সিদ্ধান্ত আসছে খুব দ্রুত। কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের মধ্যে অনেক সময় দেখা যাচ্ছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ও অসঙ্গতি। আবার সুস্পষ্ট কোনো প্রক্রিয়া না থাকায়, যদি পরিস্থিতি ভুল পথে যায় তাহলে কীভাবে তা সামলানো হবে—সে প্রস্তুতিও খুব কম।
মঙ্গলবার জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসকে পাশে নিয়ে ওভাল অফিসে বসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে হোয়াইট হাউসের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা দেন। বিষয়টি ছিল—দেশকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাওয়ার মতো বড় সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়।
ট্রাম্প বলেন, ইরানের ওপর হামলার নির্দেশ দেওয়ার সিদ্ধান্ত মূলত তাঁর নিজের ধারণা ও অনুভূতির ওপর নির্ভর করেই নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমরা এই লোকদের সঙ্গে আলোচনা করছিলাম। আমার মনে হচ্ছিল তারা আগে আক্রমণ করতে পারে। আমি চাইনি তারা আগে হামলা করুক। তাই যদি কিছু হয়ে থাকে, তাহলে হয়তো আমি ইসরায়েলকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে উৎসাহিত করেছি। তবে ইসরায়েল প্রস্তুত ছিল, আমরাও প্রস্তুত ছিলাম।”

কিন্তু এই বক্তব্যের আগের দিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ইসরায়েল যেহেতু হামলা চালাতে যাচ্ছিল, তাই ইরান যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও মিত্রদের ওপর পাল্টা আক্রমণ করতে না পারে—সেই কারণেই যুক্তরাষ্ট্রকে “প্রতিরোধমূলক” হামলায় অংশ নিতে হয়েছে।
পরের দিন রুবিও তাঁর আগের মন্তব্য কিছুটা পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন। এরপর বুধবার হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট বলেন, ট্রাম্প এই পদক্ষেপ নিয়েছেন কারণ তাঁর “মনে হয়েছে” যে ইরান খুব শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থের ওপর আঘাত হানতে পারে।
এই ধরনের পাল্টাপাল্টি ব্যাখ্যা আবারও স্পষ্ট করেছে যে ট্রাম্প প্রশাসনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন কী রকম। তাঁর সাবেক সহযোগীদের অনেকেই বলেন, ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবেই বড় প্রশাসনিক কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে যান। তিনি খুব ছোট একটি দল নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেন এবং গোয়েন্দা তথ্যের চেয়ে নিজের ধারণা ও অনুভূতিকে বেশি গুরুত্ব দেন—এমনকি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেও।
প্রতিটি প্রেসিডেন্টই সাধারণত নিজের কাজের ধরন অনুযায়ী একটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো তৈরি করেন। ফ্রাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্ট অনেক সময় ঘনিষ্ঠ অনানুষ্ঠানিক উপদেষ্টাদের ওপর নির্ভর করতেন। হ্যারি এস. ট্রুম্যান বিভিন্ন বিভাগ ও সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করতে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করেন, বিশেষ করে শীতল যুদ্ধের সময়।
রিচার্ড নিক্সন ও জিমি কার্টার এই পরিষদকে নীতিগত ধারণা তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেন।

বারাক ওবামার প্রশাসনের সময় জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তারা প্রায়ই মজা করে বলতেন, অসংখ্য সিচুয়েশন রুম বৈঠকের কারণে যেন “বৈঠকের চাপে মৃত্যু” ঘটে। কেউ কেউ নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে তুলনা করতেন এমন একটি দৃশ্যের সঙ্গে, যেন একটি অজগর ধীরে ধীরে একটি শূকর গিলে ফেলছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের ধৈর্য এই ধরনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার জন্য খুব কম। ক্ষমতায় এসে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মীদের সংখ্যা অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে দেন। আনুগত্য নিয়ে সন্দেহের কারণে কিছু সদস্যকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।
ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাঁর জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কাজ নতুন নীতি বা বিকল্প পরিকল্পনা তৈরি করা নয়, বরং তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা।
যখন কোনো আলোচনা বা বিতর্ক হয়, তখনও অংশগ্রহণকারী খুব কম থাকে। ইরান নিয়ে আলোচনায় ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ, সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান জেনারেল ব্র্যাড কুপার এবং যৌথ বাহিনীর প্রধান জেনারেল ড্যান কেইন।
এই বৈঠকগুলো থেকে খুব কম তথ্য বাইরে আসে। এটি আগের অনেক প্রশাসনের তুলনায় বড় পরিবর্তন। ওবামা প্রশাসনের শুরুতে কখনও কখনও সিচুয়েশন রুমের আলোচনা বৈঠক শেষ হওয়ার আগেই সংবাদমাধ্যমে চলে আসত।
তবে জানা গেছে, জেনারেল কেইন ট্রাম্পকে সতর্ক করেছিলেন যে এই অভিযানে হতাহতের ঘটনা ঘটতে পারে এবং গোলাবারুদের ঘাটতির ঝুঁকিও থাকতে পারে।
ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স প্রথমে যুদ্ধে জড়ানোর বিষয়ে ভেতরে ভেতরে সতর্ক করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু সেই বিতর্ক শেষ হওয়ার পর তিনি প্রেসিডেন্টকে বলেন, “যদি যেতেই হয়, তাহলে বড় আকারে এবং দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।”

গোপনীয়তা বজায় রাখলেও বার্তা নিয়ন্ত্রণে সমস্যা দেখা যাচ্ছে। ইরানে হামলার উদ্দেশ্য, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের লক্ষ্য কিংবা গ্রিনল্যান্ড নিয়ে তাঁর বক্তব্য—এসব বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা এসেছে।
কখনও কখনও প্রশাসন এই অসঙ্গতিগুলোকে কৌশলগত বিভ্রান্তি তৈরির পরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু সমালোচকদের মতে এটি আসলে আগাম পরিকল্পনার অভাবই প্রকাশ করে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের গবেষক থমাস রাইট বলেন, ট্রাম্প মনে করেন তাঁর বিকল্প পরিকল্পনা বা জরুরি প্রস্তুতির দরকার নেই। তিনি শুধু চান একটি ছোট দল তাঁর সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়ন করুক।
তিনি বলেন, “কিন্তু যখন ঘটনা ভুল পথে যায়—যা প্রায়ই ঘটে—তখন প্রস্তুত বিকল্প না থাকলে প্রেসিডেন্ট বড় ঝুঁকি নিয়ে ফেলেন।”
এই কারণেই অনেক বিদেশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ও বিশ্বনেতা উদ্বিগ্ন। এক শীর্ষ আরব কূটনীতিক জানান, ইরানে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের পরিকল্পনা সম্পর্কে তাঁদের সরকারের স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বারবার বলেছেন, অন্য দেশের নতুন সরকার গঠন করা পেন্টাগনের কাজ নয়।

ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সফর সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানান, তিনি ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—ইরানে এই সামরিক অভিযান কীভাবে এবং কোন শর্তে শেষ হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি আগাম ভেবেছেন কি না।
আগের প্রশাসনগুলোর সময় এই ধরনের প্রশ্নের উত্তর খোঁজার দায়িত্ব সাধারণত জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের ওপর থাকত। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচল ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য মার্কিন নাগরিকদের আগাম সতর্ক করার কাজও তাদেরই ছিল।
কিন্তু এবার সেই সতর্কবার্তা দেওয়া হয় যখন লড়াই ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ফলে হাজার হাজার মার্কিন নাগরিক সেখানে আটকা পড়ে যান।
জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ নিয়ে লেখা বই “রানিং দ্য ওয়ার্ল্ড”-এর লেখক ডেভিড রথকফ বলেন, এখানে মৌলিক পরিকল্পনা প্রক্রিয়ার অভাব স্পষ্ট।
তিনি বলেন, এত বড় ঝুঁকি ও এত বিস্তৃত সামরিক পদক্ষেপ এত কম পরিকল্পনা নিয়ে আগে খুব কমই নেওয়া হয়েছে।
রথকফ বলেন, সাধারণত সামরিক বাহিনী অপারেশন পরিকল্পনা তৈরি করে এবং পরে তা জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে পর্যালোচনা করা হয়। কিন্তু এই প্রশাসনে সেই প্রক্রিয়া প্রায় অকার্যকর হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, ছোট আকারের সামরিক পদক্ষেপে প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ধারণা কাজ করতে পারে। কিন্তু ইরানের মতো বড় ও গুরুত্বপূর্ণ দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষেত্রে এটি কার্যকর নয়।
তবে ট্রাম্প হয়তো সাহস পেয়েছিলেন আগের কিছু অভিযানের সাফল্য থেকে। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের তিনটি বড় পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা কয়েক মাসের পরিকল্পনার ফল ছিল।

সেসব লক্ষ্যবস্তু ছিল গভীর ভূগর্ভে। যুক্তরাষ্ট্র মনে করেছিল শক্তিশালী বাংকার বিধ্বংসী বোমা ব্যবহার করে সেগুলোকে বড় ক্ষতি করা সম্ভব।
অভিযানটি সীমিত ছিল এবং বেশিরভাগ লক্ষ্যবস্তু দূরবর্তী এলাকায় হওয়ায় বেসামরিক হতাহতের আশঙ্কা কম ছিল।
ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতা থেকে সরানোর অভিযানটি ছিল আরও ঝুঁকিপূর্ণ। তবে সেখানে ট্রাম্প পুরো রাজনৈতিক কাঠামো বদলানোর চেষ্টা করেননি। মাদুরোকে সরানো ছাড়া দেশের ক্ষমতার কাঠামো মোটামুটি একই রাখা হয়।
তিনি এটাও স্পষ্ট করেছিলেন যে ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী ভেনেজুয়েলার বিরোধী দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য তিনি চাপ দেবেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার বিশাল তেল সম্পদে প্রবেশাধিকার পায়।
তবে দীর্ঘদিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রক্রিয়ায় কাজ করা কর্মকর্তাদের মতে, ইরান ও ভেনেজুয়েলার তুলনা করা ঠিক নয়। ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি ও রাজনীতির দিক থেকে এই দুই দেশ সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের বড় মিল শুধু একটাই—দুটিই তেলের ওপর নির্ভরশীল।
নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, তিনি আশা করেন ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস এবং বাসিজ মিলিশিয়ার কঠোর সদস্যরা অস্ত্র নামিয়ে জনগণের কাছে আত্মসমর্পণ করবে।
এই বক্তব্য পরিকল্পনার চেয়ে বরং আশা প্রকাশের মতোই শোনায়।

তবে ট্রাম্পের সমর্থকদের মতে, কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে এত আলোচনা আসলে তাঁকে তাঁর স্বাভাবিক ধরন থেকে দূরে সরানোর চেষ্টা।
তাঁদের মতে, যুদ্ধের প্রথম দিকের হামলাগুলোর একটিতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হওয়াই দেখায় যে ট্রাম্পের পদ্ধতি কাজ করছে।
অন্যদিকে ট্রাম্পের সমালোচকদের মতে, এই সংঘাত ট্রাম্প প্রশাসনের কাজের পদ্ধতির বড় দুর্বলতাগুলো সামনে এনে দিয়েছে।
ডেলাওয়ারের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস কুনস বলেন, “প্রেসিডেন্ট ও তাঁর প্রশাসন বারবার যুদ্ধের কারণ, যুদ্ধের সময়কাল এবং যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের মাত্রা নিয়ে অবস্থান বদলাচ্ছেন। আমরা আসলেই যুদ্ধে আছি কি না সেটাও কখনও পরিষ্কার নয়।”
তিনি আরও বলেন, “একটি বিষয়ই একই রয়ে গেছে—এই যুদ্ধ কীভাবে পরিচালিত হবে সে বিষয়ে সুস্পষ্ট কৌশলের অভাব। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ ও পরামর্শের বদলে যদি শুধু ব্যক্তিগত ধারণার ওপর ভিত্তি করে যুদ্ধ শুরু করা হয়, তাহলে এমনটাই ঘটে।”
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















