০১:১০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
ইরান যুদ্ধকে জ্বালানি যুদ্ধে পরিনত করতে সমর্থ হয়েছে দুবাইয়ে মাত্র ২৫ হাজার টাকায় ছোট ঘরে জীবন: নেটিজেনদের মিশ্র প্রতিক্রিয়া চীনের মধ্যস্থতায় পাকিস্তান-আফগানিস্তান নতুন শান্তি আলোচনা, যুদ্ধবিরতি ও সীমান্ত খুলতে জোর চেষ্টা জন্মসূত্রে নাগরিকত্বে ট্রাম্পের বিধিনিষেধে সুপ্রিম কোর্টের সংশয়, শুনানিতে তীব্র প্রশ্নবাণ স্পেসএক্স আইপিও ঝড়: ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শেয়ারবাজারে নামতে যাচ্ছে মাস্কের মহাকাশ সাম্রাজ্য ইরান যুদ্ধ থামাতে সক্রিয় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স, পাকিস্তান হয়ে গোপন বার্তা আদান-প্রদান ন্যাটো ছাড়ার হুমকি ট্রাম্পের: আইনি জটিলতায় কি সত্যিই বের হতে পারবে যুক্তরাষ্ট্র? যুদ্ধ থামলেও থামবে না ঝুঁকি: ইরান আরও শক্তিশালী, উপসাগরীয় অঞ্চল বড় বিপদের মুখে ইরান প্রেসিডেন্টের বার্তা: সাধারণ আমেরিকানদের প্রতি কোনো শত্রুতা নেই  ইরান থেকে দ্রুত সরে যাবে যুক্তরাষ্ট্র, প্রয়োজনে ফের হামলা—ট্রাম্পের ইঙ্গিতেই বাড়ছে বৈশ্বিক উত্তেজনা

শক্তির যুগে শান্তির বার্তা: বৈশ্বিক উত্তেজনায় মধ্যস্থতাকারী হতে পারে ভারত

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবারও শক্তির প্রদর্শনই প্রধান উপকরণ হিসেবে সামনে চলে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে ইসরায়েলের ইরানের ওপর সামরিক হামলা ইতোমধ্যেই অস্থির মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। শুরুতে যা ছিল প্রতিরোধমূলক সংকেত, তা এখন সমন্বিত সামরিক অভিযানে রূপ নিয়েছে। ফলে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা এখন বাস্তব এবং তাৎক্ষণিক।

তবে এই সংকট কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়। এটি বৈশ্বিক রাজনীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ, যেখানে রাষ্ট্রগুলো আবারও প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চাইছে।

শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আশাবাদ এখন চ্যালেঞ্জের মুখে

শীতল যুদ্ধের অবসানের পর প্রায় তিন দশক ধরে ধারণা ছিল যে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক আইন বড় শক্তিগুলোর আচরণকে অনেকটাই সংযত করবে। জাতিসংঘ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কাঠামোকে এমন একটি মঞ্চ হিসেবে দেখা হয়েছিল, যা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করবে এবং একতরফা সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে রাখবে।

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি, কিউবার ওপর চাপ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক কৌশলগত চালচলন একটি কঠিন আন্তর্জাতিক পরিবেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাষ্ট্রগুলো এখন তাদের সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে স্বার্থ রক্ষায় আরও আগ্রহী হয়ে উঠছে। সামরিক হামলা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, জোট শক্তিশালী করা এবং ভূখণ্ডগত সংকেত দেওয়ার মতো পদক্ষেপ এখন ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

ব্যক্তি নয়, কাঠামোগত বাস্তবতাই বড় কারণ

অনেক সময় এমন পরিস্থিতিকে নির্দিষ্ট নেতাদের আচরণের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। উদাহরণ হিসেবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনেকেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীল ধারা থেকে বিচ্যুতি হিসেবে দেখেন।

কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। প্রায়ই দেখা যায় যে প্রাতিষ্ঠানিক আশাবাদের সময়ের পর আবার শক্তির রাজনীতি সামনে আসে। যখন শক্তির ভারসাম্য বদলে যায়, নতুন শক্তির উত্থান ঘটে বা পুরোনো শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করে, তখন কঠোর ক্ষমতার ব্যবহার আবার সামনে আসে।

নেতারা এই প্রবণতাকে দ্রুততর করতে পারেন, কিন্তু তারা এর স্রষ্টা নন। এর মূল কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন।

India always ready for dialogue, diplomacy': PM Modi pushes for peaceful resolution amid rising tension in West Asia

শক্তি ও সক্ষমতাই রাজনৈতিক শৃঙ্খলার ভিত্তি

ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে যে সামরিক, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত শক্তিই আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান নির্ধারক। আন্তর্জাতিক নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেগুলো শেষ পর্যন্ত শক্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরই নির্ভরশীল।

যখন কোনো রাষ্ট্র মনে করে যে তার মৌলিক স্বার্থ হুমকির মুখে, তখন তারা সাধারণত কেবল প্রক্রিয়াগত নিয়মের ওপর নির্ভর করে না। বরং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরাসরি পদক্ষেপ নেয়।

বর্তমান পরিস্থিতি তাই বৈশ্বিক শৃঙ্খলার পতন নয়, বরং তার রূপান্তর। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী যে ধারণা ছিল—এই কাঠামো দীর্ঘদিন শক্তির রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে—তা এখন অনেকটাই অতিরিক্ত আশাবাদী বলে মনে হচ্ছে। শক্তির প্রদর্শন ক্রমেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠছে।

ভারতের জন্য নতুন কূটনৈতিক সুযোগ

এই বাস্তবতা স্বীকার করা মানেই সংঘাতকে সমর্থন করা নয়। বরং পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যের বাস্তবতা বোঝা এবং তা দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এখানেই ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে ভারত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি অনুসরণ করে এবং কঠোর জোট রাজনীতিতে আবদ্ধ নয়। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গেও তার কার্যকর সম্পর্ক রয়েছে এবং একই সঙ্গে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও বজায় রয়েছে।

বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যেও ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে। এই অবস্থান ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

সংলাপ ও আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করা জরুরি

একটি শক্তিনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। এই প্রেক্ষাপটে ট্র্যাক–১, ট্র্যাক–১.৫ এবং ট্র্যাক–২ পর্যায়ের সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Why India could play a pivotal role as climate mediator - Atlantic Council

এই ধরনের সংলাপে সাবেক কূটনীতিক, সামরিক কর্মকর্তা ও কৌশল বিশ্লেষকেরা অংশ নিয়ে এমন বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন, যা আনুষ্ঠানিক মঞ্চে অনেক সময় সম্ভব হয় না। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য উত্তেজনা, সীমারেখা এবং আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব।

ভারত বিশেষ দূত নিয়োগের মাধ্যমেও প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নীরব যোগাযোগের সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারে। এর লক্ষ্য হবে সরাসরি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা দাবি করা নয়, বরং ভুল বোঝাবুঝি ও অপ্রত্যাশিত উত্তেজনা কমানো।

এমন উদ্যোগ ছোট হলেও যদি তা বিশ্বাসযোগ্য ও ধারাবাহিক হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এশিয়ার স্থিতিশীলতার প্রশ্ন

এশিয়া এবং বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এই পরিস্থিতির গুরুত্ব অনেক বেশি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং উন্নয়ন অনেকটাই নির্ভর করে একটি স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক পরিবেশের ওপর।

বড় শক্তিগুলোর মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব সংঘাতের অঞ্চল ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ইতিহাস বলছে, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগ কখনো দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় পরিণত হয়, আবার কখনো নতুন ভারসাম্যের জন্ম দেয়। এই ফলাফল নির্ভর করে শুধু শক্তি প্রদর্শনের ওপর নয়, বরং রাষ্ট্রগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে যোগাযোগ ও সংলাপে বিনিয়োগ করছে তার ওপরও।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে আবার শক্তি ফিরে এসেছে। এখন প্রয়োজন তা অস্বীকার করা নয়, বরং দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করা। এই প্রক্রিয়ায় আলোচনা শুরু করার জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে এবং সে চাইলে আরও কঠিন হয়ে ওঠা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে না দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান যুদ্ধকে জ্বালানি যুদ্ধে পরিনত করতে সমর্থ হয়েছে

শক্তির যুগে শান্তির বার্তা: বৈশ্বিক উত্তেজনায় মধ্যস্থতাকারী হতে পারে ভারত

০৫:০৭:১৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬

সাম্প্রতিক বৈশ্বিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আবারও শক্তির প্রদর্শনই প্রধান উপকরণ হিসেবে সামনে চলে আসছে। যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণে ইসরায়েলের ইরানের ওপর সামরিক হামলা ইতোমধ্যেই অস্থির মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতিকে আরও তীব্র করে তুলেছে। শুরুতে যা ছিল প্রতিরোধমূলক সংকেত, তা এখন সমন্বিত সামরিক অভিযানে রূপ নিয়েছে। ফলে বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা এখন বাস্তব এবং তাৎক্ষণিক।

তবে এই সংকট কেবল মধ্যপ্রাচ্যের সীমাবদ্ধ সমস্যা নয়। এটি বৈশ্বিক রাজনীতির বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ, যেখানে রাষ্ট্রগুলো আবারও প্রকাশ্যে শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করতে চাইছে।

শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী আশাবাদ এখন চ্যালেঞ্জের মুখে

শীতল যুদ্ধের অবসানের পর প্রায় তিন দশক ধরে ধারণা ছিল যে বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা এবং আন্তর্জাতিক আইন বড় শক্তিগুলোর আচরণকে অনেকটাই সংযত করবে। জাতিসংঘ ব্যবস্থা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কাঠামোকে এমন একটি মঞ্চ হিসেবে দেখা হয়েছিল, যা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত করবে এবং একতরফা সামরিক উত্তেজনা কমিয়ে রাখবে।

কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই ধারণাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযান, ভেনেজুয়েলার পরিস্থিতি, কিউবার ওপর চাপ এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়তে থাকা ভূরাজনৈতিক কৌশলগত চালচলন একটি কঠিন আন্তর্জাতিক পরিবেশের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাষ্ট্রগুলো এখন তাদের সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে স্বার্থ রক্ষায় আরও আগ্রহী হয়ে উঠছে। সামরিক হামলা, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, জোট শক্তিশালী করা এবং ভূখণ্ডগত সংকেত দেওয়ার মতো পদক্ষেপ এখন ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে।

ব্যক্তি নয়, কাঠামোগত বাস্তবতাই বড় কারণ

অনেক সময় এমন পরিস্থিতিকে নির্দিষ্ট নেতাদের আচরণের ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। উদাহরণ হিসেবে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনেকেই আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীল ধারা থেকে বিচ্যুতি হিসেবে দেখেন।

কিন্তু ইতিহাস ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। প্রায়ই দেখা যায় যে প্রাতিষ্ঠানিক আশাবাদের সময়ের পর আবার শক্তির রাজনীতি সামনে আসে। যখন শক্তির ভারসাম্য বদলে যায়, নতুন শক্তির উত্থান ঘটে বা পুরোনো শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্মূল্যায়ন করে, তখন কঠোর ক্ষমতার ব্যবহার আবার সামনে আসে।

নেতারা এই প্রবণতাকে দ্রুততর করতে পারেন, কিন্তু তারা এর স্রষ্টা নন। এর মূল কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার কাঠামোগত পরিবর্তন।

India always ready for dialogue, diplomacy': PM Modi pushes for peaceful resolution amid rising tension in West Asia

শক্তি ও সক্ষমতাই রাজনৈতিক শৃঙ্খলার ভিত্তি

ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে যে সামরিক, অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগত শক্তিই আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রধান নির্ধারক। আন্তর্জাতিক নিয়ম ও প্রতিষ্ঠান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, তবে সেগুলো শেষ পর্যন্ত শক্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরই নির্ভরশীল।

যখন কোনো রাষ্ট্র মনে করে যে তার মৌলিক স্বার্থ হুমকির মুখে, তখন তারা সাধারণত কেবল প্রক্রিয়াগত নিয়মের ওপর নির্ভর করে না। বরং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরাসরি পদক্ষেপ নেয়।

বর্তমান পরিস্থিতি তাই বৈশ্বিক শৃঙ্খলার পতন নয়, বরং তার রূপান্তর। শীতল যুদ্ধ-পরবর্তী যে ধারণা ছিল—এই কাঠামো দীর্ঘদিন শক্তির রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখবে—তা এখন অনেকটাই অতিরিক্ত আশাবাদী বলে মনে হচ্ছে। শক্তির প্রদর্শন ক্রমেই আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ হয়ে উঠছে।

ভারতের জন্য নতুন কূটনৈতিক সুযোগ

এই বাস্তবতা স্বীকার করা মানেই সংঘাতকে সমর্থন করা নয়। বরং পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যের বাস্তবতা বোঝা এবং তা দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

এখানেই ভারতের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। একটি উদীয়মান শক্তি হিসেবে ভারত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি অনুসরণ করে এবং কঠোর জোট রাজনীতিতে আবদ্ধ নয়। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলোর সঙ্গেও তার কার্যকর সম্পর্ক রয়েছে এবং একই সঙ্গে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও বজায় রয়েছে।

বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর পাশাপাশি উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যেও ভারতের বিশ্বাসযোগ্যতা রয়েছে। এই অবস্থান ভারতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

সংলাপ ও আস্থার সেতুবন্ধন তৈরি করা জরুরি

একটি শক্তিনির্ভর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কার্যকর যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। এই প্রেক্ষাপটে ট্র্যাক–১, ট্র্যাক–১.৫ এবং ট্র্যাক–২ পর্যায়ের সংলাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Why India could play a pivotal role as climate mediator - Atlantic Council

এই ধরনের সংলাপে সাবেক কূটনীতিক, সামরিক কর্মকর্তা ও কৌশল বিশ্লেষকেরা অংশ নিয়ে এমন বিষয়গুলো নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে পারেন, যা আনুষ্ঠানিক মঞ্চে অনেক সময় সম্ভব হয় না। এর মাধ্যমে সম্ভাব্য উত্তেজনা, সীমারেখা এবং আস্থাবর্ধক পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব।

ভারত বিশেষ দূত নিয়োগের মাধ্যমেও প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে নীরব যোগাযোগের সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে পারে। এর লক্ষ্য হবে সরাসরি মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা দাবি করা নয়, বরং ভুল বোঝাবুঝি ও অপ্রত্যাশিত উত্তেজনা কমানো।

এমন উদ্যোগ ছোট হলেও যদি তা বিশ্বাসযোগ্য ও ধারাবাহিক হয়, তবে তা আন্তর্জাতিক পরিবেশে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

এশিয়ার স্থিতিশীলতার প্রশ্ন

এশিয়া এবং বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এই পরিস্থিতির গুরুত্ব অনেক বেশি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং উন্নয়ন অনেকটাই নির্ভর করে একটি স্থিতিশীল আন্তর্জাতিক পরিবেশের ওপর।

বড় শক্তিগুলোর মধ্যে অনিয়ন্ত্রিত উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে তার প্রভাব সংঘাতের অঞ্চল ছাড়িয়ে আরও বিস্তৃত অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষতির কারণ হতে পারে।

ইতিহাস বলছে, তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার যুগ কখনো দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতায় পরিণত হয়, আবার কখনো নতুন ভারসাম্যের জন্ম দেয়। এই ফলাফল নির্ভর করে শুধু শক্তি প্রদর্শনের ওপর নয়, বরং রাষ্ট্রগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে যোগাযোগ ও সংলাপে বিনিয়োগ করছে তার ওপরও।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির কেন্দ্রে আবার শক্তি ফিরে এসেছে। এখন প্রয়োজন তা অস্বীকার করা নয়, বরং দায়িত্বশীলভাবে পরিচালনা করা। এই প্রক্রিয়ায় আলোচনা শুরু করার জন্য ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে এবং সে চাইলে আরও কঠিন হয়ে ওঠা বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে না দেওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।