মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলায় ব্যাপকভাবে ড্রোন ব্যবহার করছে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চজুড়ে হাজার হাজার ড্রোন ছোড়া হয়েছে। এর বেশিরভাগই প্রতিহত করা সম্ভব হলেও কিছু ড্রোন লক্ষ্যভেদ করে ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা বলছেন, এই হামলাগুলো শুধু সামরিক ঘাঁটিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং দূতাবাস, হোটেল এবং অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনাকেও লক্ষ্য করা হচ্ছে।

ড্রোন হামলার বিস্তার
শনিবার থেকে ইরান প্রায় দুই হাজার ড্রোন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ছুড়েছে বলে সামরিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মঙ্গলবার সৌদি আরবের রিয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দুটি ড্রোন আঘাত হানে।
এর আগে রবিবার কুয়েতে একটি হামলায় অন্তত ছয়জন মার্কিন সেনা নিহত হন। সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এটি সম্ভবত ইরানের একমুখী আক্রমণাত্মক ড্রোনের আঘাত ছিল।
প্রথমে বলা হয়েছিল, হামলাটি একটি সামরিক ঘাঁটিতে হয়েছে। পরে জানা যায়, কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে অস্থায়ী অফিসে কাজ করা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছিল। ওই স্থানটি ঘাঁটি থেকে প্রায় ২০ মাইল দূরে।

সেনা ছড়িয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের ঝুঁকি
ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে সেনা ও কর্মীদের ছড়িয়ে দিয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বড় সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার ঝুঁকি কমানো।
কিন্তু সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, এই পদক্ষেপ উল্টো কিছু ক্ষেত্রে সেনাদের আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। কারণ মার্কিন ঘাঁটিগুলো সাধারণত ড্রোন হামলার বিরুদ্ধে শক্তভাবে সুরক্ষিত থাকে। কিন্তু হোটেল বা অস্থায়ী অফিসে সেই ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকে না।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেন, ইরানের হামলা শুধু সামরিক ঘাঁটিতেই নয়, সরাসরি দূতাবাসেও হচ্ছে। এমন অনেক স্থাপনাকেও লক্ষ্য করা হচ্ছে যেগুলোর সঙ্গে যুদ্ধের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।

আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের প্রভাব
গত এক দশকে ড্রোন প্রযুক্তি যুদ্ধের ধরন বদলে দিয়েছে। তুলনামূলকভাবে সস্তা এবং সহজে মোতায়েনযোগ্য হওয়ায় এই অস্ত্র দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ইউক্রেন থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য—বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে এর ব্যাপক ব্যবহার দেখা গেছে।
ইরান বহু বছর আগে নিজস্ব ড্রোন ব্যবস্থা তৈরি করে, যার মধ্যে ‘শাহেদ’ ড্রোন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এখন এই ড্রোন ব্যবহার করে আঞ্চলিক বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হচ্ছে, যার মধ্যে বেসামরিক স্থাপনাও রয়েছে।
সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, মার্কিন সেনারা যেখানে অবস্থান করছে সেইসব হোটেলকেও লক্ষ্য করে হামলা হয়েছে।
ড্রোন হামলার কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, বাহরাইনের রাজধানী মানামা এবং এমনকি সাইপ্রাস পর্যন্ত আতঙ্ক ছড়িয়েছে। অনেক দূতাবাস শক্তভাবে নির্মিত হলেও একসঙ্গে বহু ড্রোনের আক্রমণ মোকাবিলার জন্য এগুলো তৈরি করা হয়নি।

কিছু ড্রোন লক্ষ্যভেদে সফল
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো জানিয়েছে, অধিকাংশ ড্রোন মাঝপথেই ধ্বংস করা হয়েছে। তবে কিছু ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে গেছে।
মঙ্গলবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ অঞ্চলে একটি জ্বালানি এলাকায় ড্রোন ভূপাতিত করার সময় ধ্বংসাবশেষ পড়ে একটি তেল সংরক্ষণ স্থাপনায় বড় আগুন লাগে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার থেকে এখন পর্যন্ত দেশটির দিকে ১৬৫টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ৫৪১টি ড্রোন ছোড়া হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রগুলো বেশিরভাগই প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে বা সমুদ্রে পড়েছে। কিন্তু অন্তত ২১টি ড্রোন বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল পল ডি. ইটন বলেন, সব জায়গা একই সঙ্গে রক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই সহজ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করে তুলনামূলক কম খরচে বড় ধরনের ক্ষতি করা যায়।
ইরানের কৌশলগত বার্তা
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই ব্যাপক ড্রোন হামলা ইঙ্গিত দিতে পারে যে তাদের অন্যান্য অস্ত্রের মজুত কমে আসছে। তাই অবশিষ্ট অস্ত্র দিয়ে সর্বোচ্চ ক্ষতি করার চেষ্টা করছে তারা।
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান বিশেষজ্ঞ ভ্যালি নাসর বলেন, তেহরানের সরকার এখন নিজেদের টিকে থাকার লড়াই লড়ছে। তাদের সামনে হারানোর মতো খুব কমই বাকি আছে।
তার মতে, ইরান পশ্চিমা দেশগুলোকে বোঝাতে চাইছে যে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ করলে তার মূল্য অনেক বেশি হবে। ভবিষ্যতে কেউ আক্রমণ করার আগে যেন সেই পরিণতি ভেবে দেখে।

শাহেদ ড্রোনের প্রযুক্তি ও ক্ষমতা
ইরানের শাহেদ ড্রোন তৈরি করেছে শাহেদ এভিয়েশন ইন্ডাস্ট্রিজ রিসার্চ সেন্টার, যা দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে কাজ করে।
এই ড্রোন প্রথম আলোচনায় আসে ২০২১ সালের জুলাইয়ে, যখন একটি ইসরায়েলি মালিকানাধীন তেলবাহী জাহাজে হামলায় এটি ব্যবহৃত হয়েছিল।
ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের গতি বেশি এবং ধ্বংসক্ষমতাও বেশি হলেও এগুলোর দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার এবং সংখ্যা তুলনামূলক কম। বিপরীতে একটি শাহেদ ড্রোনের দাম মাত্র কয়েক দশ হাজার ডলার।
লন্ডনভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান জেনসের বিশেষজ্ঞ জেরেমি বিনি বলেন, এই যুদ্ধে বড় চ্যালেঞ্জ হবে কম খরচে ড্রোন প্রতিহত করা। যাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মোকাবিলার জন্য সীমিত সংখ্যক প্যাট্রিয়ট প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সংরক্ষিত রাখা যায়।
তার মতে, উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর বিমান বাহিনী আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে ড্রোন ভূপাতিত করতে পারে।
![]()
প্রক্সি গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ
শুধু ইরান নয়, তাদের সমর্থিত আঞ্চলিক মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোও এই হামলায় অংশ নিচ্ছে।
ইরাকভিত্তিক ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক’ নামে একটি গোষ্ঠী জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ২৩টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে ইরবিল শহরের মার্কিন কনস্যুলেট ও আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও ছিল।
আরেকটি ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীও ইরবিলের মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দায় স্বীকার করেছে।
এই পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















