মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে জার্মান চ্যান্সেলরের সঙ্গে বৈঠকে ইউরোপীয় মিত্রদের তীব্র সমালোচনা করেছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশংসা করেছেন এবং ইরানের ওপর হামলার সিদ্ধান্তকে ন্যায্য বলে দাবি করেছেন। মঙ্গলবারের এই বৈঠকে ট্রাম্প বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে তার সামরিক পদক্ষেপ না হলে পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হতে পারত।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জের সঙ্গে আলোচনার সময় ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, আলোচনার মধ্যেই ইরানে হামলার নির্দেশ দেওয়া ছিল সঠিক সিদ্ধান্ত।
ইরান হামলা নিয়ে ট্রাম্পের যুক্তি
ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক হামলা ইরানের সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাত ঠেকিয়েছে। তার মতে, যদি এই হামলা না হতো, তাহলে বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হতে পারত এবং বহু দেশ এতে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী ইরানের নৌ ও বিমানঘাঁটির ওপর সফল হামলা চালিয়েছে এবং বেশিরভাগ লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে।
ইসরায়েল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইসরায়েল হয়তো প্রথমে হামলা চালাতে যাচ্ছিল, কিন্তু তিনি তা চাননি। তাই তার সিদ্ধান্তই পরিস্থিতিকে পরিবর্তন করেছে।

স্পেন ও যুক্তরাজ্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ
বৈঠকে ট্রাম্প বিশেষভাবে স্পেনের সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, চলমান সংঘাতের সময় স্পেন যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের যৌথ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়নি।
স্পেনের রোটা নৌঘাঁটি ও মোরোন বিমানঘাঁটি ব্যবহার করতে না দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধ করে দেওয়ার কথাও বিবেচনা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, স্পেন খুবই অসহযোগিতা করেছে এবং যুক্তরাজ্যও খুব বেশি সহযোগিতা করেনি। ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত দিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে ঘাঁটি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বিলম্ব হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সূত্র জানিয়েছে, ট্রাম্প যদি বাস্তবে কোনো বাণিজ্যিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, তখনই তারা আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের ‘অ্যান্টি-কোয়েরশন’ বাণিজ্যনীতি ব্যবহার করতে পারে। এই নীতির মাধ্যমে শুল্ক, কোটা বা বাজারে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞার মতো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব।

জার্মান চ্যান্সেলরের প্রতিক্রিয়া
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্জ সরাসরি স্পেনের পক্ষে কথা বলেননি। তবে তিনি আলোচনাকে ইউরোপের প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির প্রসঙ্গে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, ন্যাটোতে যে তিন থেকে সাড়ে তিন শতাংশ প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে, সে লক্ষ্যে পৌঁছাতে স্পেনকে রাজি করানোর চেষ্টা চলছে। তার মতে, এই বিষয়ে স্পেন এখনও পিছিয়ে রয়েছে।
তবে ট্রাম্প এতে সন্তুষ্ট হননি। তিনি আবারও বলেন, স্পেন এবং যুক্তরাজ্য উভয়ই সহযোগিতায় অনীহা দেখিয়েছে।
জার্মানির প্রসঙ্গে রসিক মন্তব্য
আলোচনার এক পর্যায়ে ট্রাম্প জার্মানিকে নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, জার্মানিকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে—এ নিয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। পরে হাসতে হাসতে তিনি জার্মান চ্যান্সেলরের পায়ে চাপড় দিয়ে মন্তব্যটি হালকা করার চেষ্টা করেন।
চীনের প্রশংসা ও আসন্ন সফর
বৈঠকে ট্রাম্প চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক নিয়েও কথা বলেন। তিনি বলেন, একসময় যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে বাণিজ্যে বড় অঙ্কের ক্ষতির মুখে পড়ত, কিন্তু এখন সেই পরিস্থিতি বদলেছে।

তার মতে, চীনের সঙ্গে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক খুব ভালো। মার্চের শেষ দিকে চীন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের, যেখানে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা।
শুল্ক নীতি নিয়ে অস্পষ্টতা
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে শুল্ক আরোপের ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। এরপর থেকেই তিনি সমালোচকদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন।
তবে ভবিষ্যতের বাণিজ্য কৌশল সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ট্রাম্প স্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা তুলে ধরতে পারেননি। তিনি বলেন, পাঁচ মাস পর্যন্ত ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা যেতে পারে এবং এ সময় বিভিন্ন দেশের ওপর আলাদা শুল্ক নির্ধারণের বিষয়ে গবেষণা করা হবে।
ইরানের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া
ট্রাম্প বলেন, ইরান এখনও বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে, তবে তিনি মনে করেন এই প্রতিক্রিয়া ধীরে ধীরে কমে যাবে।
তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের অব্যাহত সামরিক চাপের মুখে ইরানের প্রতিক্রিয়া দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
ইউরোপীয় কমিশনের বক্তব্য
স্পেনের সঙ্গে বাণিজ্য বন্ধের হুমকির পর ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বার্থ রক্ষায় তারা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
ইইউর বাণিজ্য মুখপাত্র ওলোফ গিল বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে এবং তারা আশা করছে যুক্তরাষ্ট্র তাদের যৌথ ঘোষণায় করা প্রতিশ্রুতি মেনে চলবে।

জার্মান চ্যান্সেলর পরে বলেন, স্পেনকে আলাদা করে শাস্তি দেওয়ার সুযোগ নেই, কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি ঐক্যবদ্ধ জোট হিসেবে কাজ করে। কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা পুরো জোটের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
কংগ্রেসে নতুন তথ্য
এদিকে মার্কিন কংগ্রেসে এক শুনানিতে প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক উপমন্ত্রী এলব্রিজ কোলবি ইঙ্গিত দেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার ঘটনা ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের অংশ হতে পারে।
তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য ভিন্ন এবং তারা জোরপূর্বক শাসন পরিবর্তনের নীতি অনুসরণ করছে না।

অর্থনীতি ও রাজনীতিতে প্রভাব
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দামও বেড়েছে, যা নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে জানান, পারস্য উপসাগর দিয়ে চলাচলকারী ট্যাঙ্কার ও জাহাজের জন্য ঝুঁকি বিমা সহায়তা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে নিরাপত্তা দেবে।
তিনি বলেন, যেকোনো পরিস্থিতিতেই বিশ্বে জ্বালানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করবে যুক্তরাষ্ট্র। তার দাবি, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















