মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে চীনে এক নতুন প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। প্রযুক্তি ও প্রকৌশলে দক্ষ সাধারণ নাগরিকেরা স্বেচ্ছায় অনলাইনে নিজেদের জ্ঞান ব্যবহার করে ইরানকে সহায়তার উপায় তুলে ধরছেন—কোনো অর্থ বা সরকারি সমর্থন ছাড়াই।
ভাইরাল ভিডিও: এফ-৩৫ ভূপাতিত করার কৌশল
গত ১৪ মার্চ চীনা সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। “লাওহু টকস ওয়ার্ল্ড” নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত ভিডিওটিতে বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়, কীভাবে ইরান তুলনামূলক কম খরচের প্রযুক্তি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের উন্নত স্টেলথ যুদ্ধবিমান এফ-৩৫ লক্ষ্যবস্তু করতে পারে।
পার্সিয়ান সাবটাইটেলসহ ভিডিওটি দ্রুতই কোটি কোটি ভিউ অর্জন করে। ভিডিও প্রকাশের পাঁচ দিন পর, ১৯ মার্চ ইরান দাবি করে যে তারা একটি মার্কিন এফ-৩৫ আঘাত করেছে—যা ঘটনাটিকে আরও আলোচনায় এনে দেয়।

অনলাইন সহায়তার বিস্তার
২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল বনাম ইরান সংঘাতের পর থেকে এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি ও শেয়ার করার প্রবণতা বাড়তে থাকে।
চীনের বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত (স্টেম) বিষয়ে দক্ষ ব্যক্তিরা নানা ধরনের তথ্য শেয়ার করছেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির সম্ভাব্য অবস্থান
- পারস্য উপসাগরে মার্কিন বিমানবাহী রণতরীর বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র কৌশল
- ইরানের খার্গ দ্বীপে সম্ভাব্য মার্কিন অভিযানের প্রতিরক্ষা সিমুলেশন
বিশাল স্টেম জনশক্তি: চীনের শক্তি
চীন প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ স্টেম গ্র্যাজুয়েট তৈরি করে, যার মধ্যে প্রায় ১৩ লাখ প্রকৌশলী। তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার প্রকৌশলী স্নাতক হন।
এই বিশাল জনশক্তির একটি অংশ এখন ওপেন-সোর্স তথ্য ব্যবহার করে সামরিক বিশ্লেষণে যুক্ত হচ্ছে।
ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সরকারি নয়
এই কনটেন্ট নির্মাতাদের বেশিরভাগই ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকে কাজ করছেন। “লাওহু” অ্যাকাউন্টের নির্মাতা একসময় চীনের প্রতিরক্ষা গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় নর্থওয়েস্টার্ন পলিটেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র মতে, তার অনেক সহপাঠী সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পে কাজ করছেন। তবে তিনি নিজে অর্থের জন্য নয়, ব্যক্তিগত আগ্রহ থেকেই এসব ভিডিও তৈরি করেন।
কম খরচে উচ্চ প্রযুক্তির মোকাবিলা
ভিডিওতে দেখানো হয়, ইনফ্রারেড ক্ষেপণাস্ত্র, মোবাইল লঞ্চার ও সহজ সেন্সর ব্যবহার করে কীভাবে উন্নত মার্কিন প্রযুক্তির মোকাবিলা করা সম্ভব। এমনকি বিমানবাহী রণতরীর মতো জটিল ব্যবস্থাকেও চ্যালেঞ্জ করার কৌশল তুলে ধরা হয়।

মানবিক ক্ষোভও প্রভাব ফেলছে
তেহরান ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে ইরানে ১,০০০-এর বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন। দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরে একটি হামলায় অন্তত ১৬৮ জন স্কুলশিশুর মৃত্যু হয়েছে।
এই ঘটনাগুলো চীনা নাগরিকদের মধ্যে সহানুভূতি ও ক্ষোভ তৈরি করেছে, যা অনেককে ইরানকে সহায়তা করার দিকে উৎসাহিত করছে।

সীমান্ত ছাড়িয়ে জ্ঞানের বিস্তার
বিশ্লেষকদের মতে, এটি একটি নতুন ধারা যেখানে সাধারণ মানুষ ওপেন-সোর্স তথ্য ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান ব্যবহার করে সামরিক বিশ্লেষণ তৈরি করছেন এবং তা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
এর ফলে সামরিক জ্ঞান আর শুধু রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না—বরং বৈশ্বিকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রভাব এখনও অনিশ্চিত
তবে এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি যে এসব অনলাইন বিশ্লেষণ সরাসরি যুদ্ধের ফলাফলে প্রভাব ফেলেছে।
চীনে ইরানের দূতাবাস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















