জাপানের অর্থনীতি নিয়ে যারা নিয়মিত নজর রাখেন, তাঁদের মধ্যে একটি ধারণা বেশ প্রচলিত। দেশটির অর্থনৈতিক কাঠামো অনেকটাই ব্যতিক্রমী। বিশ্বমানের শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে প্রবৃদ্ধি খুবই সীমিত। মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় সরকারি ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত বেশি হলেও সুদের হার ছিল বিশ্বের অন্যতম কম। এই বাস্তবতায় সাম্প্রতিক সময়ে সুদের হার বাড়লেও ইয়েন কেন দুর্বলই থেকে যাচ্ছে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সুদের হার বাড়লেও ইয়েনের দুর্বলতা
গত দুই বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার শূন্যের নিচ থেকে ধীরে ধীরে বাড়িয়েছে। স্বাভাবিকভাবে এতে বিদেশি পুঁজি আকৃষ্ট হওয়ার কথা এবং মুদ্রার মান শক্ত হওয়ার সম্ভাবনা ও থাকে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ইয়েন প্রায় আগের মতোই দুর্বল। মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করে হিসাব করলে বিশ্বের সবচেয়ে দুর্বল মুদ্রা গুলোর মধ্যেই এর অবস্থান। এমনকি জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করতে পারে—এমন গুঞ্জন ও শোনা যাচ্ছে।
রাজস্ব সংকটের আশঙ্কা
কিছু অর্থনীতিবিদের মতে, ইয়েনের এই দুর্বলতা আসলে দীর্ঘমেয়াদি রাজস্ব সংকটের প্রতিফলন। মূল্যপতন ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বছরের পর বছর সরকারি বন্ড কিনে গেছে। এর ফলে সুদের হার কম ছিল এবং সরকারের ঋণ পরিশোধের চাপ ও নিয়ন্ত্রিত ছিল। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে এই বন্ড কেনা কমেছে, তবু বাজারে সুদের হার এখনো তুলনামূলকভাবে নিচেই রয়েছে। এর ফলে ইয়েনের চাহিদা ও বাড়ছে না।
উন্নতির দিক ও আছে
তবে সব সূচকই যে নেতিবাচক, তা নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোট ঋণের অনুপাত ধীরে ধীরে কমেছে। প্রাথমিক বাজেট ঘাটতিও আগের তুলনায় নিয়ন্ত্রণে এসেছে। এর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে মূল্যস্ফীতি। বহু বছর স্থবির থাকার পর সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি তিন শতাংশের ওপরে উঠেছে। এতে কর আয় দ্রুত বেড়েছে, অথচ সরকারি ব্যয় তুলনামূলক ধীরে বেড়েছে। ফলে সামগ্রিকভাবে ঋণের চাপ কিছুটা কমেছে।
প্রকৃত সুদের হার ও সম্পদের ভরসা
নামমাত্র সুদের হার বাড়লেও প্রকৃত অর্থে সুদের হার এখনো কম। দশ বছরের বন্ডে প্রকৃত সুদের হার প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। এটি জাপানের মতো কম প্রবৃদ্ধির অর্থনীতির জন্য স্বাভাবিক বলেই ধরা হচ্ছে। পাশাপাশি সরকারের হাতে বিপুল সম্পদ রয়েছে, যার অনেকটাই সরকারি হিসাবের বাইরে। প্রয়োজনে এসব সম্পদ বিক্রি বা আয়ের উৎস কাজে লাগিয়ে ঋণের বোঝা কমানো সম্ভব।
ইয়েনের অবমূল্যায়নের ব্যাখ্যায় ফাঁক
কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, মূল্যস্ফীতির কারণেই ইয়েন দুর্বল। কিন্তু এই ব্যাখ্যা পুরোপুরি সন্তোষজনক নয়। বাজারদরের তুলনায় ইয়েনের মান ক্রয়ক্ষমতার বিচারে অনেক কম। দীর্ঘমেয়াদি হিসাবে এটি প্রকৃত মূল্যের চেয়ে অনেকটাই নিচে অবস্থান করছে। এতে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ভবিষ্যতের তিন ঝুঁকি
জাপানের সামনে এখন তিনটি বড় ঝুঁকি। প্রথমত, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে এলে প্রকৃত সুদের হার বেড়ে যেতে পারে, যা বাজেটের ওপর চাপ তৈরি করবে। দ্বিতীয়ত, বিদেশে বিনিয়োগ করা বিপুল সম্পদের কারণে মুদ্রা ও সুদের হারের পরিবর্তনে বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। সরকার যদি ব্যয় বাড়ানোর পথে যায়, তবে তা মূল্যস্ফীতি ও সুদের হার আরও বাড়াতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত রাজস্ব ব্যবস্থা কে চাপে ফেলবে।
সতর্কতার প্রয়োজন
উচ্চ মূল্যস্ফীতির সুফল জাপান কিছুটা পেয়েছে, এতে সন্দেহ নেই। তবে এর মানে এই নয় যে সীমাহীন ঝুঁকি নেওয়া সম্ভব। সুদের হার যদি সত্যিই স্বাভাবিক মাত্রায় উঠে আসে, তবে এই স্বাভাবিকতার সঙ্গেই নতুন চ্যালেঞ্জ ও আসবে—এটাই এখন জাপানের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 















