১১:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
যুদ্ধ থামলেও থামবে না ঝুঁকি: ইরান আরও শক্তিশালী, উপসাগরীয় অঞ্চল বড় বিপদের মুখে ইরান প্রেসিডেন্টের বার্তা: সাধারণ আমেরিকানদের প্রতি কোনো শত্রুতা নেই  ইরান থেকে দ্রুত সরে যাবে যুক্তরাষ্ট্র, প্রয়োজনে ফের হামলা—ট্রাম্পের ইঙ্গিতেই বাড়ছে বৈশ্বিক উত্তেজনা সিলেটের সব পেট্রোল পাম্প অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা ইস্টার্ন রিফাইনারি সাময়িক বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা, তেলের ঘাটতি বাড়ছে পাঞ্জাবের স্কুলে শুক্রবার নির্ধারিত হল সাপ্তাহিক বন্ধের দিন ট্রাইব্যুনালের সিসিটিভি ফুটেজ রহস্য: হার্ডড্রাইভ বদলে যাওয়ার অভিযোগে চাঞ্চল্য ট্রেন লাইনচ্যুত, তেলবাহী ওয়াগন খালে পড়লো, স্থানীয়দের হিড়িক যুদ্ধের প্রভাবে রফতানি কমছে, চাপ বাড়ছে শিল্প খাতে খাদ্য সংকটের সতর্কতা দিল IMF — বিশ্বের ২০ কোটি ব্যারেল তেল হারাচ্ছে প্রতিদিন

যুদ্ধ ডায়েরি: ছয় দিনে নতুন মোড়—ইরান যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে নতুন ভূগোলে

মধ্যপ্রাচ্যে ছয় দিন আগে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন আর শুধু একটি সীমিত সামরিক অভিযান নয়। শুরুতে ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক অবকাঠামোর ওপর কেন্দ্রীভূত আঘাত হিসেবে যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, ষষ্ঠ দিনে এসে তা ধীরে ধীরে বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের রূপ নিতে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখনও ইরানের আকাশসীমায় আধিপত্য ধরে রেখেছে এবং উভয় পক্ষই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে যুদ্ধের চরিত্র বদলাচ্ছে। দ্রুত সিদ্ধান্তমূলক আঘাতের বদলে এখন ধীরে ধীরে চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার কৌশল সামনে আসছে।

যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে নতুন অঞ্চলে

এই যুদ্ধের বিস্তার সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে। আজারবাইজানের নাখচিভান বিমানবন্দরে দুটি আত্মঘাতী ড্রোন আঘাত হানে। ভিডিও ফুটেজে ইরানের শাহেদ ধরনের ড্রোনের মতো শব্দ শোনা যায় বলে আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।

আজারবাইজান দাবি করেছে, ড্রোনগুলো ইরানের ভূখণ্ড থেকে এসেছে। এতে দুজন আহত হন। যদিও সামরিকভাবে এই হামলার প্রভাব সীমিত, তবে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলি বিমান আজারবাইজানের আকাশপথ ব্যবহার করেছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে আলোচনা হয়েছিল। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার মাধ্যমে ইরান পরোক্ষভাবে সতর্কবার্তা দিতে চেয়েছে যে যারা ইসরায়েলের অভিযানকে সহায়তা করবে তারা নিরাপদ থাকবে না।

ইসরাইলি হামলা বন্ধ না হলে আলোচনা নয়: আরাঘচি

সমুদ্রেও বাড়ছে উত্তেজনা

যুদ্ধ এখন সমুদ্রেও নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি এলাকায় একটি মার্কিন সাবমেরিন ইরানের ফ্রিগেট ‘আইআরআইএস ডেনা’কে টর্পেডো হামলায় ডুবিয়ে দেয়। ইরান জানিয়েছে, এতে প্রায় ৮০ নাবিক নিহত হয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই ঘটনাকে ‘সমুদ্রের ভয়াবহ অপরাধ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

একই সময়ে কাস্পিয়ান অঞ্চল থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন ও তুরস্কের জেইহান রপ্তানি টার্মিনাল লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যদিও এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কোনো বড় ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।

বাণিজ্যিক জাহাজও ঝুঁকিতে

যুদ্ধের প্রভাব এখন বাণিজ্যিক নৌপরিবহনেও পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেসামরিক জাহাজ চলাচলও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

Video Shows Tanker on Fire in Gulf of Oman

ইরানের ভেতরে বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু

ইরানের ভেতরে হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় শুধু সামরিক স্থাপনা নেই। তেহরানের আজাদি স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সে ইসরায়েলি হামলা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ১২ হাজার আসনের এই ক্রীড়া স্থাপনাটি রাজধানীর অন্যতম পরিচিত স্থাপনা।

যুদ্ধের প্রথম দিনেই একটি স্কুলে হামলায় ১৬৫ জন স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছিল। এরপর একটি হাসপাতাল ও একটি ঐতিহাসিক স্থাপনাতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফলে ইরানি গণমাধ্যম ও জনমত ক্রমেই মনে করছে এই যুদ্ধ শুধু সরকার নয়, পুরো জনগোষ্ঠীকেই লক্ষ্য করছে।

ইরানের নতুন সামরিক কৌশল

ষষ্ঠ দিনে যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে ইরানের কৌশলে। তেহরানের ওপর হামলার পাশাপাশি অন্য জায়গায়ও সামরিক পদক্ষেপ বাড়ানো হয়েছে।

ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল এ তথ্য নিশ্চিত করেনি, ইরানি গণমাধ্যমে বিমানটির ধ্বংসাবশেষের ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।

Qatar Says It Shot Down Two Iranian Bombers - The New York Times

একই সময়ে কাতারের আকাশসীমায় প্রবেশ করা দুটি ইরানি বিমান কাতারের প্রতিরক্ষা বাহিনী ভূপাতিত করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে যখন ইরান ও হিজবুল্লাহ একসঙ্গে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় অংশে সমন্বিত হামলা চালায়। ইরান থেকে তেল আবিবের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় এবং একই সময়ে লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর ড্রোন ঢুকে পড়ে। এতে একযোগে ১৬১টি বিমান হামলার সতর্কবার্তা জারি হয় এবং প্রায় ৬০ লাখ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সস্তা ড্রোন ব্যবহার করে ইরান ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্লান্ত করে দিতে চাইছে। কারণ একটি ড্রোন ধ্বংস করতে যে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয় তার দাম অনেক বেশি।

ধর্মীয় উত্তেজনাও বাড়ছে

যুদ্ধের ষষ্ঠ দিনে ধর্মীয় উত্তেজনার লক্ষণও দেখা গেছে। ইরাকের শীর্ষ শিয়া ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলি সিস্তানি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হত্যার নিন্দা করেছেন, তবে সরাসরি যুদ্ধের আহ্বান জানাননি।

এর কয়েক ঘণ্টা পর শিয়া নেতা সাইয়্যিদ হাশেম আল-হায়দারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দেন। এতে বোঝা যাচ্ছে সংঘাত ধীরে ধীরে ধর্মীয় আবেগের দিকেও মোড় নিচ্ছে।

ইরান: বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে 'সন্ত্রাসী সংগঠন' বলে ঘোষণা করতে যাচ্ছে  যুক্তরাজ্য - BBC News বাংলা

কুর্দি সীমান্তে নতুন উত্তেজনা

একই সময়ে ইরান সীমান্তবর্তী এলাকায় কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাও বাড়ছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইরাকি কুর্দিস্তানের কয়েকটি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। সীমান্তে সেনা মোতায়েনও বাড়ানো হয়েছে।

দীর্ঘ যুদ্ধের ইঙ্গিত

সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যাচ্ছে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখনও আকাশ শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও ইরান যুদ্ধকে ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিস্তৃত করার কৌশল নিচ্ছে।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে এই সংঘাত সংশ্লিষ্ট অভিযান অন্তত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চালানোর জন্য গোয়েন্দা সহায়তা বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন বলে জানা গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে শুরুতে যে স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের ধারণা ছিল তা এখন আর বাস্তবসম্মত মনে করা হচ্ছে না।

বর্তমানে এই যুদ্ধে প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে বলে অভ্যন্তরীণ হিসাব বলছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, নৌ অভিযান এবং আকাশ হামলার ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।

ছয় দিনে এসে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, এই সংঘাত আর সীমিত যুদ্ধ নয়। বরং ধীরে ধীরে নতুন অঞ্চল ও নতুন শক্তিকে জড়িয়ে একটি বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

যুদ্ধ থামলেও থামবে না ঝুঁকি: ইরান আরও শক্তিশালী, উপসাগরীয় অঞ্চল বড় বিপদের মুখে

যুদ্ধ ডায়েরি: ছয় দিনে নতুন মোড়—ইরান যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে নতুন ভূগোলে

০৭:৩৮:৪৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ ২০২৬

মধ্যপ্রাচ্যে ছয় দিন আগে শুরু হওয়া যুদ্ধ এখন আর শুধু একটি সীমিত সামরিক অভিযান নয়। শুরুতে ইরানের নেতৃত্ব ও সামরিক অবকাঠামোর ওপর কেন্দ্রীভূত আঘাত হিসেবে যে সংঘাত শুরু হয়েছিল, ষষ্ঠ দিনে এসে তা ধীরে ধীরে বিস্তৃত ও দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের রূপ নিতে শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখনও ইরানের আকাশসীমায় আধিপত্য ধরে রেখেছে এবং উভয় পক্ষই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে যুদ্ধের চরিত্র বদলাচ্ছে। দ্রুত সিদ্ধান্তমূলক আঘাতের বদলে এখন ধীরে ধীরে চাপ সৃষ্টি করে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করার কৌশল সামনে আসছে।

যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে নতুন অঞ্চলে

এই যুদ্ধের বিস্তার সবচেয়ে স্পষ্ট হয়েছে দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলে। আজারবাইজানের নাখচিভান বিমানবন্দরে দুটি আত্মঘাতী ড্রোন আঘাত হানে। ভিডিও ফুটেজে ইরানের শাহেদ ধরনের ড্রোনের মতো শব্দ শোনা যায় বলে আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানিয়েছে।

আজারবাইজান দাবি করেছে, ড্রোনগুলো ইরানের ভূখণ্ড থেকে এসেছে। এতে দুজন আহত হন। যদিও সামরিকভাবে এই হামলার প্রভাব সীমিত, তবে এর রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেক বেশি। যুদ্ধের শুরুতে ইসরায়েলি বিমান আজারবাইজানের আকাশপথ ব্যবহার করেছিল বলে বিভিন্ন সূত্রে আলোচনা হয়েছিল। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার মাধ্যমে ইরান পরোক্ষভাবে সতর্কবার্তা দিতে চেয়েছে যে যারা ইসরায়েলের অভিযানকে সহায়তা করবে তারা নিরাপদ থাকবে না।

ইসরাইলি হামলা বন্ধ না হলে আলোচনা নয়: আরাঘচি

সমুদ্রেও বাড়ছে উত্তেজনা

যুদ্ধ এখন সমুদ্রেও নতুন মাত্রা পেয়েছে। ভারত মহাসাগরে শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি এলাকায় একটি মার্কিন সাবমেরিন ইরানের ফ্রিগেট ‘আইআরআইএস ডেনা’কে টর্পেডো হামলায় ডুবিয়ে দেয়। ইরান জানিয়েছে, এতে প্রায় ৮০ নাবিক নিহত হয়েছেন।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই ঘটনাকে ‘সমুদ্রের ভয়াবহ অপরাধ’ বলে অভিহিত করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রকে কঠোর প্রতিক্রিয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

একই সময়ে কাস্পিয়ান অঞ্চল থেকে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহকারী গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন ও তুরস্কের জেইহান রপ্তানি টার্মিনাল লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। যদিও এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে কোনো বড় ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।

বাণিজ্যিক জাহাজও ঝুঁকিতে

যুদ্ধের প্রভাব এখন বাণিজ্যিক নৌপরিবহনেও পড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে একটি তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে স্পষ্ট হচ্ছে যে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেসামরিক জাহাজ চলাচলও ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

Video Shows Tanker on Fire in Gulf of Oman

ইরানের ভেতরে বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু

ইরানের ভেতরে হামলার লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় শুধু সামরিক স্থাপনা নেই। তেহরানের আজাদি স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সে ইসরায়েলি হামলা হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। ১২ হাজার আসনের এই ক্রীড়া স্থাপনাটি রাজধানীর অন্যতম পরিচিত স্থাপনা।

যুদ্ধের প্রথম দিনেই একটি স্কুলে হামলায় ১৬৫ জন স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছিল। এরপর একটি হাসপাতাল ও একটি ঐতিহাসিক স্থাপনাতেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। ফলে ইরানি গণমাধ্যম ও জনমত ক্রমেই মনে করছে এই যুদ্ধ শুধু সরকার নয়, পুরো জনগোষ্ঠীকেই লক্ষ্য করছে।

ইরানের নতুন সামরিক কৌশল

ষষ্ঠ দিনে যুদ্ধের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা গেছে ইরানের কৌশলে। তেহরানের ওপর হামলার পাশাপাশি অন্য জায়গায়ও সামরিক পদক্ষেপ বাড়ানো হয়েছে।

ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে বলে দাবি করেছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েল এ তথ্য নিশ্চিত করেনি, ইরানি গণমাধ্যমে বিমানটির ধ্বংসাবশেষের ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।

Qatar Says It Shot Down Two Iranian Bombers - The New York Times

একই সময়ে কাতারের আকাশসীমায় প্রবেশ করা দুটি ইরানি বিমান কাতারের প্রতিরক্ষা বাহিনী ভূপাতিত করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে যখন ইরান ও হিজবুল্লাহ একসঙ্গে ইসরায়েলের কেন্দ্রীয় অংশে সমন্বিত হামলা চালায়। ইরান থেকে তেল আবিবের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয় এবং একই সময়ে লেবানন থেকে হিজবুল্লাহর ড্রোন ঢুকে পড়ে। এতে একযোগে ১৬১টি বিমান হামলার সতর্কবার্তা জারি হয় এবং প্রায় ৬০ লাখ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে সস্তা ড্রোন ব্যবহার করে ইরান ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্লান্ত করে দিতে চাইছে। কারণ একটি ড্রোন ধ্বংস করতে যে প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে হয় তার দাম অনেক বেশি।

ধর্মীয় উত্তেজনাও বাড়ছে

যুদ্ধের ষষ্ঠ দিনে ধর্মীয় উত্তেজনার লক্ষণও দেখা গেছে। ইরাকের শীর্ষ শিয়া ধর্মীয় নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ আলি সিস্তানি ইরানের সর্বোচ্চ নেতার হত্যার নিন্দা করেছেন, তবে সরাসরি যুদ্ধের আহ্বান জানাননি।

এর কয়েক ঘণ্টা পর শিয়া নেতা সাইয়্যিদ হাশেম আল-হায়দারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জিহাদের ডাক দেন। এতে বোঝা যাচ্ছে সংঘাত ধীরে ধীরে ধর্মীয় আবেগের দিকেও মোড় নিচ্ছে।

ইরান: বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে 'সন্ত্রাসী সংগঠন' বলে ঘোষণা করতে যাচ্ছে  যুক্তরাজ্য - BBC News বাংলা

কুর্দি সীমান্তে নতুন উত্তেজনা

একই সময়ে ইরান সীমান্তবর্তী এলাকায় কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাও বাড়ছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী ইরাকি কুর্দিস্তানের কয়েকটি এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে জানা গেছে। সীমান্তে সেনা মোতায়েনও বাড়ানো হয়েছে।

দীর্ঘ যুদ্ধের ইঙ্গিত

সামগ্রিক পরিস্থিতি দেখলে বোঝা যাচ্ছে যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এখনও আকাশ শক্তিতে এগিয়ে থাকলেও ইরান যুদ্ধকে ভৌগোলিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিস্তৃত করার কৌশল নিচ্ছে।

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে এই সংঘাত সংশ্লিষ্ট অভিযান অন্তত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চালানোর জন্য গোয়েন্দা সহায়তা বাড়ানোর অনুরোধ করেছেন বলে জানা গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে শুরুতে যে স্বল্পমেয়াদি যুদ্ধের ধারণা ছিল তা এখন আর বাস্তবসম্মত মনে করা হচ্ছে না।

বর্তমানে এই যুদ্ধে প্রতিদিন প্রায় এক বিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে বলে অভ্যন্তরীণ হিসাব বলছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, নৌ অভিযান এবং আকাশ হামলার ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।

ছয় দিনে এসে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, এই সংঘাত আর সীমিত যুদ্ধ নয়। বরং ধীরে ধীরে নতুন অঞ্চল ও নতুন শক্তিকে জড়িয়ে একটি বিস্তৃত সংঘাতে রূপ নিচ্ছে।