মার্কিন সমর্থিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান নাজুক সমঝোতা নতুন করে চাপে পড়েছে। বেইজিং এই হামলাকে সরাসরি ‘শাসন পরিবর্তনের স্পষ্ট চেষ্টা’ বলে আখ্যা দিয়েছে এবং ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের তীব্র সমালোচনা করেছে।
চীনের কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একটি স্বাধীন দেশের নেতাকে হত্যার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিয়ম ভঙ্গ করেছে। তিনি ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রতি চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।
খামেনির হত্যাকাণ্ড এমন এক সময়ে ঘটল, যখন এর মাত্র দুই মাস আগে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে। ইরান ও ভেনেজুয়েলা—দুটি দেশই চীনের ঘনিষ্ঠ অংশীদার। ফলে এই ঘটনাগুলোকে চীন তার বৈশ্বিক কৌশলের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তির প্রদর্শন হিসেবে দেখছে।

চীনের জন্য কঠিন ভারসাম্য
তবে প্রশ্ন হলো, মধ্যপ্রাচ্যে নিজের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক অংশীদার ইরানকে কতটা সমর্থন দেবে বেইজিং—এবং তা করতে গিয়ে নিজের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কতটা ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
ইতিমধ্যে সংঘাত সরাসরি চীনকে প্রভাবিত করেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তেহরানে এক চীনা নাগরিক নিহত হয়েছেন এবং হাজারো চীনা নাগরিককে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি
চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশ। ইরান হুমকি দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হতে পারে। এই প্রণালির মাধ্যমে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। সেখানে অস্থিরতা দেখা দিলে জ্বালানির দাম বেড়ে যেতে পারে, যা চীনের অর্থনীতিতে সরাসরি আঘাত হানবে।

অভ্যন্তরীণ সংবেদনশীলতা
বিদেশি সমর্থনে শাসন পরিবর্তনের বিষয়টি চীনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও স্পর্শকাতর। ২০১২ সাল থেকে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আগামী বছর চতুর্থ মেয়াদে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তার নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভিন্নমত বরদাস্ত করা হয় না।
রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যমে খামেনির মৃত্যুসংবাদ প্রকাশের পর কিছু অনলাইন ব্যবহারকারী ইরানের নাগরিকদের অভিনন্দন জানান এবং পরবর্তী নেতা কে হতে পারেন তা নিয়ে মন্তব্য করেন। এসব মন্তব্য দ্রুত সেন্সর করা হয়।
বাণিজ্য আলোচনার আগে কৌশলগত হিসাব
ইরান ইস্যুতে কঠোর বক্তব্য দিলেও বেইজিংয়ের প্রধান নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করা। মার্চের শেষ দিকে বেইজিংয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিংয়ের মধ্যে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। সেখানে বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতির মধ্যে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বাড়ানোর আলোচনা হতে পারে।
চীন চাইলে এই বৈঠক স্থগিত বা বাতিল করে ওয়াশিংটনের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করতে পারে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের জন্য তা ঝুঁকিপূর্ণ হবে।

চীনের প্রাধান্যপ্রাপ্ত লক্ষ্য
বিশ্লেষক জুলিয়ান গেওয়ার্টজের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাপ্রবাহের চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ব্যবস্থাপনাই চীনের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বেইজিং চায় বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত হোক, তাইওয়ানের প্রতি মার্কিন সমর্থন কমুক এবং প্রযুক্তি রপ্তানিতে আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল হোক।
সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের জন্য অস্ত্র বিক্রির ঘোষণা বিলম্বিত করেছে এবং উন্নত চিপ বিক্রির কিছু সীমাবদ্ধতা শিথিল করেছে। এমনকি সাম্প্রতিক ভাষণে ট্রাম্প চীনের নামও উল্লেখ করেননি—যা অস্বাভাবিক ঘটনা।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক এক রায়ে ট্রাম্পের বেশ কিছু শুল্ক বাতিল হওয়ায় বেইজিংয়ের অবস্থান আরও শক্ত হয়েছে। নতুন ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্ক কাঠামোও চীনের জন্য তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক।
কৌশলগত প্রভাব ও সামরিক বাস্তবতা
ইরান সংঘাতের জেরে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি জোরদার করেছে। যদি এই উপস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তা এশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মনোযোগ ও সম্পদ সরিয়ে নিতে পারে—যা বেইজিংয়ের কৌশলগতভাবে লাভজনক হতে পারে।

তবে একই সঙ্গে এই সংঘাত দুই পরাশক্তির সামরিক সক্ষমতার ব্যবধানও স্পষ্ট করেছে। দ্রুত সামরিক আধুনিকায়ন সত্ত্বেও চীনের এমন সামরিক শক্তি নেই, যা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
সিঙ্গাপুরের নানইয়াং প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষক ডিলান লোর মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই শক্তির প্রদর্শন বেইজিংকে অস্বস্তিতে ফেলবে, কারণ এটি প্রমাণ করে—চীনসহ কোনো দেশই চাইলে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া থেকে থামাতে পারছে না।
ইরানের সঙ্গে সূক্ষ্ম কূটনীতি
চীনকে তেহরানের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতেও সতর্ক থাকতে হচ্ছে। সাম্প্রতিক হামলায় যেসব উপসাগরীয় দেশের সঙ্গে ইরানের উত্তেজনা বেড়েছে—যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব—সেসব দেশের সঙ্গেও চীনের গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে।

ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে ফোনালাপে ইরানকে প্রতিবেশী দেশগুলোর ‘যৌক্তিক উদ্বেগ’ বিবেচনায় নেওয়ার আহ্বান জানান।
চীনের ইরান বা ভেনেজুয়েলার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সামরিক জোট নেই। উত্তর কোরিয়া ছাড়া অন্য কোনো দেশের সঙ্গে চীনের প্রতিরক্ষা চুক্তি নেই। ফলে ইরানকে সমর্থন মূলত কৌশলগত, সামরিক নয়।
উপসংহার
সব দিক বিবেচনায় বেইজিং সম্ভবত তেহরানকে মৌখিক সমর্থন অব্যাহত রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎস হিসেবে তুলে ধরবে। তবে একই সঙ্গে তারা ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে ফেলার ঝুঁকি নেবে না।
ইরান সংকট তাই শুধু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ভারসাম্যেরও এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















