ইরানের রাজধানী তেহরান এখন ভয় ও আতঙ্কে আচ্ছন্ন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক বিমান হামলায় শহরের বহু এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বিস্ফোরণে কেঁপে উঠছে একের পর এক এলাকা, ভেঙে পড়ার মুখে আবাসিক ভবন, হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত, আর আতঙ্কে শহর ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করছে হাজার হাজার মানুষ।
রাজধানীজুড়ে বিস্ফোরণ ও ধ্বংসস্তূপ
সোমবার তেহরানের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক বিমান হামলার পর ধ্বংসের দৃশ্য ছড়িয়ে পড়ে শহরজুড়ে। কোথাও অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ধসে পড়ার উপক্রম, কোথাও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে কাচের টুকরো, লোহার ধ্বংসাবশেষ আর উড়ে যাওয়া কাগজপত্র।
একটি হাসপাতালের কক্ষের জানালা উড়ে গেছে বিস্ফোরণের শক্তিতে, বিছানার উপর পড়ে আছে ইট-পাথর ও ধ্বংসাবশেষ।
বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তিন দিনের টানা বোমাবর্ষণের পর হামলার তীব্রতা আরও বেড়েছে।

কারাগার এলাকা খালি করার সতর্কতা
দিনের শেষদিকে ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানের কুখ্যাত এভিন কারাগার সংলগ্ন এলাকায় জরুরি সতর্কতা জারি করে। সেখানে অবস্থানকারীদের দ্রুত এলাকা ছেড়ে যেতে বলা হয়।
সতর্কতার কিছুক্ষণ পরই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন কার্যালয়, পুলিশ স্থাপনা এবং সরকারি অবকাঠামো।
আতঙ্কে শহর ছাড়ছে মানুষ
তেহরান সাধারণত ব্যস্ততা, যানজট আর কফি সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। কিন্তু এখন শহর অস্বাভাবিকভাবে নীরব। দোকানপাট, ওষুধের দোকান ও অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে।
অনেক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শহর ছেড়ে উত্তরাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকা ও কাস্পিয়ান সাগরের উপকূলে চলে যাচ্ছেন।

তবে সবাই বেরিয়ে যেতে পারছেন না। অনেকে বলছেন, কোথাও নিরাপদ আশ্রয় নেই। শহরের রাস্তাগুলো ফাঁকা হলেও শহরের বাইরে যাওয়ার পথে তৈরি হয়েছে দীর্ঘ যানজট।
এদিকে নিরাপত্তা বাহিনী শহরের বিভিন্ন চেকপোস্টে গাড়ি ও পথচারীদের তল্লাশি করছে।
সাধারণ মানুষের উপর বাড়ছে বিপদের ঝুঁকি
তেহরানের জনসংখ্যা এক কোটিরও বেশি। শহরের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক ভবনের পাশেই রয়েছে স্কুল, হাসপাতাল, পুলিশ স্টেশন ও সরকারি কার্যালয়।
এ কারণে সামরিক ও সরকারি স্থাপনার পাশাপাশি হামলা বাড়লে সাধারণ মানুষের ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে।
ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, দেশজুড়ে নিহতের সংখ্যা ইতিমধ্যে অন্তত ৭৮৭ জনে পৌঁছেছে। দক্ষিণ ইরানের একটি স্কুলে হামলায় অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়েছে, যাদের মধ্যে অনেক শিশু রয়েছে।
হাসপাতাল ক্ষতিগ্রস্ত, নবজাতকদের সরিয়ে নেওয়া

তেহরানের গান্ধী হাসপাতাল গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিস্ফোরণের পর হাসপাতালটি থেকে রোগীদের দ্রুত সরিয়ে নিতে হয়েছে।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, ইনকিউবেটরে থাকা নবজাতকসহ বহু রোগীকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হয়েছে। হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা বিভাগেও রোগী ছিল।
ঐতিহাসিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত
তেহরানের অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা গোলেস্তান প্রাসাদও ক্ষতির মুখে পড়েছে। কাছাকাছি একটি পুলিশ স্টেশনে হামলার ধাক্কায় প্রাসাদের বিখ্যাত আয়নার হল ও পারস্য উদ্যানের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম।
শতাব্দী প্রাচীন এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি বহু যুদ্ধ ও রাজনৈতিক পরিবর্তন টিকে গেলেও এবার হামলার অভিঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সমাজজুড়ে বাড়ছে গভীর আতঙ্ক
এই যুদ্ধ এমন এক সময়ে শুরু হয়েছে যখন ইরানের সমাজ আগে থেকেই রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও অর্থনৈতিক সংকটে বিপর্যস্ত।

বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, কেবল প্রাণহানি নয়, বাড়িঘর বা ব্যবসা হারানোও মানুষের জন্য বড় ধাক্কা হয়ে উঠছে।
একজন বাসিন্দা বলেন, “বিস্ফোরণের শব্দ এত কাছাকাছি যে মনে হচ্ছিল আমাদের বাড়িই ভেঙে পড়বে।”
তেহরানের আকাশে দিনরাত ধোঁয়ার কুণ্ডলী এখন যেন যুদ্ধের নতুন প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















