চৌদ্দ বছর বয়সী এক কিশোরের রক্তাক্ত দেহ রাস্তার ওপর পড়ে থাকার ভিডিও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দেশজুড়ে ক্ষোভের ঝড় তুলেছিল। অভিযোগ ছিল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হওয়ার পর হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এর আগেও প্রতিবাদ কর্মসূচির সময় পুলিশের গাড়ির আঘাতে এক মোটরসাইকেলচালকের মৃত্যুর ঘটনা জনমনে একই ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। দুটি ঘটনার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ মিল ছিল: সহিংসতার অভিযোগের পাশাপাশি ঘটনাগুলোর দৃশ্যমান প্রমাণ সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছিল।
এখানেই আমাদের সময়ের একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা ধরা পড়ে। এখন অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার ভিডিও কেবল তথ্য নয়, রাজনৈতিক চাপ তৈরির হাতিয়ার। কোনো ঘটনার চিত্র যত বেশি হৃদয়বিদারক, তা তত দ্রুত জনমত সংগঠিত করতে পারে এবং কর্তৃপক্ষকে প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু এই প্রবণতা একই সঙ্গে আরেকটি সংকেতও বহন করে—প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক সমাজে নাগরিকদের কি সত্যিই নৃশংস দৃশ্যের ভাইরাল হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হবে, যাতে কোনো অন্যায় গুরুত্ব পায়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়। সামাজিক মাধ্যমের যুগের অনেক আগে থেকেই রাষ্ট্র ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীগুলো বুঝেছিল যে ছবি ও দৃশ্যমান উপস্থাপন মানুষের রাজনৈতিক বোধকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে। সহিংসতার চিত্র কখনও ভয় তৈরি করেছে, কখনও শত্রুর পরিচয় নির্ধারণ করেছে, আবার কখনও নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীকে অপরাধী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
স্বৈরতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাগুলো বিশেষভাবে এ কৌশলকে কাজে লাগিয়েছে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত প্রচারণায় প্রায়ই এমন দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে যা জনমতকে নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করে। ফলে সহিংসতার বাস্তবতা নয়, বরং তার দৃশ্যমান উপস্থাপনাই হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক অর্থ তৈরির প্রধান মাধ্যম। কে ভুক্তভোগী, কে হুমকি, কার প্রতি সহানুভূতি দেখানো হবে—এসব ধারণা গঠনে ছবির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের পর পরিস্থিতি অবশ্য বদলেছে। এখন নাগরিকেরা নিজেরাই ঘটনার ভিডিও ধারণ করতে পারেন এবং সরকারি বয়ানের বাইরে বিকল্প বিবরণ সামনে আনতে পারেন। প্রযুক্তির এই ক্ষমতায়ন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ যখন মানুষ মনে করে রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানগুলো সত্য গোপন করতে পারে, তখন মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও হয়ে ওঠে বিশ্বাসযোগ্যতার বিকল্প উৎস।
এ কারণেই আজ কোনো সহিংস ঘটনার ভিডিও প্রকাশ পেলে তা কেবল আবেগের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না; বরং সরকারি বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করার একটি কার্যকর মাধ্যম হয়ে ওঠে। দৃশ্যমান প্রমাণ কর্তৃপক্ষের জন্য ঘটনাকে অস্বীকার করা বা ছোট করে দেখানো কঠিন করে দেয়।

তবে এখানেই আরেকটি নৈতিক জটিলতা তৈরি হয়। যদি সমাজ ধীরে ধীরে এমন অবস্থায় পৌঁছে যে কোনো অভিযোগ বিশ্বাস করার জন্য ভিডিও বা রক্তাক্ত ছবি অপরিহার্য হয়ে ওঠে, তাহলে ভুক্তভোগীদের অভিজ্ঞতা নিজে আর যথেষ্ট থাকে না। যেন কষ্টের সত্যতা প্রমাণের জন্য আগে সেটিকে প্রদর্শন করতে হবে।
এই মানসিকতার বিপদ অতীতে বহুবার দেখা গেছে। সহিংসতা বা যৌন নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে যখন ‘প্রমাণ’ দেখানোর দাবি অতিরিক্ত জোরালো হয়ে ওঠে, তখন অনেক সময় বিভ্রান্তিকর বা ভুয়া ছবি প্রচারিত হয়। পরে সেই ছবিগুলোর সত্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে পুরো ঘটনার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই আক্রমণ করা হয়। ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগীর বক্তব্যও সন্দেহের মুখে পড়ে, যদিও তিনি কখনও ওই ছবিগুলোর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
আজও একই দ্বৈত বাস্তবতা বিদ্যমান। একদিকে ভিডিও প্রমাণ অন্যায়কে উন্মোচিত করে, ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহির মুখে দাঁড় করায় এবং নাগরিকদের সংগঠিত হতে সাহায্য করে। অন্যদিকে, একই ভিডিও কখনও কখনও সহিংসতাকে এক ধরনের দৃশ্যমান পণ্যে পরিণত করে—যা মানুষ বারবার দেখে, শেয়ার করে, কিন্তু সবসময় তার গভীর সামাজিক ও রাজনৈতিক অর্থ নিয়ে ভাবতে চায় না।
এর ফলে জনসচেতনতার একটি বিপজ্জনক রূপ তৈরি হতে পারে। অন্যায়ের গুরুত্ব তখন অন্যায়ের প্রকৃতি দ্বারা নয়, বরং তার দৃশ্য কতটা শকিং তার ওপর নির্ভর করতে শুরু করে। যে ঘটনা ক্যামেরায় ধরা পড়ে না, সেটি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়; যে ভুক্তভোগীর কষ্টের ছবি নেই, তার জন্য ন্যায়বিচারের দাবি দুর্বল হয়ে পড়ে।
একটি সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য এটি সুখকর লক্ষণ নয়। কারণ ন্যায়বিচারের ভিত্তি হওয়া উচিত আইন, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকের সাক্ষ্য; ভাইরাল ভিডিও নয়। প্রযুক্তি মানুষের হাতে সত্য তুলে ধরার শক্তিশালী উপায় হিসেবে থাকবে, এবং থাকা উচিত। কিন্তু এমন এক সমাজ গড়ে তোলা আরও জরুরি, যেখানে কোনো মানুষের রক্তাক্ত ছবি ছড়িয়ে না পড়লেও তার প্রতি অন্যায়ের বিচার নিশ্চিত হয়।
যে রাষ্ট্রে নাগরিকেরা বিশ্বাস করে যে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথমে একটি ভিডিওকে ভাইরাল হতে হবে, সেখানে সমস্যাটি কেবল সহিংসতার নয়; সমস্যাটি আস্থার। আর সেই আস্থা পুনর্গঠনই আজকের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ।
জেসিকা কিম 



















