চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বৈঠককে ঘিরে তাইওয়ান প্রণালীতে চীনের সামরিক তৎপরতায় অস্বাভাবিক বিরতি দেখা গেছে। টানা ছয় দিন ধরে তাইওয়ানের কাছাকাছি আকাশে কোনো চীনা যুদ্ধবিমান দেখা যায়নি, যা গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ বিরতি। বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন শি–ট্রাম্প বৈঠকের আগে পরিস্থিতি উত্তেজনামুক্ত রাখতে বেইজিং সচেতনভাবেই এই সংযম দেখাচ্ছে।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার থেকে বুধবার পর্যন্ত টানা ছয় দিন স্বশাসিত দ্বীপটির আশপাশে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) কোনো যুদ্ধবিমান দেখা যায়নি। দক্ষিণ চায়না মর্নিং পোস্টের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত তিন বছরে এটাই সবচেয়ে দীর্ঘ বিরতি।
তবে আকাশে টহল বন্ধ থাকলেও সমুদ্রে চীনের উপস্থিতি আগের মতোই রয়েছে। একই সময়ে তাইওয়ান পাঁচ থেকে সাতটি চীনা নৌযান শনাক্ত করেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের গড় সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
তাইওয়ানের আকাশে যুদ্ধবিমান না দেখা যাওয়ার নজির

সাধারণত প্রায় প্রতিদিনই তাইওয়ানের কাছাকাছি আকাশে চীনা যুদ্ধবিমান উড়তে দেখা যায়। কিন্তু ফেব্রুয়ারিতে মোট ১১ দিন কোনো বিমান টহল দেয়নি। এর মধ্যে চীনা নববর্ষ উপলক্ষে ১৬ থেকে ১৮ ফেব্রুয়ারি টানা তিন দিনও এমন বিরতি ছিল।
২০২৪ সালের পর এই প্রথমবার চীনা নববর্ষের আগের দিন থেকে চান্দ্র বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় দিন পর্যন্ত টানা তিন দিন তাইওয়ানের কাছে কোনো চীনা যুদ্ধবিমান উড়েনি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংযম বেইজিংয়ের সাম্প্রতিক কৌশলগত আচরণের সঙ্গে কিছুটা ভিন্ন। তারা মনে করছেন, এর পেছনে শি–ট্রাম্প বৈঠকের প্রস্তুতির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
শি–ট্রাম্প বৈঠক ঘিরে কৌশলগত সংযম
আগামী ৩১ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেইজিং সফরের কথা রয়েছে। এই বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে তাইওয়ান ইস্যু অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
চীনের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শি ইনহং মনে করেন, তাইওয়ানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সামরিক বিরতি ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার পরিবেশ সহজ করতে পারে।

তার মতে, বেইজিং সম্ভবত এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় যাতে আলোচনার সময় উত্তেজনা কম থাকে এবং তাইওয়ান প্রসঙ্গে আলোচনা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়।
তাইওয়ান ইয়ুথ ফেডারেশনের চেয়ারম্যান হে ইচেংও একই মত দিয়েছেন। তার মতে, বেইজিং, তাইপেই এবং ওয়াশিংটন—তিন পক্ষই আপাতত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
তিনি বলেন, শি–ট্রাম্প বৈঠকের আগে একটি তুলনামূলক শান্ত পরিবেশ তৈরি করাই মূল উদ্দেশ্য। কারণ, যদি এই সময়ে তাইওয়ান প্রণালীতে উত্তেজনা বাড়ে, তাহলে ট্রাম্পের ওপর তাইওয়ানকে অস্ত্র বিক্রির চাপ বাড়তে পারে এবং তাইওয়ানও অস্ত্র কেনার দিকে আরও ঝুঁকতে পারে।
চাপের কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এই বিরতি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাইওয়ানের কাছে চীনের সামরিক উপস্থিতি ক্রমাগত বেড়েছে। এর উদ্দেশ্য ছিল সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করা, তাইওয়ানের স্বাধীনতাপন্থী শক্তির ওপর চাপ তৈরি করা এবং বাইরের শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ ঠেকানোর বার্তা দেওয়া।
চীন তাইওয়ানকে নিজের অংশ হিসেবে দেখে এবং প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে দ্বীপটিকে পুনরায় একত্রিত করার অবস্থান বারবার জানিয়েছে।
অন্যদিকে অধিকাংশ দেশ, যুক্তরাষ্ট্রসহ, তাইওয়ানকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দিলেও ওয়াশিংটন বলেছে—জোরপূর্বক দখলের যে কোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করবে এবং তাইওয়ানকে প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখবে।

লাই চিং–তের ক্ষমতায় আসার পর বাড়ে টহল
২০২৪ সালের মে মাসে স্বাধীনতাপন্থী ডেমোক্রেটিক প্রগ্রেসিভ পার্টির নেতা লাই চিং–তে তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর চীনা যুদ্ধবিমানের টহল আরও বেড়ে যায়।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রেকর্ড ৫ হাজার ৭০৯টি চীনা যুদ্ধবিমান টহল দিয়েছে।
তবে গত অক্টোবরে শি–ট্রাম্প বৈঠকের পর ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের মধ্যে সম্পর্ক কিছুটা উষ্ণ হওয়ার পর তাইপেইয়ের অবস্থানেও সূক্ষ্ম পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেখা গেছে।
সম্প্রতি মূল ভূখণ্ডে ব্যবসা করা তাইওয়ানি ব্যবসায়ীদের এক অনুষ্ঠানে লাই চিং–তে তার বক্তব্যে সাধারণত ব্যবহৃত “চীন” শব্দের পরিবর্তে “মূল ভূখণ্ড চীন” শব্দটি ব্যবহার করেন। বিশ্লেষকদের মতে, এটিও একটি সতর্ক কূটনৈতিক ইঙ্গিত।
বেইজিংয়ের প্রতিক্রিয়া
লাইয়ের এই বক্তব্য সম্পর্কে বুধবার বেইজিংয়ের তাইওয়ান বিষয়ক দপ্তরের মুখপাত্র ঝাং হান বলেন, দুই পাড়ের শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক উভয় পক্ষের মানুষের জন্যই লাভজনক।
তার ভাষায়, জনগণের ইচ্ছা ও সময়ের প্রবণতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চলাই সবচেয়ে বিচক্ষণ পথ।

একই সময়ে দুই পাড়ের রাজনৈতিক যোগাযোগেও কিছু ইতিবাচক ইঙ্গিত দেখা গেছে। গত ৩ ফেব্রুয়ারি চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও তাইওয়ানের প্রধান বিরোধী দল কুওমিনতাং একটি ফোরাম আয়োজন করে।
এটি চলতি বছরের প্রথমার্ধে কুওমিনতাং নেত্রী চেং লি–উনের মূল ভূখণ্ড সফরের পথ সুগম করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তাইওয়ানে প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে বিতর্ক
এদিকে তাইওয়ানে বর্তমানে প্রেসিডেন্ট লাই চিং–তের প্রস্তাবিত প্রায় ১ দশমিক ২৫ ট্রিলিয়ন তাইওয়ান ডলার বা প্রায় ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিশেষ প্রতিরক্ষা বাজেট নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে।
লাই এই বাজেট প্রস্তাব করেছেন মূল ভূখণ্ড চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক হুমকি মোকাবিলার জন্য।
কিন্তু তাইওয়ানের আইনসভা লেজিসলেটিভ ইউয়ানে বিলটি আটকে আছে। বিরোধী কুওমিনতাং ও তাদের মিত্র তাইওয়ান পিপলস পার্টি একাধিকবার এটি আটকে দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, সরকার বাজেটের বিষয়ে যথেষ্ট স্বচ্ছতা দেখাচ্ছে না।

যুদ্ধ প্রস্তুতি বজায় রেখেছে চীন
যদিও সামরিক টহলে এই অস্বাভাবিক বিরতি দেখা গেছে, তবুও চীন স্পষ্ট করেছে যে তারা যুদ্ধ প্রস্তুতি থেকে সরে আসেনি।
তাইওয়ান–সংক্রান্ত সামরিক কার্যক্রম তদারককারী পিপলস লিবারেশন আর্মির ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড জানিয়েছে, নতুন বছরের সময়ও তাদের যুদ্ধমুখী প্রশিক্ষণ চলেছে।
১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক বিবৃতিতে তারা একটি বিমান মহড়ার তথ্য জানিয়ে বলেছে, বাহিনী যে কোনো সময় যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















