ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্রুত সাফল্য অর্জনের আশা করেছিলেন। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠায় এখন তিনি এই যুদ্ধকে কীভাবে সফল বলে তুলে ধরা যায়, তা নিয়ে নতুন ব্যাখ্যা খুঁজছেন। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়া এবং ব্যাপক বোমা হামলার পরও তেহরান আলোচনায় ফেরার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
দ্রুত বিজয়ের আশা ভেঙে যাচ্ছে
ট্রাম্প নিজেকে অনির্দেশ্য নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে পছন্দ করেন। তবে ইরান যুদ্ধের ক্ষেত্রে তার বক্তব্যে বারবার পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। কখনও তিনি বলেছেন কয়েক দিনের মধ্যেই যুদ্ধ শেষ হতে পারে, আবার কখনও বলেছেন এটি পাঁচ সপ্তাহ বা তারও বেশি সময় চলতে পারে।
এই পরিবর্তিত বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, যুদ্ধের শুরুতে যে দ্রুত বিজয়ের প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। খামেনিকে হত্যা করা এবং ইরানে ব্যাপক বোমা হামলার পরও দেশটির নেতৃত্ব আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

ইরানের পাল্টা বার্তা
ইরান স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তারা লড়াই চালিয়ে যেতে প্রস্তুত। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাই নয়, উপসাগরীয় অঞ্চলের বেসামরিক এলাকাও হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছে তারা।
এর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোকেও লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে তেহরান। ইরানের বার্তা পরিষ্কার—তারা পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা রাখে এবং যুদ্ধবিরতির আগে নিজেদের প্রতিরোধ ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে চায়।

দীর্ঘ যুদ্ধের বাস্তবতা
এই অবস্থায় ট্রাম্প এমন এক পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, যা তিনি সাধারণত এড়িয়ে চলেন। তার রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, তিনি দ্রুত ফল পাওয়া যায় এমন সামরিক পদক্ষেপ নিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।
কিন্তু ইরানের সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। এতে মার্কিন সেনাদের প্রাণহানি বাড়তে পারে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
ইয়েমেনের অভিজ্ঞতা
গত বছর ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক অভিযানেও একই ধরনের অভিজ্ঞতা হয়েছিল। শুরুতে শক্তিশালী হামলা চালানো হলেও পরে বোঝা যায় যে হুথিদের পুরো সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করতে দীর্ঘ সময় লাগবে।
পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত একটি সমঝোতায় রাজি হন। সেই চুক্তিতে হুথিরা মার্কিন জাহাজে হামলা বন্ধ করতে সম্মত হয়, যদিও তারা ইসরায়েলি স্বার্থের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে।
ইরানের সরকার দুর্বল হলেও টিকে আছে
বহু বছর ধরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইরানের সরকার চাপের মুখে রয়েছে। জানুয়ারিতে বড় ধরনের বিক্ষোভেও হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে।
তবে শুধুমাত্র আকাশপথে হামলা চালিয়ে এমন একটি ব্যবস্থাকে দ্রুত ভেঙে ফেলা কঠিন, যা কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীরে প্রতিষ্ঠিত।
ট্রাম্পের বিকল্প পরিকল্পনা
ট্রাম্পের মতে, ইরানে ভেনেজুয়েলার মতো একটি পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। যেমন যুক্তরাষ্ট্র জানুয়ারিতে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করেছিল, তেমনি খামেনির মৃত্যুর পর ইরানের ভেতর থেকে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী নেতৃত্ব উঠে আসতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তবে আপাতত ইরানের সরকার এমন কোনো আলোচনা বা সমঝোতায় আগ্রহ দেখাচ্ছে না।

ইরানের আশঙ্কা
তেহরানের ধারণা, এখনই আলোচনা শুরু করলে এবং কোনো প্রতিরোধ ক্ষমতা না দেখিয়ে চুক্তি করলে ভবিষ্যতে আবারও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল নতুন কোনো অজুহাতে হামলা চালাতে পারে।
এই আশঙ্কার কারণও রয়েছে। ট্রাম্প নিজেই এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি চাইলে দীর্ঘ সময় ধরে যুদ্ধ চালাতে পারেন অথবা দুই-তিন দিনের মধ্যেই তা শেষ করে ইরানকে সতর্ক করে দিতে পারেন যে তারা আবার পারমাণবিক বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি শুরু করলে ভবিষ্যতে আবার হামলা হতে পারে।
যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা
এই অস্পষ্ট অবস্থান ট্রাম্পকে যেকোনো সময় যুদ্ধের কৌশল পরিবর্তনের সুযোগ দিচ্ছে। যদি যুদ্ধের খরচ এবং ঝুঁকি বেশি হয়ে যায়, তাহলে খামেনির মৃত্যু এবং তেহরানে ধ্বংসযজ্ঞের ছবিকেই তিনি বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে পারেন।
কিন্তু এর ফলাফল হবে আরও বড় আঞ্চলিক অস্থিরতা। বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্রে থাকা মিত্র দেশগুলোর ক্ষতি বাড়বে এবং ইরানের বিরোধী গোষ্ঠীগুলো, যাদের অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তারা হয়তো শেষ পর্যন্ত খুব সামান্যই লাভ পাবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















