মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। প্রায় আট দশক পর মার্কিন নৌবাহিনীর একটি সাবমেরিন সরাসরি টর্পেডো হামলা চালিয়ে একটি শত্রু যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়েছে। শ্রীলঙ্কা উপকূলের কাছে ইরানের একটি শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ ডুবে যাওয়ার এই ঘটনা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে এবং যুদ্ধের বিস্তার নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

শ্রীলঙ্কার কাছে ভয়াবহ বিস্ফোরণ
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর সাবমেরিনের পেরিস্কোপ থেকে ধারণ করা একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। সেই ভিডিওতে দেখা যায়, একটি বড় বিস্ফোরণের পর জাহাজটির পেছনের অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং কিছু সময়ের মধ্যেই সেটি সাগরে তলিয়ে যেতে শুরু করে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, ডুবে যাওয়া জাহাজটি ছিল ইরানের ফ্রিগেট ‘আইআরআইএস দেনা’। ঘটনাস্থল ইরান থেকে প্রায় দুই হাজার মাইল দূরে।
শ্রীলঙ্কা জানায়, জাহাজটি থেকে বিপদ সংকেত পাওয়ার পর তারা উদ্ধার অভিযান চালায়। উদ্ধার অভিযানে ৩২ জনকে জীবিত পাওয়া গেছে এবং ৮৭ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। জাহাজটিতে মোট প্রায় ১৩০ জন নাবিক ছিলেন বলে জানিয়েছে ইরান।

যুক্তরাষ্ট্র বলছে “নীরব মৃত্যু”, ইরানের অভিযোগ “নৃশংসতা”
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এই হামলাকে ‘নীরব মৃত্যু’ বলে উল্লেখ করেছেন। অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনাকে ‘নৃশংসতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।
ইরানের দাবি, যুদ্ধজাহাজটি ভারত মহাসাগরে একটি বহুজাতিক নৌমহড়ায় অংশ নেওয়ার পর দেশে ফিরছিল। সেই মহড়ায় বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনী অংশ নিয়েছিল এবং এটি মূলত আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছিল।
কিন্তু সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, দেনা ছিল ইরানের অন্যতম আধুনিক ও শক্তিশালী যুদ্ধজাহাজ। এতে আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং টর্পেডো বহনের সক্ষমতা ছিল।

সম্ভাব্য হুমকি মনে করেই হামলা
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্র এই জাহাজটিকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করেছিল। তাদের মতে, চলমান সংঘাতের পরিস্থিতিতে জাহাজটি মিত্র দেশগুলোর বাণিজ্যিক জাহাজ বা মালবাহী জাহাজে হামলা চালাতে পারত।
আরেকজন সামরিক বিশেষজ্ঞের মতে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তি দেখিয়ে এই হামলাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে যুক্তরাষ্ট্র।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, জাহাজটি কি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিল এবং হামলার আগে কোনো সতর্কতা দেওয়া হয়েছিল কি না—এই বিষয়গুলো এখনো পরিষ্কার নয়।
ইতিহাসে বিরল সাবমেরিন হামলা
সামরিক ইতিহাসে সাবমেরিন দিয়ে যুদ্ধজাহাজ ডুবানোর ঘটনা খুবই বিরল। সর্বশেষ নিশ্চিত এমন ঘটনা ঘটেছিল ১৯৮২ সালে, যখন ব্রিটিশ সাবমেরিন আর্জেন্টিনার একটি ক্রুজার ডুবিয়ে দেয়।
মার্কিন নৌবাহিনীর ক্ষেত্রে শত্রু যুদ্ধজাহাজ ডুবানোর সর্বশেষ ঘটনা ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে, ১৯৪৫ সালে।
এই কারণে শ্রীলঙ্কার কাছে ইরানের যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনাকে সামরিক ইতিহাসে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়ছে বিস্তৃত অঞ্চলে
বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার মাধ্যমে সংঘাতের ভৌগোলিক বিস্তার আরও বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্য ছাড়িয়ে ভূমধ্যসাগর এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে পাল্টা হামলা ও উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, এই ঘটনার প্রতিশোধ নেওয়া হবে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, সংঘাতের বিস্তার ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র এখনো জানায়নি কোন সাবমেরিন এই হামলা চালিয়েছে। সাধারণত সাবমেরিনের অবস্থান ও গতিবিধি গোপন রাখা হয়।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোনের পাশাপাশি এবার টর্পেডো হামলা যুদ্ধকে নতুন ধাপে নিয়ে গেছে। আর এই সংঘাতের শেষ কোথায়, তা এখনো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















