, আর এই ভালোবাসা হয়তো দু’দিক থেকেই আসে।
এই প্রতিবেদনটি বিবিসি রেডিও ফোর-এর ‘হোয়াই ডু উই ডু দ্যাট?’ এবং ‘ন্যাচারাল হিস্টোরিজ’ অনুষ্ঠান অবলম্বনে তৈরি।
বিবিসি বাংলা

















