উপসাগরীয় অঞ্চজুড়ে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে শত শত ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এই হামলা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আইআরজিসি বলেছে, এসব হামলা যুদ্ধের শুরুতেই নেওয়া তাদের “প্রথম শক্তিশালী পদক্ষেপগুলোর একটি”, যা উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন উপস্থিতিকে লক্ষ্য করে পরিচালিত হচ্ছে।
ড্রোন হামলার বিস্তৃত লক্ষ্যবস্তু
আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, তারা মোট ২৩০টি ড্রোন ছুড়েছে। এসব ড্রোনের লক্ষ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থাপনা যেখানে মার্কিন সেনা অবস্থান করছে।
ইরাকের উত্তরাঞ্চলের এরবিলের একটি সামরিক ঘাঁটি, কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং ক্যাম্প আরিফজান এই হামলার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল।
একই সময়ে ইরাকের রাজধানী বাগদাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের একটি লজিস্টিক সহায়তা স্থাপনাও ড্রোন হামলার লক্ষ্য হয় বলে জানা গেছে।

এরবিলেও হামলা
উত্তর ইরাকের কুর্দি অঞ্চলের শহর এরবিলে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং একটি হোটেল লক্ষ্য করে দুটি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে।
এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সুলাইমানিয়াহ শহরের একটি ভবনেও ড্রোন হামলা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে ওই ভবন থেকে আগুনের শিখা উঠতে দেখা যায় এবং বিস্ফোরণের খবরও পাওয়া যায়।
কুয়েতে শিশুর মৃত্যু
ড্রোন হামলার পরিণতিতে কুয়েতে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আকাশে ড্রোন প্রতিহত করার সময় ছিটকে পড়া ধাতব টুকরোর আঘাতে ১১ বছর বয়সী এক কন্যাশিশুর মৃত্যু হয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানায়, আহত অবস্থায় শিশুটিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নেওয়ার সময় চিকিৎসকরা তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেন। হাসপাতালে পৌঁছানোর পরও প্রায় আধা ঘণ্টা ধরে পুনরুজ্জীবন প্রক্রিয়া চালানো হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যু ঘটে।

সৌদি আরবে তেল স্থাপনায় আঘাত
সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলে একটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।
এর কিছু সময় পর সৌদি আরবের রাস তানুরা তেল শোধনাগারে একটি প্রজেক্টাইল আঘাত হানে। এটি সৌদি আরামকোর সবচেয়ে বড় দেশীয় তেল শোধনাগার।
এর কয়েকদিন আগেই দুটি ইরানি ড্রোন ভূপাতিত করার সময় সৃষ্ট ধ্বংসাবশেষ থেকে আগুন লাগার কারণে এই স্থাপনার কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন।
সংযুক্ত আরব আমিরাতে হামলা
সংযুক্ত আরব আমিরাতেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। দুবাইয়ে মার্কিন কনস্যুলেট এবং ফুজাইরাহ শহরের একটি বন্দরে হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে বিভিন্ন সূত্র জানিয়েছে।
আমিরাতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ১২১টি ড্রোন ধ্বংস করেছে। তবে আটটি ড্রোন দেশের ভেতরে এসে পড়েছে।
এদিকে সৌদি আরবে মার্কিন দূতাবাস এবং আমিরাতে মার্কিন কনস্যুলেটেও মঙ্গলবার ড্রোন হামলা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জরুরি নয় এমন সরকারি কর্মীদের এলাকা ছাড়ার অনুমতি দিয়েছে।
ফ্রান্স ও কাতারের প্রতিরক্ষা প্রতিক্রিয়া
ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জ্যঁ-নোয়েল বারো জানিয়েছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থানরত ফরাসি বাহিনীর সুরক্ষায় ফ্রান্সের রাফাল যুদ্ধবিমান ইরানের কয়েকটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে।
অন্যদিকে কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইরান থেকে ছোড়া ১০টি ড্রোন এবং দুটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে।
কাতার এয়ারওয়েজ জানিয়েছে, কাতারের আকাশসীমা বন্ধ থাকার কারণে তাদের ফ্লাইট কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়েছে।

সংঘাতের পটভূমি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানোর পর উত্তেজনা তীব্র আকার নেয়। ওই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এরপর থেকেই ইরান ইসরায়েলের পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলার সংখ্যা ও ঘনত্ব কিছুটা কমেছে।
আল জাজিরার দোহা প্রতিনিধি জেইন বাসরাভি বলেছেন, হামলার মাত্রা কমলেও খুব বেশি হামলা না হলেও আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়া বা বড় ধরনের বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
তিনি বলেন, ইরান যদি কম মাত্রার হামলাও অব্যাহত রাখে, তবুও এই সংঘাতে জড়িয়ে পড়া উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের দেশগুলোর জন্য তা বড় সমস্যার কারণ হয়ে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















