মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা বাড়তে থাকায় কুয়েতে ড্রোন হামলায় নিহত চার মার্কিন সেনা সদস্যের পরিচয় প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর। রবিবার কুয়েতের পোর্ট শুয়াইবায় একটি সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলায় মোট ছয়জন সেনা সদস্য নিহত হন এবং আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
নিহতরা সবাই যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি রিজার্ভের সদস্য ছিলেন এবং ডেস ময়েন্সভিত্তিক ১০৩তম সাসটেইনমেন্ট কমান্ডে কর্মরত ছিলেন। নিহত চারজন হলেন সার্জেন্ট ডিক্লান জে. কোডি, সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস নোয়া এল. টিয়েটজেন্স, ক্যাপ্টেন কোডি এ. খর্ক এবং সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস নিকোল এম. আমর।
সেনা রিজার্ভ প্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল রবার্ট হার্টার বলেন, এই সেনারা দেশের সুরক্ষায় নির্ভীক ও নিঃস্বার্থভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিনি বলেন, তাদের আত্মত্যাগ এবং তাদের পরিবারের ত্যাগ কখনও ভুলে যাওয়া হবে না।
ড্রোন হামলার পরিস্থিতি
রবিবার যে কমান্ড সেন্টারে হামলা হয় সেটি মূলত একটি ট্রেইলার ধরনের অস্থায়ী স্থাপনা ছিল। কর্মকর্তাদের মতে, এর ওপরের দিকে বিস্ফোরণ প্রতিরোধের মতো শক্ত সুরক্ষা ব্যবস্থা ছিল না।
স্থাপনাটি কংক্রিটের ব্যারিয়ার দিয়ে ঘেরা ছিল, যা মর্টার শেল বা গাড়িবোমার বিস্ফোরণ কিছুটা প্রতিহত করতে পারে। কিন্তু ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার বিরুদ্ধে এসব ব্যারিয়ার কার্যকর নয়। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোর জন্য এই ধরনের আকাশপথের হামলাই এখন প্রধান হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সার্জেন্ট ডিক্লান জে. কোডি
ডিক্লান কোডির পরিবার জানিয়েছে, রবিবার রাত প্রায় আটটার দিকে তারা তার মৃত্যুর খবর পান। তার বাবা অ্যান্ড্রু কোডি জানান, মৃত্যুর আগের দিন শনিবার ছেলের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল।
তিনি বলেন, তখন ডিক্লান বলেছিল যে সে নিরাপদে আছে।
২০২৩ সালে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হিসেবে কোডি আর্মি রিজার্ভে যোগ দেন। মৃত্যুর পর তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
তার লিংকডইন প্রোফাইলে তিনি লিখেছিলেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি মানুষের সঙ্গে কাজ করার নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। বিভিন্ন পটভূমির মানুষের সঙ্গে পরিচিত হয়ে তিনি অনেক কিছু শিখেছেন বলেও উল্লেখ করেন।
তার বাবা জানান, এই মিশন শেষে ডিক্লান সক্রিয় দায়িত্বে যোগ দেওয়ার কথাও ভাবছিলেন।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর কাজকে সে এতটাই ভালোবাসত। সে কখনও কোনও কাজকে ভয় পেত না এবং সবসময় মানুষের পাশে দাঁড়াতে চাইত।
সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস নোয়া এল. টিয়েটজেন্স
নোয়া টিয়েটজেন্সের মা গ্লেন্ডা, যিনি নেব্রাস্কার অর্ড শহরের বাসিন্দা, সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেলের মৃত্যুর খবর জানান।
একটি পোস্টে তিনি লিখেছিলেন, ঘুম আসছে না, চোখে ব্যথা, হৃদয় ভেঙে গেছে।
টিয়েটজেন্স একটি সামরিক পরিবারে বড় হয়েছেন। তার বাবা বিল সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পোস্টিংয়ে কাজ করতেন। তার যমজ ভাই নিকোলাস এবং আরেক ভাই উইলও সেনাবাহিনীতে কর্মরত।
২০০৬ সালে তিনি আর্মি রিজার্ভে চাকার যানবাহন মেকানিক হিসেবে যোগ দেন। এর আগে ২০০৯ এবং ২০১৯ সালে তিনি কুয়েতে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
তার স্ত্রী মিশেল এবং তাদের একটি ছোট সন্তান রয়েছে। তারা ওমাহা শহরের উপকণ্ঠে বসবাস করতেন।
ক্যাপ্টেন কোডি এ. খর্ক
কোডি খর্ক ২০০৯ সালে ন্যাশনাল গার্ডে যোগ দেন এবং ২০১৪ সালে আর্মি রিজার্ভে সামরিক পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে কমিশন পান।
তিনি এর আগে সৌদি আরব, কিউবা এবং পোল্যান্ডে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে একজন বিশ্বস্ত বন্ধু এবং সমাজে সক্রিয় নেতৃত্বদাতা হিসেবে স্মরণ করা হচ্ছে।
রিজার্ভ অফিসার্স ট্রেনিং কর্পসের সদস্য ট্রে মিলার ফেসবুকে লিখেছেন, খর্ক সবসময় তরুণ ক্যাডেটদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসতেন।
তিনি লিখেছেন, প্রতিদিন দেখা না হলেও এমন একজন মানুষ ছিলেন যাকে সহজে ভোলা যায় না। মানুষের সঙ্গে তার আচরণ এবং দায়িত্ববোধ সবাইকে গভীরভাবে প্রভাবিত করত।
ফ্লোরিডার সিনেটর রিক স্কট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, দেশের সুরক্ষার জন্য খর্ক যে চূড়ান্ত আত্মত্যাগ করেছেন তার জন্য রাজ্য ও জাতির পক্ষ থেকে অসীম কৃতজ্ঞতা জানানো হচ্ছে।
সার্জেন্ট ফার্স্ট ক্লাস নিকোল এম. আমর
নিকোল আমর ২০০৫ সালে ন্যাশনাল গার্ডে যোগ দেন এবং ২০০৬ সালে আর্মি রিজার্ভে স্থানান্তরিত হন। তিনি স্বয়ংক্রিয় লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করতেন।
এর আগে তিনি কুয়েত ও ইরাকে দায়িত্ব পালন করেছেন।
খবর অনুযায়ী, তিনি মৃত্যুর কয়েকদিন পরই স্বামী ও দুই সন্তানের কাছে বাড়ি ফেরার কথা ছিল।
তার স্বামী জোয়ি আমর বলেন, কুয়েতে গেলে সাধারণত কেউ ভাবেন না যে এমন কিছু ঘটবে। আর তার স্ত্রী প্রথম নিহতদের একজন হওয়ায় বিষয়টি আরও কষ্টদায়ক হয়ে উঠেছে।
দম্পতির একটি কিশোর ছেলে এবং চতুর্থ শ্রেণিতে পড়া একটি মেয়ে রয়েছে।
জোয়ি আমর বলেন, কেউ সাহায্য চাইলে নিকোল সবসময় এগিয়ে যেতেন। তিনি অনেক মানুষকে কঠিন সময় পার করতে সহায়তা করেছেন এবং অনেকের জীবনে আলো এনে দিয়েছেন।
হামলার তদন্ত ও ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
এই ড্রোন হামলার ঘটনা এখনও তদন্তাধীন বলে জানিয়েছে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর।
হামলায় নিহত আরও দুই সেনা সদস্যের মরদেহ পরে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের পরিচয় পরিবারের সদস্যদের জানানো হলে শিগগিরই প্রকাশ করা হবে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা অব্যাহত থাকলে মার্কিন সেনাদের হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
তিনি জানান, চলমান সামরিক অভিযান কয়েক সপ্তাহ কিংবা তারও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
সোমবার পেন্টাগনে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ বলেন, প্রশাসনের লক্ষ্য পূরণ করতে প্রয়োজনে ইরানে স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রাথমিক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড নিহত সেনাদের ‘যুদ্ধে নিহত’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে রয়েছে, এই ঘটনাও সেই দীর্ঘ ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















