ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর দেশটির ক্ষমতার উত্তরাধিকার নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হয়েছে। ইরানের জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতারা নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের বিষয়ে বৈঠক করছেন। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত তিনজন ইরানি কর্মকর্তার মতে, খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি এখন উত্তরসূরি হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন।
কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে—সম্ভব হলে বুধবার সকালেই তাঁকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে ঘোষণা করা হতে পারে। তবে কিছু ধর্মীয় নেতা এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বিধা প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, আনুষ্ঠানিকভাবে নেতৃত্বে এলে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হতে পারেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি শেষ পর্যন্ত মোজতবা খামেনিকে নির্বাচিত করা হয়, তবে তা ইরানের রাজনীতিতে কঠোরপন্থীদের শক্তিশালী অবস্থানের ইঙ্গিত বহন করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ
যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইরান ও শিয়া ইসলাম বিষয়ক বিশেষজ্ঞ ভ্যালি নাসর বলেন, মোজতবা খামেনিকে নির্বাচন করা কিছুটা অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্ত হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে তাঁকে সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে ধরা হলেও গত দুই বছরে তাঁর নাম আলোচনার কেন্দ্র থেকে কিছুটা সরে গিয়েছিল।
নাসরের মতে, যদি তাঁকে নির্বাচিত করা হয়, তবে বোঝা যাবে যে ইরানের ক্ষমতার কেন্দ্র এখন আরও বেশি করে বিপ্লবী গার্ডের কঠোরপন্থী অংশের হাতে চলে গেছে।
মোজতবা খামেনির প্রভাব ও ভূমিকা
৫৬ বছর বয়সী মোজতবা খামেনি দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থেকে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। তিনি সাধারণত প্রকাশ্যে খুব কমই উপস্থিত হন, তবে তাঁর বাবা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ক্ষমতার কাঠামোর মধ্যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়। আলোচনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা জানান, এই বাহিনীই মূলত তাঁর নেতৃত্বে আসার পক্ষে জোরালো সমর্থন দিয়েছে।
তাদের যুক্তি, চলমান সংকটের সময়ে ইরানকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা ও নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণ তাঁর রয়েছে।
তেহরানের বিশ্লেষক মেহদি রাহমতি বলেন, বর্তমানে মোজতবা খামেনিই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পছন্দ। কারণ নিরাপত্তা ও সামরিক ব্যবস্থাপনা সমন্বয়ের কাজ তিনি আগে থেকেই করতেন।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এই সিদ্ধান্তে সবাই সন্তুষ্ট হবে না। সমাজের একটি অংশ এতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে এবং এর ফলে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

জনমতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া
সরকারপন্থীরা মোজতবা খামেনিকে তাঁদের নিহত নেতার উত্তরাধিকার বহনকারী হিসেবে দেখবে এবং দ্রুত সমর্থন জানাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে সরকারবিরোধীরা তাঁকে বর্তমান শাসনব্যবস্থারই ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখবে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সরকারি দমনপীড়নে অন্তত সাত হাজার মানুষ নিহত হয়েছে, যা জনমনে ক্ষোভ আরও বাড়াতে পারে।

অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীরা
নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের আলোচনায় আরও দুজনের নাম সামনে এসেছে।
একজন হলেন আলিরেজা আরাফি, যিনি একজন ধর্মীয় নেতা ও আইনজ্ঞ। খামেনি নিহত হওয়ার পর যে তিন সদস্যের অন্তর্বর্তী নেতৃত্ব পরিষদ গঠিত হয়েছে, তিনি তার একজন সদস্য।
![]()
আরেকজন হলেন সাইয়্যেদ হাসান খোমেনি, ইসলামী বিপ্লবের প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নাতি। তাঁকে তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী হিসেবে দেখা হয় এবং ইরানের সংস্কারপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা রয়েছে।

মোজতবা খামেনি সম্পর্কে ভিন্ন মত
মোজতবা খামেনির ঘনিষ্ঠ রাজনীতিক আবদোলরেজা দাভারি বলেন, যদি তিনি ক্ষমতায় আসেন, তাহলে তিনি সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের মতো আধুনিক ও সংস্কারমুখী নেতৃত্ব দিতে পারেন।
দাভারির মতে, মোজতবা খামেনি অনেক ক্ষেত্রে প্রগতিশীল এবং সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পরিবর্তন আনতে পারেন।
ট্রাম্পের মন্তব্য
ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানে যেসব ব্যক্তিকে সম্ভাব্য নেতৃত্বের তালিকায় ধরা হচ্ছিল, তাদের অনেকেই সাম্প্রতিক হামলায় নিহত হয়েছেন।
তিনি মন্তব্য করেন, “অচিরেই এমন পরিস্থিতি হতে পারে যে আমরা কাউকেই চিনব না।”
ইরানের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি হতে পারে যদি নতুন নেতা আগের মতোই কঠোর নীতির অনুসরণ করেন।

বিশেষজ্ঞ পরিষদের ভূমিকা
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করে বিশেষজ্ঞ পরিষদ নামে পরিচিত একটি ধর্মীয় পরিষদ। এতে ৮৮ জন শিয়া ধর্মীয় নেতা রয়েছেন, যারা জনভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন।
ইরানের সংবিধান অনুযায়ী এই পরিষদের দায়িত্ব হলো সর্বোচ্চ নেতাকে নির্বাচন করা, তাঁর কার্যক্রম তদারকি করা এবং প্রয়োজন হলে তাঁকে অপসারণ করা।
ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ৪৭ বছরের ইতিহাসে এই পরিষদ মাত্র দ্বিতীয়বারের মতো নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করতে যাচ্ছে।
১৯৮৯ সালে এই পরিষদই আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছিল। এরপর চার দশকের বেশি সময় ধরে তিনি প্রায় সম্পূর্ণ ক্ষমতা নিয়ে দেশ শাসন করেছেন।
পারিবারিক ক্ষতি
ইরান সরকার জানিয়েছে, শনিবারের হামলায় আয়াতুল্লাহ খামেনির সঙ্গে তাঁর পরিবারের কয়েকজন সদস্যও নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন মোজতবা খামেনির স্ত্রী জাহরা আদেল, তাঁর মা মানসুরে খোজাস্তে বাঘেরজাদে এবং তাঁর এক ছেলে।
এই হামলার পর থেকেই ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশটির ভেতরে ও আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















