শিকারিদের পাতা অবৈধ ফাঁদে আটকা পড়ে গুরুতর আহত হওয়া একটি স্ত্রী রয়েল বেঙ্গল টাইগার দীর্ঘ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর আবারও সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশে ফিরে যেতে যাচ্ছে। বন বিভাগ জানিয়েছে, চলতি জুন মাসের শেষ দিকে বাঘিনীটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হবে।
প্রায় ৯ থেকে ১০ বছর বয়সী বাঘিনীটিকে গত ৪ জানুয়ারি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের শারকির খালের পাশের বৈরাগী বাড়ি এলাকায় উদ্ধার করা হয়। বন কর্মকর্তারা ডার্ট গান ব্যবহার করে অচেতন করার পর প্রাণীটিকে ফাঁদ থেকে মুক্ত করেন।
উদ্ধারের সময় বাঘিনীটির অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। কয়েক দিন ধরে ফাঁদে আটকে থাকার কারণে সামনের বাঁ পায়ে গভীর ক্ষত তৈরি হয়েছিল। ক্ষতস্থানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পচনও শুরু হয়েছিল বলে জানান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
দীর্ঘ চিকিৎসায় সুস্থতা
উদ্ধারের পর বাঘিনীটিকে খুলনায় বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে ছয় সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে তার চিকিৎসা শুরু করা হয়।
চিকিৎসা কার্যক্রমে যুক্ত গাজীপুর সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ডা. জুলকার নাঈন জানান, জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত বাঘিনীটিকে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক, ইনজেকশন এবং ক্ষত পরিচর্যার মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এপ্রিল থেকে তার শারীরিক অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে এবং বর্তমানে সে সম্পূর্ণ সুস্থ।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাঘিনীটি এখন স্বাভাবিকভাবে খাবার গ্রহণ করছে এবং বনে শিকার করার জন্য প্রয়োজনীয় শারীরিক সক্ষমতা ও স্বাভাবিক প্রবৃত্তিও ফিরে পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে অবমুক্তি
প্রধান বন সংরক্ষক আমির হোসেন চৌধুরী জানান, গত মে মাসে অনুষ্ঠিত বাঘ বিশেষজ্ঞদের এক বৈঠকে প্রাণীটিকে পুনরায় সুন্দরবনে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জুনের শেষ নাগাদ বাঘিনীটিকে তার প্রাকৃতিক আবাসস্থলে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।
অবমুক্তির পর বাঘটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য স্যাটেলাইট কলার ব্যবহারের বিষয়টি আলোচনায় এলেও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য না হওয়ায় পরিকল্পনাটি বাতিল করা হয়েছে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, বাঘিনীটির বাঁ পায়ের ত্বক, পেশি ও টিস্যুর বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। নিবিড় পরিচর্যা ও সঠিক চিকিৎসার ফলে সে পুরোপুরি সুস্থ হয়েছে এবং স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক আচরণ ও শিকার করার ক্ষমতা ফিরে পেয়েছে।
বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবনে শিকার প্রতিরোধে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। বর্তমানে দুর্গম এলাকায় নিয়মিত পদচারণা টহলের পাশাপাশি আটটি ড্রোন ব্যবহার করে অবৈধ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্মার্ট পেট্রোলিং ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে।

বাঘ ও হরিণ রক্ষায় জোরদার নজরদারি
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সুন্দরবন থেকে প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ফুট অবৈধ ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব ফাঁদ মূলত হরিণ ও বাঘ শিকারের উদ্দেশ্যে পাতা হয়েছিল। কঠোর নজরদারি ও আইন প্রয়োগের কারণে শিকারি চক্রের তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে দাবি বন বিভাগের।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও ওয়াইল্ডটিমের প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সীমিত সম্পদের মধ্যেও বন বিভাগ বাঘিনীটিকে বাঁচাতে সক্ষম হয়েছে, যা প্রশংসনীয়। বয়সের কারণে শিকারে কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও একটি বাঘের স্বাভাবিক জীবন বনে কাটানোর সুযোগ থাকা উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ক্যামেরা ট্র্যাপ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের অংশের সুন্দরবনে বর্তমানে ১২৫টি বাঘ রয়েছে। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ১১৪ এবং ২০১৫ সালে ছিল ১০৬। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, শিকার, জলবায়ু পরিবর্তন এবং লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েল বেঙ্গল টাইগারের দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে রয়েছে।
ফাঁদ থেকে উদ্ধার হওয়া বাঘিনী সুস্থ হয়ে জুনে সুন্দরবনে ফিরছে
ফাঁদে আটকা পড়ে গুরুতর আহত হওয়া এক বাঘিনী দীর্ঘ চিকিৎসার পর জুনের শেষ দিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করা হবে। বন বিভাগের নজরদারিও জোরদার করা হয়েছে।
ফাঁদ থেকে উদ্ধার হওয়া বাঘিনী
ফাঁদে আটকা পড়ে গুরুতর আহত হওয়া রয়েল বেঙ্গল টাইগারটি দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে আবারও সুন্দরবনে ফিরতে যাচ্ছে। জুনের শেষ দিকে অবমুক্তির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বন বিভাগ। বাঘ সংরক্ষণে চলমান উদ্যোগ ও সুন্দরবনের সর্বশেষ বাঘ গণনার তথ্য জানতে পড়ুন পুরো প্রতিবেদন।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















