০১:২৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
ইরান যুদ্ধকে জ্বালানি যুদ্ধে পরিনত করতে সমর্থ হয়েছে দুবাইয়ে মাত্র ২৫ হাজার টাকায় ছোট ঘরে জীবন: নেটিজেনদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া চীনের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান-আফগানিস্তান নতুন শান্তি আলোচনা, যুদ্ধবিরতি ও সীমান্ত খুলতে জোর চেষ্টা জন্মসূত্রে নাগরিকত্বে ট্রাম্পের বিধিনিষেধে সুপ্রিম কোর্টের সংশয়, শুনানিতে তীব্র প্রশ্নবাণ স্পেসএক্স আইপিও ঝড়: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজারে নামতে যাচ্ছে মাস্কের মহাকাশ সাম্রাজ্য ইরান যুদ্ধ থামাতে সক্রিয় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, পাকিস্তান হয়ে গোপন বার্তা আদান-প্রদান ন্যাটো ছাড়ার হুমকি ট্রাম্পের: আইনি জটিলতায় কি সত্যিই বের হতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র? যুদ্ধ থামলেও থামবে না ঝুঁকি: ইরান আরও শক্তিশালী, উপসাগরীয় অঞ্চল বড় বিপদের মুখে ইরান প্রেসিডেন্টের বার্তা: সাধারণ আমেরিকানদের প্রতি কোনো শত্রুতা নেই  ইরান থেকে দ্রুত সরে যাবে যুক্তরাষ্ট্র, প্রয়োজনে ফের হামলা—ট্রাম্পের ইঙ্গিতেই বাড়ছে বৈশ্বিক উত্তেজনা

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কতদিন চালিয়ে যেতে পারবে ইসরায়েল?

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে তাদের সামরিক সক্ষমতা দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও আগের ইরান সংঘাতের পর ক্লান্ত ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরি করতে পারে।

ইসরায়েলে যুদ্ধের প্রভাব বাড়ছে

শনিবার ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর থেকেই ইসরায়েল বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ছে। দেশজুড়ে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজছে, অনেক স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে এবং হাজার হাজার রিজার্ভ সেনাকে ডাকা হয়েছে।

হাইফা ও তেল আবিবের মতো শহরগুলো ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে পড়েছে। জরুরি সেবাগুলো চাপে রয়েছে। বহু মানুষ গত কয়েক দিন ধরে বারবার বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এমন মাত্রার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সাধারণ ইসরায়েলিদের জন্য নতুন।

যুদ্ধের পক্ষে জনমত

এখন পর্যন্ত ইসরায়েলে যুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থন বেশ শক্তিশালী। বহু বছর ধরে জনগণকে বলা হয়েছে ইরান তাদের ধ্বংস করতে চায়। সেই ধারণা থেকেই অনেক নাগরিক এখন এই যুদ্ধকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন।

চরম বামপন্থী গোষ্ঠী ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক শক্তিই সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে।

As Israel-Hamas war continues, Americans remain supportive of Israel in new  poll : NPR

ইসরায়েলি রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে সামরিক মনোভাবের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে।

তার ভাষায়, ২০২৫ সালের জুনে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের সময় পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। তখন মানুষ আতঙ্কিত ছিল এবং অনেকেই মনে করেছিল ইরান ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু এবার মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও যুদ্ধমুখী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। এমনকি যারা যুদ্ধের সমালোচনা করছেন তারাও বলছেন যুদ্ধটি যেন ‘সংক্ষিপ্ত’ হয়, যেন ইসরায়েলই ঠিক করতে পারে কখন যুদ্ধ শেষ হবে।

সমাজে বাড়ছে সামরিক মনোভাব

বিশ্লেষকদের মতে, এই সমর্থন ইসরায়েলি সমাজের ক্রমবর্ধমান কঠোরতারও প্রতিফলন। আগে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা অনেক কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিক এখন সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিভাজন ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক তরুণ ও দক্ষ মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

যারা দেশে রয়েছেন, তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে দেশের প্রধান শত্রু হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত। দীর্ঘ যুদ্ধ এই মানসিকতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড্যানিয়েল বার-তাল বলেন, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনে হওয়া জার্মান বোমা হামলার পরিস্থিতির মতো। তখন ব্রিটিশরা বোমাবর্ষণ সহ্য করেছিল কারণ তারা মনে করেছিল তারা এক চূড়ান্ত অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে।

তার মতে, ইসরায়েলিদের মধ্যেও একই ধরনের বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা ব্যবস্থা, সমাজ ও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ইরানকে ‘অশুভ শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

What to Know About Iran's Ballistic Missiles and the Attacks on Israel -  The New York Times

বার-তাল মনে করেন, দীর্ঘ যুদ্ধের পর ইসরায়েলি সমাজ কেমন হবে তা বলা কঠিন। তবে তিনি বলেন, অতীতে ১৯৪৮ সালের নাকবা কিংবা সাম্প্রতিক গাজা হত্যাযজ্ঞও ইসরায়েলি রাষ্ট্রের নৈতিক আত্মবিশ্বাসকে নাড়া দিতে পারেনি।

তার মতে, নতুন প্রজন্ম আরও সামরিকমুখী ও ডানপন্থী হয়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলছেন, এখন থেকে দেশকে তলোয়ার হাতে বাঁচতে হবে। এতে বোঝা যায় ইসরায়েল নিজের অস্তিত্বের জন্য শত্রুর প্রয়োজন অনুভব করে।

সামরিক হিসাব-নিকাশ

সামাজিক প্রভাবের পাশাপাশি সামরিক দিক থেকেও ইসরায়েলকে বড় হিসাব করতে হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইরানের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কতদিন একই মাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজা আত্তারের মতে, এটি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো মিত্রদের সহায়তার ওপর এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের আগে ক্লান্ত হয়ে পড়ে কি না তার ওপর।

তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রথম তিন দিনে ইরান ইসরায়েলের দিকে ২০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তুলনা করলে দেখা যায়, আগের ১২ দিনের যুদ্ধে তারা প্রায় ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করতে ইসরায়েলকে একটি করে প্রতিরোধী রকেট ব্যবহার করতে হয়।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে এত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা কঠিন হয়ে যেত এবং সম্ভবত তারা ইতিমধ্যে নিজেদের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত।

Israel delivers Arrow 3 missile defense system to Germany

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

ইসরায়েলের তিনটি প্রধান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।
আয়রন ডোম স্বল্প পাল্লার রকেট ও গোলাবারুদ ঠেকাতে ব্যবহৃত হয়।
ডেভিডস স্লিং মাঝারি পাল্লার রকেট ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করে।
অ্যারো-২ ও অ্যারো-৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আটকানোর জন্য তৈরি।

ইসরায়েল তাদের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সম্পর্কে প্রকাশ্যে কিছু জানায় না। তবে আগের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ই এই মজুত কমে আসার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। ফলে দীর্ঘ যুদ্ধ চললে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র সীমিতভাবে ব্যবহার করতে হতে পারে।

এতে সামরিক ও রাজনৈতিক স্থাপনাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং সাধারণ মানুষের হতাহতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা

ইসরায়েলি ও মার্কিন সূত্র অনুযায়ী, জুনের সংঘাতের পর ইরান প্রতি মাসে প্রায় ১০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। এর মানে তেহরানের হাতে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য মজুত থাকতে পারে।

American Support for Israel Is a Political Religion - New Lines Magazine

তবে আত্তার বলেন, ইরানের কাছে কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিছু দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা গ্রিস বা ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম এবং স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ১২ দিনের যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে কত ক্ষেপণাস্ত্র ছিল বা কতগুলো ধ্বংস হয়েছে তা পরিষ্কার নয়। একইভাবে তাদের কতগুলো উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা রয়েছে সেটিও অজানা।

তার ভাষায়, উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা না থাকলে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা তেমন কাজে আসে না। এটি যেন রাইফেল ছাড়া গুলির মতো।

অর্থনৈতিক চাপ

দুই বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় ধারাবাহিক যুদ্ধ ইসরায়েলের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের গোলাবারুদ খরচ বাড়ছে এবং শত হাজার রিজার্ভ সেনাকে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় রাখতে হচ্ছে, যা পরিকল্পনার বাইরে ছিল।

২০২৪ সালে লেবানন ও গাজা যুদ্ধের পেছনে ইসরায়েলের ব্যয় দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে যুদ্ধ ব্যয় বেড়ে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

Israeli war costs economy over $67.3 billion: Economists

এই চাপের কারণে ২০২৪ সালে তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থা ইসরায়েলের সার্বভৌম ঋণমান কমিয়ে দেয়।

শির হেভার বলেন, বর্তমানে ইসরায়েল ঋণ সংকট, জ্বালানি সংকট, পরিবহন সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা সংকটের মুখোমুখি।

তবে তার মতে, এসব অর্থনৈতিক চাপ একা ইসরায়েলের সামরিক অভিযান থামাতে পারবে না।

তিনি বলেন, বিষয়টি মূলত অর্থনীতির নয়, প্রযুক্তির প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলকে এমন উন্নত অস্ত্র সরবরাহ করতে থাকে যা দূর থেকে লক্ষ্যভেদ করতে পারে এবং সৈন্যদের ঝুঁকি কমায়, তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন থামাতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধকে জ্বালানি যুদ্ধে পরিনত করতে সমর্থ হয়েছে

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কতদিন চালিয়ে যেতে পারবে ইসরায়েল?

০৩:২২:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতারা ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাত কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত গড়াতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে তাদের সামরিক সক্ষমতা দীর্ঘ সময় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে গাজা, লেবানন, সিরিয়া ও আগের ইরান সংঘাতের পর ক্লান্ত ইসরায়েলের জন্য দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ বড় অর্থনৈতিক ও সামরিক চাপ তৈরি করতে পারে।

ইসরায়েলে যুদ্ধের প্রভাব বাড়ছে

শনিবার ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর থেকেই ইসরায়েল বারবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ছে। দেশজুড়ে বিমান হামলার সতর্ক সংকেত বাজছে, অনেক স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে এবং হাজার হাজার রিজার্ভ সেনাকে ডাকা হয়েছে।

হাইফা ও তেল আবিবের মতো শহরগুলো ধারাবাহিক আক্রমণের মুখে পড়েছে। জরুরি সেবাগুলো চাপে রয়েছে। বহু মানুষ গত কয়েক দিন ধরে বারবার বোমা আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। এমন মাত্রার যুদ্ধের অভিজ্ঞতা সাধারণ ইসরায়েলিদের জন্য নতুন।

যুদ্ধের পক্ষে জনমত

এখন পর্যন্ত ইসরায়েলে যুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থন বেশ শক্তিশালী। বহু বছর ধরে জনগণকে বলা হয়েছে ইরান তাদের ধ্বংস করতে চায়। সেই ধারণা থেকেই অনেক নাগরিক এখন এই যুদ্ধকে প্রয়োজনীয় বলে মনে করছেন।

চরম বামপন্থী গোষ্ঠী ছাড়া প্রায় সব রাজনৈতিক শক্তিই সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে।

As Israel-Hamas war continues, Americans remain supportive of Israel in new  poll : NPR

ইসরায়েলি রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ শির হেভার বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশজুড়ে সামরিক মনোভাবের ঢেউ ছড়িয়ে পড়েছে।

তার ভাষায়, ২০২৫ সালের জুনে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের সময় পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। তখন মানুষ আতঙ্কিত ছিল এবং অনেকেই মনে করেছিল ইরান ইসরায়েলকে ধ্বংস করতে পারে। কিন্তু এবার মানুষের মধ্যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ও যুদ্ধমুখী মনোভাব দেখা যাচ্ছে। এমনকি যারা যুদ্ধের সমালোচনা করছেন তারাও বলছেন যুদ্ধটি যেন ‘সংক্ষিপ্ত’ হয়, যেন ইসরায়েলই ঠিক করতে পারে কখন যুদ্ধ শেষ হবে।

সমাজে বাড়ছে সামরিক মনোভাব

বিশ্লেষকদের মতে, এই সমর্থন ইসরায়েলি সমাজের ক্রমবর্ধমান কঠোরতারও প্রতিফলন। আগে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা অনেক কট্টর ডানপন্থী রাজনীতিক এখন সরকারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পাচ্ছেন। রাজনৈতিক বিভাজন ও অর্থনৈতিক চাপের কারণে অনেক তরুণ ও দক্ষ মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।

যারা দেশে রয়েছেন, তাদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে দেশের প্রধান শত্রু হিসেবে ভাবতে অভ্যস্ত। দীর্ঘ যুদ্ধ এই মানসিকতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ড্যানিয়েল বার-তাল বলেন, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটেনে হওয়া জার্মান বোমা হামলার পরিস্থিতির মতো। তখন ব্রিটিশরা বোমাবর্ষণ সহ্য করেছিল কারণ তারা মনে করেছিল তারা এক চূড়ান্ত অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়ছে।

তার মতে, ইসরায়েলিদের মধ্যেও একই ধরনের বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই শিক্ষা ব্যবস্থা, সমাজ ও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে ইরানকে ‘অশুভ শক্তি’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

What to Know About Iran's Ballistic Missiles and the Attacks on Israel -  The New York Times

বার-তাল মনে করেন, দীর্ঘ যুদ্ধের পর ইসরায়েলি সমাজ কেমন হবে তা বলা কঠিন। তবে তিনি বলেন, অতীতে ১৯৪৮ সালের নাকবা কিংবা সাম্প্রতিক গাজা হত্যাযজ্ঞও ইসরায়েলি রাষ্ট্রের নৈতিক আত্মবিশ্বাসকে নাড়া দিতে পারেনি।

তার মতে, নতুন প্রজন্ম আরও সামরিকমুখী ও ডানপন্থী হয়ে উঠছে। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলছেন, এখন থেকে দেশকে তলোয়ার হাতে বাঁচতে হবে। এতে বোঝা যায় ইসরায়েল নিজের অস্তিত্বের জন্য শত্রুর প্রয়োজন অনুভব করে।

সামরিক হিসাব-নিকাশ

সামাজিক প্রভাবের পাশাপাশি সামরিক দিক থেকেও ইসরায়েলকে বড় হিসাব করতে হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ইরানের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কতদিন একই মাত্রার যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক হামজা আত্তারের মতে, এটি নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো মিত্রদের সহায়তার ওপর এবং ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের আগে ক্লান্ত হয়ে পড়ে কি না তার ওপর।

তিনি বলেন, যুদ্ধের প্রথম তিন দিনে ইরান ইসরায়েলের দিকে ২০০টির বেশি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। তুলনা করলে দেখা যায়, আগের ১২ দিনের যুদ্ধে তারা প্রায় ৫০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল। প্রতিটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করতে ইসরায়েলকে একটি করে প্রতিরোধী রকেট ব্যবহার করতে হয়।

তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা ছাড়া ইসরায়েলের পক্ষে এত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা কঠিন হয়ে যেত এবং সম্ভবত তারা ইতিমধ্যে নিজেদের আকাশসীমার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলত।

Israel delivers Arrow 3 missile defense system to Germany

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা

ইসরায়েলের তিনটি প্রধান আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রয়েছে।
আয়রন ডোম স্বল্প পাল্লার রকেট ও গোলাবারুদ ঠেকাতে ব্যবহৃত হয়।
ডেভিডস স্লিং মাঝারি পাল্লার রকেট ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধ করে।
অ্যারো-২ ও অ্যারো-৩ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আটকানোর জন্য তৈরি।

ইসরায়েল তাদের প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত সম্পর্কে প্রকাশ্যে কিছু জানায় না। তবে আগের ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ই এই মজুত কমে আসার লক্ষণ দেখা গিয়েছিল। ফলে দীর্ঘ যুদ্ধ চললে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র সীমিতভাবে ব্যবহার করতে হতে পারে।

এতে সামরিক ও রাজনৈতিক স্থাপনাগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে এবং সাধারণ মানুষের হতাহতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা

ইসরায়েলি ও মার্কিন সূত্র অনুযায়ী, জুনের সংঘাতের পর ইরান প্রতি মাসে প্রায় ১০০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। এর মানে তেহরানের হাতে ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য মজুত থাকতে পারে।

American Support for Israel Is a Political Religion - New Lines Magazine

তবে আত্তার বলেন, ইরানের কাছে কী ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিছু দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে যা গ্রিস বা ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ইসরায়েল পর্যন্ত পৌঁছাতে সক্ষম এবং স্বল্প পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র উপসাগরীয় দেশগুলোকে লক্ষ্য করতে পারে।

তিনি আরও বলেন, ১২ দিনের যুদ্ধের আগে ইরানের কাছে কত ক্ষেপণাস্ত্র ছিল বা কতগুলো ধ্বংস হয়েছে তা পরিষ্কার নয়। একইভাবে তাদের কতগুলো উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা রয়েছে সেটিও অজানা।

তার ভাষায়, উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা না থাকলে ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা তেমন কাজে আসে না। এটি যেন রাইফেল ছাড়া গুলির মতো।

অর্থনৈতিক চাপ

দুই বছরের বেশি সময় ধরে প্রায় ধারাবাহিক যুদ্ধ ইসরায়েলের অর্থনীতির ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের গোলাবারুদ খরচ বাড়ছে এবং শত হাজার রিজার্ভ সেনাকে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় রাখতে হচ্ছে, যা পরিকল্পনার বাইরে ছিল।

২০২৪ সালে লেবানন ও গাজা যুদ্ধের পেছনে ইসরায়েলের ব্যয় দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে যুদ্ধ ব্যয় বেড়ে প্রায় ৫৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

Israeli war costs economy over $67.3 billion: Economists

এই চাপের কারণে ২০২৪ সালে তিনটি প্রধান আন্তর্জাতিক সংস্থা ইসরায়েলের সার্বভৌম ঋণমান কমিয়ে দেয়।

শির হেভার বলেন, বর্তমানে ইসরায়েল ঋণ সংকট, জ্বালানি সংকট, পরিবহন সংকট এবং স্বাস্থ্যসেবা সংকটের মুখোমুখি।

তবে তার মতে, এসব অর্থনৈতিক চাপ একা ইসরায়েলের সামরিক অভিযান থামাতে পারবে না।

তিনি বলেন, বিষয়টি মূলত অর্থনীতির নয়, প্রযুক্তির প্রশ্ন। যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলকে এমন উন্নত অস্ত্র সরবরাহ করতে থাকে যা দূর থেকে লক্ষ্যভেদ করতে পারে এবং সৈন্যদের ঝুঁকি কমায়, তাহলে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটও ইসরায়েলের সামরিক আগ্রাসন থামাতে যথেষ্ট নাও হতে পারে।