ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলাকে সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে নিন্দা করেছে রাশিয়া। একই সঙ্গে দেশটি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং উত্তেজনা কমানোর আহ্বান জানিয়েছে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ভেতরে একাধিক বিমান হামলা চালায়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং কয়েকজন জ্যেষ্ঠ সামরিক কমান্ডার নিহত হন বলে জানানো হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ধ্বংস করার লক্ষ্যেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তবে ইরান বলছে, তারা শুধুমাত্র বেসামরিক ব্যবহারের জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে এবং এই হামলাকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও উসকানিহীন আক্রমণ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। গত বছর দুই দেশ একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তিও স্বাক্ষর করেছে। এই প্রেক্ষাপটে সংঘাত নিয়ে মস্কোর অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
পুতিনের প্রতিক্রিয়া
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইরানের জনগণের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি আয়াতুল্লাহ খামেনির হত্যাকে “নৈতিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতিটি নীতির নির্মম লঙ্ঘন” বলে আখ্যা দেন।
সোমবার পুতিন সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন এবং সৌদি আরবের নেতাদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। এই দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যেগুলোর কয়েকটিকে লক্ষ্য করে ইরান পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
ক্রেমলিন জানায়, ওই আলোচনায় সাম্প্রতিক অভূতপূর্ব পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় এবং সব পক্ষই যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক সমাধানে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর একমত হন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে কথোপকথনে পুতিন বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর উদ্বেগ ইরানের কাছে পৌঁছে দিতে রাশিয়া প্রস্তুত। কাতার ও বাহরাইনের নেতাদের সঙ্গেও আলাপে তিনি সতর্ক করে দেন যে এই সংঘাত পুরো অঞ্চলকে অনিশ্চিত পরিণতির এক পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে ঠেলে দিতে পারে।

ক্রেমলিনের অবস্থান
ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ জানিয়েছেন, রাশিয়া পরিস্থিতির ওপর ঘনিষ্ঠ নজর রাখছে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে।
তিনি বলেন, ওমানের মধ্যস্থতায় জেনেভায় অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনাগুলো শেষ পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হওয়ায় রাশিয়া গভীরভাবে হতাশ।
ইরানে হামলার ঘটনা ইউক্রেন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় রাশিয়ার আস্থাকে প্রভাবিত করবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে পেসকভ বলেন, মস্কো এ থেকে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেবে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার প্রচেষ্টাকে তারা মূল্যায়ন করলেও শেষ পর্যন্ত রাশিয়া নিজের শক্তি ও অবস্থানের ওপরই সবচেয়ে বেশি ভরসা করে।

রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ইরানে চালানো হামলাকে “উসকানিহীন সামরিক আগ্রাসন” বলে নিন্দা করেছে। একই সঙ্গে সার্বভৌম রাষ্ট্রের নেতাদের হত্যার মতো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের নীতিকেও কঠোরভাবে সমালোচনা করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সব পক্ষকে দ্রুত সংঘাত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা সতর্ক করে বলেছে, পারস্য উপসাগরে নৌপরিবহন ব্যাহত হলে তা বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাস বাণিজ্যের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
এক বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরান ও আরব দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে চাইছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইরান কিংবা আরব দেশ—যেখানেই হোক বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য এবং তা এড়িয়ে চলা উচিত। পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সব দেশের বৈধ স্বার্থকেও সম্মান জানানো প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেছে মন্ত্রণালয়।

মেদভেদেভের সতর্কবার্তা
রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভও এই সংঘাত নিয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বলেন, এই উত্তেজনা আরও বাড়তে থাকলে তা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
রুশ সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেদভেদেভ মন্তব্য করেন, আয়াতুল্লাহ খামেনিকে হত্যার নির্দেশ দিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি গুরুতর ভুল করেছেন। কারণ এতে তিনি শিয়া মুসলিমদের কাছে খামেনিকে শহীদে পরিণত করেছেন, যার ফলে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন নাগরিকরা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
মেদভেদেভের মতে, ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ আসলে পশ্চিমা শক্তিগুলোর বৈশ্বিক প্রভাব ও আধিপত্য ধরে রাখার বৃহত্তর কৌশলেরই অংশ।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















