১১:০৫ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
ইরান প্রেসিডেন্টের বার্তা: সাধারণ আমেরিকানদের প্রতি কোনো শত্রুতা নেই  ইরান থেকে দ্রুত সরে যাবে যুক্তরাষ্ট্র, প্রয়োজনে ফের হামলা—ট্রাম্পের ইঙ্গিতেই বাড়ছে বৈশ্বিক উত্তেজনা সিলেটের সব পেট্রোল পাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা ইস্টার্ন রিফাইনারি সাময়িক বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা, তেলের ঘাটতি বাড়ছে পাঞ্জাবের স্কুলে শুক্রবার নির্ধারিত হল সাপ্তাহিক বন্ধের দিন ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভি ফুটেজ রহস্য: হার্ডড্রাইভ বদলে যাওয়ার অভিযোগে চাঞ্চল্য ট্রেন লাইনচ্যুত, তেলবাহী ওয়াগন খালে পড়লো, স্থানীয়দের হিড়িক যুদ্ধের প্রভাবে রফতানি কমছে, চাপ বাড়ছে শিল্প খাতে খাদ্য সংকটের সতর্কতা দিল IMF — বিশ্বের ২০ কোটি ব্যারেল তেল হারাচ্ছে প্রতিদিন ঘুমের সমস্যায় কার্যকর সমাধান যোগব্যায়াম? নতুন গবেষণায় মিলছে ইতিবাচক ফল

ইরান যুদ্ধের ফলে কি মধ্য প্রাচ্যে পুরানো সামরিক জোট ভেঙ্গে যাবে? 

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও সামরিক শক্তির ভারসাম্যে এক গভীর পরিবর্তনের আভাস মিলছে। মাত্র আড়াই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অঞ্চলের বহুদিনের শক্তি কাঠামো ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। যে আঞ্চলিক জোট বহু বছর ধরে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তা এখন কার্যত দুর্বল ও বিভক্ত। অন্যদিকে দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের ফলে ইসরায়েল এখন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।

এই পরিবর্তনের সূত্রপাত হয়েছিল গাজা উপত্যকা ঘিরে সংঘাতের মধ্য দিয়ে। সেই ঘটনার প্রায় ঊনত্রিশ মাস পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিতে শুরু করেছে। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর শক্তি কমে এসেছে এবং একসময়ের শক্তিশালী প্রতিরোধ জোট এখন ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে।

যুদ্ধের সূচনা ও পাল্টে যাওয়া বাস্তবতা

২০২৩ সালের শরতের এক সকালে গাজা উপত্যকার একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ থেকে হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার ইসরায়েলে হামলার নির্দেশ দেন। সেই আক্রমণই পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সূচনা করে।

Sinwar's Death Highlights Israel's Long Quest for Deterrence - The New York  Times

সিনওয়ারের পরিকল্পনা ছিল ইসরায়েলকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করা এবং ফিলিস্তিনি আন্দোলনকে নতুন গতি দেওয়া। কিন্তু যুদ্ধের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পরিস্থিতি উল্টো দিকে মোড় নেয়। গাজা ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলি অভিযানে ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হলে হামাস নেতৃত্ব বড় ধাক্কা খায়। সেই ঘটনার পর থেকেই হামাসকে ঘিরে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক সমর্থন ও জোট দুর্বল হয়ে পড়তে শুরু করে।

ইরানের প্রভাবের টালমাটাল অবস্থা

চার দশকের বেশি সময় ধরে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের একটি শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে কাজ করে এসেছে। হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে তারা একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল।

তবে সাম্প্রতিক সংঘাত সেই কাঠামোকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর দেশটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে। নেতৃত্ব সংকট ও অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ তেহরানের প্রভাবকে দুর্বল করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এদিকে বিভিন্ন অঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটলেও তার অনেকগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে এবং বেসামরিক এলাকায় আঘাত করেছে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

Israel and the Occupied Palestinian Territory - Global Centre for the  Responsibility to Protect

সামরিক শক্তিতে এগিয়ে ইসরায়েল

দীর্ঘ এই সংঘাতের অন্যতম বড় ফলাফল হিসেবে সামনে এসেছে ইসরায়েলের সামরিক শক্তির উত্থান। বহু বছর ধরে নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশটি এখন নিজেদের সীমান্ত ঘিরে বড় হুমকিগুলোকে অনেকটাই দুর্বল করতে সক্ষম হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম ইসরায়েল নিজেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে দেখতে শুরু করেছে। তবে যুদ্ধের গভীর মানসিক প্রভাব এখনও সমাজে রয়ে গেছে এবং নতুন প্রজন্ম আবারও সংঘাতের ট্রমা বহন করছে।

নতুন আঞ্চলিক শক্তি সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় সৌদি আরব ও তুরস্ক নিজেদের অবস্থান নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে। অর্থনৈতিক শক্তি ও কূটনৈতিক প্রভাবের কারণে সৌদি আরব ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে তুরস্কও আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠছে। তবে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ ও প্রতিযোগিতা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অনেক দেশ ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি নিয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

May be an image of one or more people and grass

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে অঞ্চল

একসময় মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির কাঠামো তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ছিল। সেখানে ইরান ছিল বিরোধী শক্তির কেন্দ্র, যুক্তরাষ্ট্র ছিল নিরাপত্তার বড় ভরসা এবং উপসাগরীয় দেশগুলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করত।

এখন সেই কাঠামো ভেঙে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। তেহরানের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং গাজার ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের আগামী রাজনৈতিক মানচিত্র গড়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, অঞ্চলটি এখন এমন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে যার পূর্ণ রূপ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যকে দীর্ঘমেয়াদে বদলে দিয়েছে।

May be an image of Stone Henge

No photo description available.

জনপ্রিয় সংবাদ

ইরান প্রেসিডেন্টের বার্তা: সাধারণ আমেরিকানদের প্রতি কোনো শত্রুতা নেই

ইরান যুদ্ধের ফলে কি মধ্য প্রাচ্যে পুরানো সামরিক জোট ভেঙ্গে যাবে? 

০৬:২১:৪১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি ও সামরিক শক্তির ভারসাম্যে এক গভীর পরিবর্তনের আভাস মিলছে। মাত্র আড়াই বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর অঞ্চলের বহুদিনের শক্তি কাঠামো ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। যে আঞ্চলিক জোট বহু বছর ধরে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল, তা এখন কার্যত দুর্বল ও বিভক্ত। অন্যদিকে দীর্ঘ যুদ্ধের অভিজ্ঞতা এবং ধারাবাহিক সামরিক অভিযানের ফলে ইসরায়েল এখন মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রভাবশালী শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে।

এই পরিবর্তনের সূত্রপাত হয়েছিল গাজা উপত্যকা ঘিরে সংঘাতের মধ্য দিয়ে। সেই ঘটনার প্রায় ঊনত্রিশ মাস পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ নতুন রূপ নিতে শুরু করেছে। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর শক্তি কমে এসেছে এবং একসময়ের শক্তিশালী প্রতিরোধ জোট এখন ভাঙনের মুখে দাঁড়িয়ে।

যুদ্ধের সূচনা ও পাল্টে যাওয়া বাস্তবতা

২০২৩ সালের শরতের এক সকালে গাজা উপত্যকার একটি ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গ থেকে হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার ইসরায়েলে হামলার নির্দেশ দেন। সেই আক্রমণই পুরো অঞ্চলের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেওয়ার সূচনা করে।

Sinwar's Death Highlights Israel's Long Quest for Deterrence - The New York  Times

সিনওয়ারের পরিকল্পনা ছিল ইসরায়েলকে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করা এবং ফিলিস্তিনি আন্দোলনকে নতুন গতি দেওয়া। কিন্তু যুদ্ধের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে পরিস্থিতি উল্টো দিকে মোড় নেয়। গাজা ধীরে ধীরে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় এবং হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসরায়েলি অভিযানে ইয়াহিয়া সিনওয়ার নিহত হলে হামাস নেতৃত্ব বড় ধাক্কা খায়। সেই ঘটনার পর থেকেই হামাসকে ঘিরে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক সমর্থন ও জোট দুর্বল হয়ে পড়তে শুরু করে।

ইরানের প্রভাবের টালমাটাল অবস্থা

চার দশকের বেশি সময় ধরে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের একটি শক্তিশালী প্রভাবক হিসেবে কাজ করে এসেছে। হামাস, হিজবুল্লাহ এবং ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সমর্থন দিয়ে তারা একটি বিস্তৃত আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক তৈরি করেছিল।

তবে সাম্প্রতিক সংঘাত সেই কাঠামোকে নড়বড়ে করে দিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর পর দেশটি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে। নেতৃত্ব সংকট ও অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ তেহরানের প্রভাবকে দুর্বল করে তুলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এদিকে বিভিন্ন অঞ্চলে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটলেও তার অনেকগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে এবং বেসামরিক এলাকায় আঘাত করেছে। এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

Israel and the Occupied Palestinian Territory - Global Centre for the  Responsibility to Protect

সামরিক শক্তিতে এগিয়ে ইসরায়েল

দীর্ঘ এই সংঘাতের অন্যতম বড় ফলাফল হিসেবে সামনে এসেছে ইসরায়েলের সামরিক শক্তির উত্থান। বহু বছর ধরে নিরাপত্তা ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশটি এখন নিজেদের সীমান্ত ঘিরে বড় হুমকিগুলোকে অনেকটাই দুর্বল করতে সক্ষম হয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথম ইসরায়েল নিজেকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে দেখতে শুরু করেছে। তবে যুদ্ধের গভীর মানসিক প্রভাব এখনও সমাজে রয়ে গেছে এবং নতুন প্রজন্ম আবারও সংঘাতের ট্রমা বহন করছে।

নতুন আঞ্চলিক শক্তি সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত বাস্তবতায় সৌদি আরব ও তুরস্ক নিজেদের অবস্থান নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করছে। অর্থনৈতিক শক্তি ও কূটনৈতিক প্রভাবের কারণে সৌদি আরব ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

অন্যদিকে তুরস্কও আঞ্চলিক কূটনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠছে। তবে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সন্দেহ ও প্রতিযোগিতা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। একই সঙ্গে উপসাগরীয় অনেক দেশ ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক শক্তি নিয়ে সতর্ক দৃষ্টিতে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

May be an image of one or more people and grass

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে অঞ্চল

একসময় মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির কাঠামো তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট ছিল। সেখানে ইরান ছিল বিরোধী শক্তির কেন্দ্র, যুক্তরাষ্ট্র ছিল নিরাপত্তার বড় ভরসা এবং উপসাগরীয় দেশগুলো অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করত।

এখন সেই কাঠামো ভেঙে নতুন বাস্তবতা তৈরি হচ্ছে। তেহরানের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং গাজার ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের আগামী রাজনৈতিক মানচিত্র গড়ে উঠতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, অঞ্চলটি এখন এমন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে যার পূর্ণ রূপ এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—এই সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যকে দীর্ঘমেয়াদে বদলে দিয়েছে।

May be an image of Stone Henge

No photo description available.