০৬:০৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
পাঞ্জাবে ভাইরাল ভিডিও ঘিরে তীব্র বিতর্ক, ‘গুরু দোখি’ ঘোষণা ভগবন্ত মানকে তৃণমূলে বড় ভাঙনের আশঙ্কা, ২০ সাংসদের এনসিপিআইতে যোগদানের দাবি; আদালতে ভবানীপুর ফল চ্যালেঞ্জ মমতার মার্কিন অবরোধ উপেক্ষা করে ইরানের বন্দরের পথে পাঁচ জাহাজ, দাবি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ডিম-ক্ষোভে আবারও টিএমসি নেতা নিশানায়, গ্রেপ্তারের পর সৌমিত্র বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর হামলা নরসিংদীর রায়পুরায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে নিহত ১ বাংলাদেশে আরও এক শিশুর মৃত্যু, হামে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৬৫৭ ফাঁদ থেকে উদ্ধার হওয়া বাঘিনী ফিরছে সুন্দরবনে, জুনেই অবমুক্তির সিদ্ধান্ত চায়ের কাপেই বিশ্বায়নের গল্প: নতুন যুগে কেন আরও বেশি সহযোগিতার প্রয়োজন ন্যায়বিচারের আগে কি ভাইরাল ভিডিও জরুরি? আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের পাঁচ বছরের মূল্য

আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের পাঁচ বছরের মূল্য

আর দুই মাস পর আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পূর্ণ হবে।

এই পাঁচ বছরে আফগান জনগণের প্রতি তালেবানের আচরণ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে তাদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে বিপুল প্রমাণ ও নথিপত্র প্রকাশিত হয়েছে। তবুও বিশ্ব শুধু যে তাদের শাসনের অবসান ঘটাতে কোনো অর্থবহ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে তা নয়, বরং কিছু দেশ বর্তমান পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে এবং তালেবানকে আফগানিস্তানের বৈধ শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পথেও এগোচ্ছে।

গত বছর রাশিয়া তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশ হয়। ২০২৩ সালে চীন প্রথম দেশ হিসেবে তালেবানের রাষ্ট্রদূতকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। অন্যদিকে ইরান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান, ভারত ও তুরস্ক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও আফগান দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো তালেবান প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দিয়েছে এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কর্মসম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

পাকিস্তান, যার আফগান জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, শুরুতে মনে করেছিল তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন আফগানিস্তানে তার পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। কিন্তু আজ পাকিস্তান সমর্থক থেকে প্রতিপক্ষে পরিণত হয়েছে এবং তালেবানের উত্থানের ফলে নিজেও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

যদিও কিছু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্ক আশাব্যঞ্জক বলে মনে হতে পারে, তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। তালেবানের প্রত্যাবর্তন শুধু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে গভীর সংকট সৃষ্টি করেনি, বরং পুরো অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যয় চাপিয়ে দিয়েছে।

দেশের ভেতরে তালেবান জনগণের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নারী এবং হাজারা, শিয়া, হিন্দু ও শিখদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে আফগান নারীদের জীবন বিশেষভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে নারীর অধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের এক বৈঠকে মেরিল স্ট্রিপ বলেছিলেন, “আফগানিস্তানে একটি বিড়ালেরও নারীর চেয়ে বেশি অধিকার রয়েছে। একটি বিড়াল বাইরে যেতে পারে, পার্কে যেতে পারে, সূর্যের আলোয় বসতে পারে; কিন্তু আফগান নারীরা সেই অধিকারও পায় না।”

নারীদের পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। তাদের অধিকার সীমিত করতে তালেবান নিয়মিত নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করছে।

সাম্প্রতিক এক ঘটনায় বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে তালেবান শিশু বিবাহকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের নামে প্রচারিত একটি দণ্ডবিধিতে দাসপ্রথাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানে স্বামীদের স্ত্রীকে প্রহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং একজন নারীর বাবার বাড়িতে যাওয়ার অধিকারও স্বামীর অনুমতির ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।

Afghanistan: One year of Taliban rule | Chatham House – International  Affairs Think Tank

আরেকটি সাম্প্রতিক পদক্ষেপে তালেবান ঘোষণা করেছে যে নারীদের এমন পোশাক পরতে হবে, যাকে তারা “ইসলামি হিজাব” বলে অভিহিত করে। এই অজুহাতে আফগানিস্তানজুড়ে বিপুলসংখ্যক নারী ও কিশোরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আটক অবস্থায় অনেকেই নির্যাতন, অপমান এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

গত ৯ জুন হেরাত শহরের হাজারা অধ্যুষিত জাবর-ইল এলাকায় হিজাববিধি প্রয়োগের অজুহাতে তালেবান বহু হাজারা নারী ও কিশোরীকে আটক করে বলে খবর প্রকাশিত হয়। এর প্রতিবাদে স্থানীয় জনগণ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেয় এবং নারী-পুরুষ উভয়েই এটিকে নারীর অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আখ্যা দেয়।

বিক্ষোভ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর সশস্ত্র তালেবান সদস্যদের একটি বড় দল ঘটনাস্থলে আসে এবং কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত দুইজন নিহত হন, যার মধ্যে ১২ বছর বয়সী এক শিশুও ছিল। আহত হন আরও ২২ জন। পরে তালেবান বহু নারী ও পুরুষকে “বিদ্রোহে অংশগ্রহণের” অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। বিক্ষোভের প্রায় ৪০ ঘণ্টা পরও তাদের ভাগ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায়নি।

হাজারা ও শিয়া জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তালেবান কোনো নৈতিক দায় অনুভব করে না বলেই মনে হয়। তাদের দৃষ্টিতে এসব সম্প্রদায় “প্রকৃত মুসলমান” নয়; বরং “রাফিদা” হিসেবে চিহ্নিত। ফলে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি বা নিপীড়নকে তারা বৈধ, এমনকি ধর্মীয়ভাবে পুরস্কৃত হওয়ার মতো কাজ বলে বিবেচনা করে।

একজন স্থানীয় সূত্র লেখককে জানিয়েছেন, জাবর-ইল এলাকায় বিক্ষোভে হামলার সময় ও পরে তালেবান বিপুলসংখ্যক বাসিন্দাকে, এমনকি ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদেরও গ্রেপ্তার করে। তাদের ওপর কঠোর নির্যাতন চালিয়ে পরে তালেবানের পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

যদিও জাতিসংঘের কিছু কর্মকর্তা ও মানবাধিকার সংগঠন এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, আফগানিস্তানের অনেক মানুষ মনে করে এসব নিন্দা পরিস্থিতির কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে না। তালেবান আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে “কাফেরদের কণ্ঠস্বর” হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে।

এদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাদাখশান প্রদেশে অবৈধ স্বর্ণ উত্তোলনের অভিযোগে বহু স্থানীয় বাসিন্দাকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সেখানে বাইরের সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে তালেবান-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো বাদাখশানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে খনিজসম্পদ উত্তোলন করছে এবং আয় নিজেদের মধ্যে বণ্টন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব ঘটনার পাশাপাশি আফগানিস্তানকে ক্রমেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালেবানের ছত্রছায়ায় অন্তত ২৫টি সন্ত্রাসী সংগঠন আফগানিস্তানে সক্রিয় রয়েছে। তালেবানের দেওয়া সহায়তা ও নিরাপদ পরিবেশের কারণে এসব গোষ্ঠী তাদের সামরিক সক্ষমতা ও জনবল ক্রমাগত বাড়াচ্ছে।

তালেবানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপে রাখতে নিজেদের সক্ষমতাকে ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। অভিবাসীদের দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার এবং এক ধরনের “জিম্মি কূটনীতি” তাদের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বর্ণনা করা হয়। একই সঙ্গে তারা যে মানবিক সংকট তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে, সেই সংকটকেই মানবিক সহায়তা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শাসন, নিয়ন্ত্রণ ও দমনের উপকরণে পরিণত করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে আফগান জনগণ বিশ্বের কাছে প্রশ্ন রাখছে: তালেবানকে আর কতদিন এবং কতদূর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন চালিয়ে যেতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই হুমকির প্রকৃত মাত্রা উপলব্ধি করে?

লেখকের দৃষ্টিতে, আফগানিস্তানের বর্তমান অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রতিদিন শুধু সাংস্কৃতিক, মানবিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনই ঘটছে না; একই সঙ্গে এটি ক্রমশ এমন সক্ষমতা তৈরি করছে, যা বিশ্বের অন্য কোথাও ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার চেয়েও বড় কোনো বিপর্যয়ের জন্ম দিতে পারে।

লেখকঃ  বেসমিল্লাহ তাবান পোল্যান্ডের ক্রাকোভে অবস্থিত জাগিয়েলোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা অধ্যয়নের পিএইচডি গবেষক। ২০০২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি আফগান জাতীয় পুলিশের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে অপরাধ তদন্ত বিভাগের মহাপরিচালকের পদও অন্তর্ভুক্ত।

জনপ্রিয় সংবাদ

পাঞ্জাবে ভাইরাল ভিডিও ঘিরে তীব্র বিতর্ক, ‘গুরু দোখি’ ঘোষণা ভগবন্ত মানকে

আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের পাঁচ বছরের মূল্য

০৪:৫৪:২৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬

আর দুই মাস পর আফগানিস্তানে তালেবান পুনরায় ক্ষমতায় আসার পাঁচ বছর পূর্ণ হবে।

এই পাঁচ বছরে আফগান জনগণের প্রতি তালেবানের আচরণ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে তাদের আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে বিপুল প্রমাণ ও নথিপত্র প্রকাশিত হয়েছে। তবুও বিশ্ব শুধু যে তাদের শাসনের অবসান ঘটাতে কোনো অর্থবহ পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে তা নয়, বরং কিছু দেশ বর্তমান পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে এবং তালেবানকে আফগানিস্তানের বৈধ শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার পথেও এগোচ্ছে।

গত বছর রাশিয়া তালেবানকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশ হয়। ২০২৩ সালে চীন প্রথম দেশ হিসেবে তালেবানের রাষ্ট্রদূতকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে। অন্যদিকে ইরান, উজবেকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান, কাজাখস্তান, ভারত ও তুরস্ক আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না দিলেও আফগান দূতাবাস ও কনস্যুলেটগুলো তালেবান প্রতিনিধিদের হাতে তুলে দিয়েছে এবং তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কর্মসম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

পাকিস্তান, যার আফগান জিহাদি গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সমর্থনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে, শুরুতে মনে করেছিল তালেবানের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন আফগানিস্তানে তার পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়নে সহায়ক হবে। কিন্তু আজ পাকিস্তান সমর্থক থেকে প্রতিপক্ষে পরিণত হয়েছে এবং তালেবানের উত্থানের ফলে নিজেও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

যদিও কিছু আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পক্ষের সঙ্গে তালেবানের সম্পর্ক আশাব্যঞ্জক বলে মনে হতে পারে, তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর উদ্বেগ ক্রমাগত বাড়ছে। তালেবানের প্রত্যাবর্তন শুধু আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে গভীর সংকট সৃষ্টি করেনি, বরং পুরো অঞ্চলের দেশগুলোর ওপর অভূতপূর্ব নিরাপত্তা ব্যয় চাপিয়ে দিয়েছে।

দেশের ভেতরে তালেবান জনগণের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে নারী এবং হাজারা, শিয়া, হিন্দু ও শিখদের মতো ঝুঁকিপূর্ণ জাতিগত ও ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে আফগান নারীদের জীবন বিশেষভাবে কঠিন হয়ে উঠেছে। এ প্রসঙ্গে তালেবান শাসিত আফগানিস্তানে নারীর অধিকার বিষয়ে জাতিসংঘের এক বৈঠকে মেরিল স্ট্রিপ বলেছিলেন, “আফগানিস্তানে একটি বিড়ালেরও নারীর চেয়ে বেশি অধিকার রয়েছে। একটি বিড়াল বাইরে যেতে পারে, পার্কে যেতে পারে, সূর্যের আলোয় বসতে পারে; কিন্তু আফগান নারীরা সেই অধিকারও পায় না।”

নারীদের পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। তাদের অধিকার সীমিত করতে তালেবান নিয়মিত নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করছে।

সাম্প্রতিক এক ঘটনায় বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে তালেবান শিশু বিবাহকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের নামে প্রচারিত একটি দণ্ডবিধিতে দাসপ্রথাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সেখানে স্বামীদের স্ত্রীকে প্রহার করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে এবং একজন নারীর বাবার বাড়িতে যাওয়ার অধিকারও স্বামীর অনুমতির ওপর নির্ভরশীল করা হয়েছে।

Afghanistan: One year of Taliban rule | Chatham House – International  Affairs Think Tank

আরেকটি সাম্প্রতিক পদক্ষেপে তালেবান ঘোষণা করেছে যে নারীদের এমন পোশাক পরতে হবে, যাকে তারা “ইসলামি হিজাব” বলে অভিহিত করে। এই অজুহাতে আফগানিস্তানজুড়ে বিপুলসংখ্যক নারী ও কিশোরীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আটক অবস্থায় অনেকেই নির্যাতন, অপমান এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন।

গত ৯ জুন হেরাত শহরের হাজারা অধ্যুষিত জাবর-ইল এলাকায় হিজাববিধি প্রয়োগের অজুহাতে তালেবান বহু হাজারা নারী ও কিশোরীকে আটক করে বলে খবর প্রকাশিত হয়। এর প্রতিবাদে স্থানীয় জনগণ শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেয় এবং নারী-পুরুষ উভয়েই এটিকে নারীর অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন বলে আখ্যা দেয়।

বিক্ষোভ শুরু হওয়ার কিছুক্ষণ পর সশস্ত্র তালেবান সদস্যদের একটি বড় দল ঘটনাস্থলে আসে এবং কোনো পূর্বসতর্কতা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর গুলি চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, অন্তত দুইজন নিহত হন, যার মধ্যে ১২ বছর বয়সী এক শিশুও ছিল। আহত হন আরও ২২ জন। পরে তালেবান বহু নারী ও পুরুষকে “বিদ্রোহে অংশগ্রহণের” অভিযোগে গ্রেপ্তার করে। বিক্ষোভের প্রায় ৪০ ঘণ্টা পরও তাদের ভাগ্য সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায়নি।

হাজারা ও শিয়া জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তালেবান কোনো নৈতিক দায় অনুভব করে না বলেই মনে হয়। তাদের দৃষ্টিতে এসব সম্প্রদায় “প্রকৃত মুসলমান” নয়; বরং “রাফিদা” হিসেবে চিহ্নিত। ফলে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি বা নিপীড়নকে তারা বৈধ, এমনকি ধর্মীয়ভাবে পুরস্কৃত হওয়ার মতো কাজ বলে বিবেচনা করে।

একজন স্থানীয় সূত্র লেখককে জানিয়েছেন, জাবর-ইল এলাকায় বিক্ষোভে হামলার সময় ও পরে তালেবান বিপুলসংখ্যক বাসিন্দাকে, এমনকি ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদেরও গ্রেপ্তার করে। তাদের ওপর কঠোর নির্যাতন চালিয়ে পরে তালেবানের পুলিশ কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

যদিও জাতিসংঘের কিছু কর্মকর্তা ও মানবাধিকার সংগঠন এসব ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, আফগানিস্তানের অনেক মানুষ মনে করে এসব নিন্দা পরিস্থিতির কোনো বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে না। তালেবান আন্তর্জাতিক সমালোচনাকে “কাফেরদের কণ্ঠস্বর” হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে।

এদিকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় বাদাখশান প্রদেশে অবৈধ স্বর্ণ উত্তোলনের অভিযোগে বহু স্থানীয় বাসিন্দাকে গ্রেপ্তার ও নির্যাতন করা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। সেখানে বাইরের সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং স্থানীয় জনগণের ওপর দমন-পীড়ন অব্যাহত রয়েছে। একই সময়ে তালেবান-সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো বাদাখশানসহ বিভিন্ন অঞ্চলে খনিজসম্পদ উত্তোলন করছে এবং আয় নিজেদের মধ্যে বণ্টন করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এসব ঘটনার পাশাপাশি আফগানিস্তানকে ক্রমেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তালেবানের ছত্রছায়ায় অন্তত ২৫টি সন্ত্রাসী সংগঠন আফগানিস্তানে সক্রিয় রয়েছে। তালেবানের দেওয়া সহায়তা ও নিরাপদ পরিবেশের কারণে এসব গোষ্ঠী তাদের সামরিক সক্ষমতা ও জনবল ক্রমাগত বাড়াচ্ছে।

তালেবানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে চাপে রাখতে নিজেদের সক্ষমতাকে ব্যবহার করার অভিযোগও রয়েছে। অভিবাসীদের দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার এবং এক ধরনের “জিম্মি কূটনীতি” তাদের পররাষ্ট্রনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে বর্ণনা করা হয়। একই সঙ্গে তারা যে মানবিক সংকট তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে, সেই সংকটকেই মানবিক সহায়তা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শাসন, নিয়ন্ত্রণ ও দমনের উপকরণে পরিণত করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে আফগান জনগণ বিশ্বের কাছে প্রশ্ন রাখছে: তালেবানকে আর কতদিন এবং কতদূর পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়ন ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন চালিয়ে যেতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই হুমকির প্রকৃত মাত্রা উপলব্ধি করে?

লেখকের দৃষ্টিতে, আফগানিস্তানের বর্তমান অবস্থা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে প্রতিদিন শুধু সাংস্কৃতিক, মানবিক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনই ঘটছে না; একই সঙ্গে এটি ক্রমশ এমন সক্ষমতা তৈরি করছে, যা বিশ্বের অন্য কোথাও ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার চেয়েও বড় কোনো বিপর্যয়ের জন্ম দিতে পারে।

লেখকঃ  বেসমিল্লাহ তাবান পোল্যান্ডের ক্রাকোভে অবস্থিত জাগিয়েলোনিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা অধ্যয়নের পিএইচডি গবেষক। ২০০২ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি আফগান জাতীয় পুলিশের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, যার মধ্যে অপরাধ তদন্ত বিভাগের মহাপরিচালকের পদও অন্তর্ভুক্ত।