ইরানের রাজধানী তেহরান এখন প্রায় অবিরাম বিমান হামলার ভেতর দিয়ে দিন পার করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় শহরের আকাশে প্রতিদিনই বিস্ফোরণের শব্দ, ধোঁয়ার স্তম্ভ আর ধ্বংসস্তূপের দৃশ্য তৈরি হচ্ছে। বাসিন্দারা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে প্রতিটি দিন যেন একেকটি মাসের মতো দীর্ঘ মনে হচ্ছে।
প্রতিদিনই বিস্ফোরণের শব্দ
তেহরানের এক বাসিন্দা সালার জানান, কয়েকদিন ধরেই শহরে বিস্ফোরণের সংখ্যা এত বেশি যে স্বাভাবিক জীবন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক এক বিমান হামলায় তার বাড়ি এতটাই কেঁপে ওঠে যে জানালা ভেঙে যাওয়ার ভয়ে খোলা রাখতে হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া এই হামলায় মূলত সামরিক ও রাজনৈতিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করা হলেও বিভিন্ন এলাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মিনাব শহরে একটি মেয়েদের স্কুলে হামলায় শিশুদেরসহ অন্তত ১৬০ জন নিহত হয়েছে। এ ঘটনায় তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
শহরজুড়ে আতঙ্ক আর কড়া নিরাপত্তা
তেহরানের বাসিন্দারা বলছেন, শহরের রাস্তায় এখন সর্বত্র নিরাপত্তা বাহিনীর চেকপোস্ট। অনেকে মনে করছেন সরকার নিজেই আতঙ্কে রয়েছে।
একজন ছাত্র বলেন, শহরের পরিস্থিতি এতটাই কঠোর যে মানুষ এখন প্রায় বাড়ি থেকে বেরই হচ্ছে না। অনেক দোকানপাট বন্ধ হয়ে গেছে এবং কিছু এটিএমও কাজ করছে না। তবে সুপারমার্কেট ও বেকারি খোলা রয়েছে।
তিনি আরও জানান, ডিম ও আলুর মতো সাধারণ খাদ্যের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। পেট্রোল ও রুটির জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে মানুষকে।
প্রতিবাদ ঠেকাতে সতর্কবার্তা
সালারের দাবি, নিরাপত্তা বাহিনী মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠিয়ে মানুষকে সতর্ক করছে। সেই বার্তায় বলা হয়েছে, কেউ যদি বাইরে গিয়ে প্রতিবাদে অংশ নেয় তবে তাকে কঠোরভাবে দমন করা হবে এবং ইসরায়েলের সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এই বার্তাগুলো দেখে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, সরকারের বিরুদ্ধে কোনো বিক্ষোভ হলে তা শক্ত হাতে দমন করা হতে পারে।
অন্য শহরেও হামলার প্রভাব
তেহরান থেকে প্রায় ২৭৫ কিলোমিটার দূরের জানজান শহরেও হামলার প্রভাব পড়েছে। সেখানকার বাসিন্দা কাবেহ বলেন, যুদ্ধ শুরুর প্রথম তিন দিনেই তাদের শহরে ভারী বোমা হামলা হয়েছে।
তার ভাষায়, আকাশে প্রায়ই যুদ্ধবিমান উড়তে দেখা যায় এবং হামলার পরে ধোঁয়ার স্তম্ভে আকাশ ঢেকে যায়। তিনি বলেন, দৃশ্যটি একই সঙ্গে ভয়ংকর এবং অদ্ভুতভাবে সুন্দর।

শহর ছাড়ছেন অনেকে
ক্রমেই তেহরান ছেড়ে অন্য এলাকায় চলে যাচ্ছেন অনেক মানুষ। সালার জানান, তিনি নিজের বাবা-মাকে শহরের উত্তরে পাঠিয়ে দিয়েছেন। তবে সবাই শহর ছাড়তে পারছেন না। অসুস্থ স্বজন বা অন্য কারণে অনেক পরিবার আটকে আছে।
তিনি বলেন, তার এক বন্ধুর দাদি গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় তাদের পক্ষে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়।
ইন্টারনেট বন্ধে বিচ্ছিন্ন মানুষ
এই পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই বিকল্প উপায়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন।
কাবেহ জানান, হামলার প্রথম দিন দুপুরের দিকে তার ইন্টারনেট সংযোগ কেটে যায় এবং দুই দিন পরে আবার অনলাইনে ফিরতে পারেন। তিনি মাঝে মাঝে দেশের বাইরে থাকা বন্ধুদের পরিবারের খবর পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেন।

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা
যুদ্ধ কতদিন চলবে তা কেউ জানে না। অনেকেরই মনে হচ্ছে, এই সংঘাত এত দ্রুত শেষ হবে না।
তবে সব অনিশ্চয়তার মাঝেও কিছু মানুষ আশা হারাননি। কাবেহ বলেন, যুদ্ধ হয়তো দীর্ঘ হতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের জন্য আশা এখনও বেঁচে আছে।
সালারও মনে করেন, এই যুদ্ধ শেষ হলেও মানুষের জীবন আর আগের মতো থাকবে না। তার ভাষায়, এত ভয় ও চাপের অভিজ্ঞতা মানুষের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















