মুসলিম বিশ্বের নেতৃত্ব কে দেবেন—এই প্রশ্ন বহু পুরনো। জাতিগত বিভাজন, মতাদর্শিক পার্থক্য এবং সুন্নি-শিয়া ভেদরেখা মুসলিম বিশ্বকে করেছে বহুধাবিভক্ত। তবু সাম্প্রতিক জরিপ ও রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, এই প্রতিযোগিতায় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ান এখন সবচেয়ে এগিয়ে।
রমজানের প্রাক্কালে আঙ্কারায় গভর্নরদের এক সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে এরদোয়ান শুধু নিজের দেশের প্রশাসকদের উদ্দেশেই কথা বলেননি, বরং যেন বিশ্বজুড়ে প্রায় দুইশ কোটি মুসলমানের উদ্দেশে বার্তা দেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের বিভাজনে উম্মাহ যেন পিষ্ট না হয়। ঐক্য আর ভ্রাতৃত্বই মুসলিম বিশ্বের শক্তি। এই ভাষণ স্পষ্ট করে দেয়, তিনি নিজেকে কেবল তুরস্কের নেতা নয়, বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের কণ্ঠ হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করতে চান।
নেতৃত্বের লড়াইয়ে কারা
মুসলিম বিশ্বের এই অঘোষিত নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা রয়েছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিজেকে মুসলমানদের ওপর হওয়া নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছিলেন। তবে তার মৃত্যু ও ইরান – আমেরিকা যুদ্ধ শুরু হওয়াতে পরিস্থিতি এখণ ভিন্ন।

সিরিয়ার বিদ্রোহী থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া আহমেদ আল-শারা সুন্নি মুসলমানদের একাংশের কাছে নতুন আশা হয়ে উঠেছেন। বাশার আল-আসাদের শাসন উৎখাতের পর তার উত্থান অনেকের কাছে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক জয়ের প্রতীক। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ও বিভক্ত দেশ পুনর্গঠনের কঠিন বাস্তবতা তার জনপ্রিয়তাকে দ্রুত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি ধর্মীয় নেতৃত্বের চেয়ে আধুনিকতা, সংস্কার ও অর্থনৈতিক রূপান্তরকে সামনে আনছেন। মক্কা-মদিনার রক্ষক পরিচয়কে বড় করে না দেখিয়ে তিনি ক্রীড়া, সঙ্গীত ও বিনিয়োগকেন্দ্রিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন। আরব বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তার গ্রহণযোগ্যতা উল্লেখযোগ্য হলেও তিনি নিজেকে উম্মাহর মুখপাত্র হিসেবে তুলে ধরেন না।
কেন এগিয়ে এরদোয়ান
বিভিন্ন জরিপে দেখা যাচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বে দীর্ঘদিন ধরেই এরদোয়ান সবচেয়ে জনপ্রিয় নেতা। ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানের মতো জনবহুল মুসলিম দেশে তার ইতিবাচক ভাবমূর্তি স্পষ্ট। আজারবাইজান থেকে মধ্য এশিয়া, এমনকি ইউরোপে বসবাসরত তুর্কি বংশোদ্ভূত মুসলমানদের মধ্যেও তার প্রভাব রয়েছে।

এরদোয়ানের জনপ্রিয়তার পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ। দুই দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থাকায় তিনি প্রায় সব মুসলিম-প্রধান দেশ সফর করেছেন। সোমালিয়ার দুর্ভিক্ষের সময় মোগাদিশু সফর করে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন জানিয়ে তিনি ভারতকে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। ইউরোপে ইসলামবিদ্বেষ, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতন ও চীনে উইঘুরদের পরিস্থিতি নিয়েও সরব ছিলেন তিনি। ফলে অনেক মুসলমানের কাছে তিনি পশ্চিমা শক্তির মুখোমুখি দাঁড়ানো সাহসী নেতা হিসেবে পরিচিত।
তবে তার শাসনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কও কম নয়। সমালোচকেরা বলেন, তুরস্কে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়েছে, বিরোধীদের দমন ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ বেড়েছে। অর্থনৈতিক সংকটও দেশের ভেতরে তার জনপ্রিয়তা কমিয়েছে। কিন্তু বিদেশে তার সমর্থকেরা এসব বিষয়কে ততটা গুরুত্ব দেন না; বরং তাকে শক্তিশালী ও স্পষ্টভাষী নেতা হিসেবেই দেখেন।
ঐক্যের ডাক ও বাস্তবতা
এরদোয়ান প্রায়ই বলেন, বহুমেরু বিশ্বে মুসলিম বিশ্বকে নিজস্ব শক্তি হিসেবে দাঁড়াতে হবে। তিনি মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কথাও তুলেছেন, যাকে অনেকে মুসলিম সামরিক জোটের ধারণা হিসেবে দেখছেন। একই সঙ্গে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের সময় লাখো শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়া তুরস্কের পদক্ষেপও তার ভাবমূর্তি জোরদার করেছে।
সব মিলিয়ে স্পষ্ট, মুসলিম বিশ্বের একক নেতৃত্ব এখনো কল্পনার বিষয় হলেও বাস্তব রাজনীতিতে এরদোয়ানই সবচেয়ে প্রভাবশালী দাবিদার। অন্য নেতারা উঠে আসতে পারেন, সময়ের সঙ্গে চিত্র বদলাতেও পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে মুসলিম বিশ্বের কানে সবচেয়ে জোরালোভাবে যে কণ্ঠ পৌঁছায়, সেটি রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোয়ানের।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















