যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরান যুদ্ধ শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেই নয়, ইউরোপ ও আর্কটিক অঞ্চল নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। এই সংঘাতের মধ্যেই আবার সামনে এসেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই পুরনো দাবি—গ্রিনল্যান্ডের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। এক সময় যে বক্তব্যে ইউরোপীয় মিত্ররা বিস্মিত হয়েছিল, এখন সেই দাবির পেছনে নতুন যুক্তি খুঁজে পাচ্ছেন তিনি।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব
দুই মাসের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র তার কিছু মিত্রের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সমর্থন পায়নি। অনেক ইউরোপীয় দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে ঘাঁটি ব্যবহার, আকাশপথ কিংবা সামরিক সহায়তা দিতে অনাগ্রহ দেখায়। এই অবস্থাকে ট্রাম্প প্রশাসন ন্যাটোর ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরছে। তাদের মতে, সংকটের সময়ে মিত্ররা পাশে না থাকলে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের যুক্তি আরও জোরালো হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের নিজের কৌশলগত অঞ্চলগুলো সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকা জরুরি। আর সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে গ্রিনল্যান্ড।

গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত গুরুত্ব
আর্কটিক অঞ্চলে অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষা, সামরিক নজরদারি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় এর বড় ভূমিকা রয়েছে। পাশাপাশি এই অঞ্চলে বিরল খনিজ সম্পদের সম্ভাবনাও রয়েছে, যা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতায় বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে নিরাপত্তা হুমকি নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ক্রমেই বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে চীন, রাশিয়া ও ইরানকে একসঙ্গে বড় হুমকি হিসেবে দেখছে, সেখানে ইউরোপের অনেক দেশ সেই একই মাত্রায় বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।
ন্যাটো জোটে ফাটল
এই মতবিরোধ ন্যাটোর ভেতরে নতুন ফাটল তৈরি করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা এই জোট এতদিন পশ্চিমা নিরাপত্তার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে পারস্পরিক আস্থার ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র মনে করছে, মিত্ররা তাদের প্রয়োজনের সময় পাশে দাঁড়াচ্ছে না। অন্যদিকে ইউরোপের দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসী নীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। ফলে আটলান্টিক জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

চীনের ছায়া
এই পুরো পরিস্থিতির পেছনে আরেকটি বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে চীন। বৈশ্বিক বিরল খনিজের বাজারে চীনের শক্ত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলছে। তাই গ্রিনল্যান্ডের মতো অঞ্চলকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে দেখছে ওয়াশিংটন। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এটি শুধু সামরিক নয়, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ।
রাজনৈতিক বাস্তবতা
তবে সবকিছুর পরেও ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের কারণে বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, অধিকাংশ নাগরিক গ্রিনল্যান্ড দখলের পক্ষে নয়।

এছাড়া কংগ্রেসেও এমন আইন প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে গ্রিনল্যান্ড অধিগ্রহণে সরকারি অর্থ ব্যবহার সীমিত করা যায়। ফলে রাজনৈতিক চাপ ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের মধ্যে আলোচনা চলছে। তবে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা ট্রাম্পের পরিকল্পনার বিরোধিতা করছেন। ফলে এই ইস্যুর ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যুদ্ধ, ন্যাটোর দুর্বলতা এবং চীনের উত্থান—সব মিলিয়ে বিশ্ব রাজনীতির নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে উঠে আসছে গ্রিনল্যান্ড, যা একসময় অনেকের কাছেই ছিল দূরের এক বরফঢাকা দ্বীপ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















