ইরান থেকে ছোড়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের আকস্মিক হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ বন্ধ হয়ে গেলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আটকে পড়েন হাজারো বিদেশি। অনেকেই আতঙ্কে পড়ে ব্যক্তিগত বিমান, দীর্ঘ সড়কপথ কিংবা সীমান্ত পেরিয়ে অন্য দেশে পালানোর চেষ্টা করছেন।
হঠাৎ হামলা, আতঙ্কে মানুষ
দুবাইয়ে প্রথম দফার ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র আসে কোনো সতর্কতা ছাড়াই। এরপর আরও কয়েকটি হামলা ঘটে। তখন শহরের বাসিন্দা ও পর্যটকদের অনেকেই কেনাকাটা করছিলেন বা সমুদ্রসৈকতে সময় কাটাচ্ছিলেন।
উপরের আকাশে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত হওয়ার দৃশ্য অনেকের কাছে দিনের বেলায় আতশবাজির মতো মনে হয়েছিল। কিন্তু কোনো সতর্কবার্তা বা সাইরেন না বাজায় পরিস্থিতি দ্রুত আতঙ্কে রূপ নেয়। আকাশ থেকে ধ্বংসাবশেষ পড়তে শুরু করলে মানুষ ছুটতে থাকে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে।
অনেকে তখন বাজারে গিয়ে খাবার মজুত করতে শুরু করেন এবং বিভিন্ন চ্যাটগ্রুপে ঘটনার খবর জানার চেষ্টা করেন। অনেকের প্রধান লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায় দ্রুত দেশ ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া, যদিও এরই মধ্যে আকাশপথ বন্ধ হয়ে গেছে।
মন্ত্রীর পরিবার আটকে পড়ল
এই সংকটে আটকে পড়া মানুষের মধ্যে ছিলেন ইতালির প্রতিরক্ষামন্ত্রী গুইদো ক্রোসেত্তো। তিনি পরিবারসহ সংযুক্ত আরব আমিরাতে ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি সামরিক বিমানে দেশ ছাড়তে সক্ষম হন, কিন্তু তার পরিবারকে সেখানেই রেখে যেতে হয়।
দূতাবাসগুলোর প্রস্তুতিও ছিল পিছিয়ে। কয়েকদিন পর যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর নাগরিকদের সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের বহু দেশ ছেড়ে যেতে পরামর্শ দেয়। তবে কীভাবে বের হতে হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি।
আকাশপথ বন্ধ, বাড়ছে ক্ষোভ
ফ্লাইট প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আটকে পড়া অনেক মার্কিন নাগরিক সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বিদেশে আটকে পড়া নাগরিকদের সহায়তায় পর্যাপ্ত পরিকল্পনা ছিল না।
দুবাইয়ে বসবাসরত এক মার্কিন নাগরিক তার স্ত্রীর সঙ্গে ভারতে পালিয়ে যান এক পরিচিত ব্যক্তির ব্যক্তিগত বিমানে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের সহায়তার অভাব তাকে বিস্মিত করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমেরিকানদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ করছে গ্রে বুল রেসকিউ নামের একটি সংগঠন। সংস্থাটির প্রধান ব্রায়ান স্টার্ন বলেন, আমিরাতের প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
সহজে প্রবেশ, কিন্তু বের হওয়া কঠিন
পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো বহু বছর ধরে বিদেশি বিনিয়োগকারী ও প্রবাসীদের আকর্ষণের কেন্দ্র। সহজ ভিসা, কর সুবিধা এবং বড় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থাকার কারণে এখানে যাতায়াত সহজ ছিল।
কিন্তু গত সপ্তাহে হাজারো ভ্রমণকারী ও প্রবাসী বুঝতে পারেন, এই অঞ্চল থেকে বের হওয়াই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করলে আরব উপদ্বীপের বেশিরভাগ আকাশপথ বন্ধ হয়ে যায়।
বড় এয়ারলাইনগুলো ফ্লাইট স্থগিত
এই পরিস্থিতিতে কাতার এয়ারওয়েজ, এতিহাদ এবং এমিরেটসের মতো বড় আঞ্চলিক বিমানসংস্থা নিয়মিত ফ্লাইট বন্ধ করে দেয়। কাতার অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
এমিরেটস ও এতিহাদ সীমিত কিছু বিশেষ ফ্লাইট চালালেও বেশিরভাগ নিয়মিত ফ্লাইট বন্ধ রয়েছে। দুবাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে মঙ্গলবার মাত্র ৮৩টি উড়োজাহাজ ওঠানামা করেছে। অথচ এক সপ্তাহ আগেও সেখানে প্রতিদিন প্রায় ১২০০টি ফ্লাইট পরিচালিত হচ্ছিল।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও জর্ডান থেকে চার্টার ফ্লাইটের মাধ্যমে ৯ হাজারের বেশি মার্কিন নাগরিককে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সও একই ধরনের উদ্ধার ফ্লাইটের ব্যবস্থা করেছে।
হতবিহ্বল পর্যটক
সাইমন স্টিফেন্স-মানাসিয়েভ নামের এক ভ্রমণকারী শনিবার দোহা থেকে মিলানে যাচ্ছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর তার বিমান ঘুরে আবার কাতারের রাজধানীতে ফিরে আসে।
স্ত্রীর সঙ্গে ইতালিতে স্কি ভ্রমণে যাওয়ার পরিকল্পনা ভেস্তে যায় তার। হঠাৎ করে নিজেকে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে আটকে পড়া অবস্থায় দেখতে পান তিনি।
তিনি বলেন, কী ঘটছে তা এখনো পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।

নিরাপদ পথ খুঁজছেন অনেকে
খাদ্য ও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কমে যাওয়ার আশঙ্কায় তিনি সৌদি আরবের মরুভূমি পেরিয়ে সাত ঘণ্টার ট্যাক্সি যাত্রায় রিয়াদে যাওয়ার কথা ভাবছেন। তবে পথে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি ও সীমান্তে ভিড়ের সম্ভাবনা তাকে উদ্বিগ্ন করে তুলছে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি খুবই জটিল। কয়েক দিনের মধ্যে সবকিছু শেষ হবে বলে মনে হয় না। আমরা কেউই নিশ্চিত নই কী ঘটতে যাচ্ছে।
ব্যক্তিগত বিমানের চাহিদা বেড়েছে
এই সংকটে ব্যক্তিগত বিমানের চাহিদা হঠাৎ বেড়ে গেছে। লুনাজেটস নামের একটি ব্যক্তিগত বিমান সংস্থা জানিয়েছে, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও ধনীরা দেশ ছাড়তে তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করছে।
সাধারণত সপ্তাহান্তে যেখানে দুই ডজনেরও কম অনুরোধ আসে, সেখানে গত সপ্তাহে প্রতিদিন শত শত অনুরোধ এসেছে।
সংস্থাটি তাদের গ্রাহকদের জন্য ওমান ও সৌদি আরব থেকে উড়োজাহাজের ব্যবস্থা করছে। দুবাইয়ে লুনাজেটসের পরিচালক ক্যারোলিন ক্রেস্প বলেন, আমাদের গ্রাহকেরা আতঙ্কিত।
ব্যয়বহুল উদ্ধার অভিযান
মিয়ামিভিত্তিক চার্টার সংস্থা এলিভেট এভিয়েশন ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় এক হাজার মানুষকে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে নেওয়ার একটি অভিযানে কাজ করছে।
সংস্থার প্রধান গ্রেগ রেইফ জানান, কর্মীদের ওমানের মাস্কাট বিমানবন্দরের কাছে জড়ো করা হয়েছে। সুযোগ পেলেই বড় একটি চার্টার বিমান পাঠিয়ে তাদের সরিয়ে নেওয়া হবে।
তবে এই ধরনের জরুরি ফ্লাইটের খরচ সাধারণ চার্টার বিমানের তুলনায় দুই থেকে তিন গুণ বেশি। বাড়তি বিমা খরচ ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে কাজ করা ক্রুদের অতিরিক্ত পারিশ্রমিকের কারণেই খরচ বেড়েছে।
নিজেদের পথ খুঁজছেন প্রবাসীরা
নিয়মিত ফ্লাইট বা দূতাবাসের সহায়তা না থাকায় অনেক প্রবাসী নিজেরাই বের হওয়ার পথ খুঁজছেন। কেউ কেউ ওমানের মতো প্রতিবেশী দেশে গিয়ে সেখান থেকে ফ্লাইট ধরার চেষ্টা করছেন।
এক বিদেশি ব্যবসায়ী জানান, দোহা থেকে রিয়াদ যেতে তাকে ট্যাক্সির জন্য এক হাজার ডলারের বেশি খরচ করতে হয়েছে। সেখানে বিমানবন্দরে ভিড় এত বেশি ছিল যে অনেক যাত্রী টয়লেট ব্যবহার বা ফোন চার্জ দিতেও হিমশিম খাচ্ছিলেন।
ড্রোন হামলায় ভেস্তে গেল ছুটি
এক ব্রিটিশ পরিবার দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহ এলাকায় ছুটি কাটাচ্ছিল। কাছের একটি হোটেলে ইরানি ড্রোন আঘাত করলে তাদের ছুটি হঠাৎ শেষ হয়ে যায়। তারা পরে ওমান সীমান্তের কাছাকাছি হাত্তা পাহাড়ি এলাকায় আশ্রয় নেয়।
আরেকটি ভারতীয় পরিবারও হাত্তার একটি রিসোর্টে ওঠে, কারণ ভিসা জটিলতার কারণে তারা সীমান্ত পার হতে পারেনি।
অপেক্ষায় অনেকেই
দুবাইয়ের বাসিন্দা এবং রিয়ালিটি টেলিভিশন তারকা তালিন খানয়ান মনে করেন, পরিস্থিতির শুরুটা পার করে অপেক্ষা করাই ভালো। তিনি আমিরাতের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখছেন।
তবে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি দেশ ছাড়ার চেষ্টা করবেন।
তিনি বলেন, এখন সবকিছু মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে।
#মধ্যপ্রাচ্য #দুবাই #ইরানসংকট #বিদেশি_উদ্ধার #যুদ্ধসংকট
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















