মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরু হওয়ার পর প্রবাসীদের জীবনযাত্রায় নতুন এক সংকট তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যাদের পরিবারে পোষা প্রাণী রয়েছে, তাদের জন্য দেশ ছেড়ে যাওয়া এখন হয়ে উঠেছে অত্যন্ত জটিল, ব্যয়বহুল এবং মানসিকভাবে চাপপূর্ণ এক অভিজ্ঞতা। অনেকেই প্রিয় পোষ্যকে সঙ্গে নিতে গিয়ে বিপুল অর্থ খরচ করছেন, আবার কেউ কেউ অনিশ্চয়তার মধ্যে অপেক্ষা করছেন সঠিক সুযোগের।
পোষা প্রাণী নিয়ে পালানোর কঠিন বাস্তবতা
সংঘাত শুরুর পর অনেক প্রবাসী নিরাপদ দেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে পোষা প্রাণী নিয়ে ভ্রমণ। সাধারণ ফ্লাইটে পোষা প্রাণী নেওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে ব্যক্তিগত বিমানের দিকে ঝুঁকছেন। কেউ কেউ এমনকি কয়েক লাখ টাকার সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করে শুধু পোষ্যকে সঙ্গে নেওয়ার ব্যবস্থা করছেন।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ফ্লাইট বাতিল, নিয়মের কড়াকড়ি এবং সীমিত আসনের কারণে পোষা প্রাণীকে কার্গোতেও নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মালিকদের সামনে থাকে দুটি পথ—পোষ্যকে রেখে যাওয়া অথবা বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিকল্প ব্যবস্থা করা।
খরচ বেড়ে আকাশছোঁয়া
সংকটের সময় ব্যক্তিগত বিমানের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ভাড়া কয়েক গুণ বেড়েছে। যেখানে আগে একটি আসনের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ খরচ লাগত, এখন সেই একই যাত্রায় খরচ দ্বিগুণ থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। সীমিত বিমান, বীমা জটিলতা এবং রুট সীমাবদ্ধতার কারণে বাজারে ভাড়ার ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে অনেকেই অতিরিক্ত খরচ মেনে নিচ্ছেন, কারণ তাদের কাছে পোষা প্রাণী পরিবারেরই অংশ।

বিকল্প পথে দীর্ঘ যাত্রা
অনেকে আবার সরাসরি ফ্লাইট না পেয়ে একাধিক দেশ ঘুরে গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন। কেউ বিমানে এক দেশ, তারপর গাড়িতে অন্য দেশ, এরপর টানেল বা ফেরি ব্যবহার করে চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছেন। এই পুরো প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ ও ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পোষ্যকে সঙ্গে রাখার জন্য অনেকেই এই পথ বেছে নিচ্ছেন।
নিয়মকানুন ও কাগজপত্রের জটিলতা
পোষা প্রাণী নিয়ে ভ্রমণের ক্ষেত্রে শুধু টিকিট পেলেই হয় না। প্রয়োজন হয় নানা ধরনের কাগজপত্র, যেমন টিকা সনদ, স্বাস্থ্য সনদ, রক্ত পরীক্ষা, অনুমতিপত্র এবং গন্তব্য দেশের নির্দিষ্ট নিয়ম পূরণ। এই পুরো প্রক্রিয়া অনেকের জন্য সময়সাপেক্ষ ও জটিল হয়ে উঠছে, বিশেষ করে যারা পূর্ণকালীন চাকরি করছেন।
এই কারণে এখন অনেকেই বিশেষ সংস্থার সাহায্য নিচ্ছেন, যারা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করে।
চাহিদা বেড়ে চাপের মুখে সেবা প্রতিষ্ঠান
পোষা প্রাণী স্থানান্তরকারী সংস্থাগুলোর কাছে হঠাৎ করেই বিপুল পরিমাণ অনুরোধ আসছে। প্রতিদিন শত শত ফোন ও ইমেইল পাচ্ছেন তারা। কেউ আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন, আবার কেউ আতঙ্কে দ্রুত দেশ ছাড়ার উপায় খুঁজছেন।
এই চাহিদা বৃদ্ধির কারণে পরিষেবার ওপর চাপ বেড়েছে, ফলে সময় ও খরচ—দুটিই বেড়েছে।
এয়ারলাইন্সের সীমিত সুবিধা
কিছু বিমান সংস্থা এখনও পোষা প্রাণী পরিবহন করছে, তবে নিয়ম ভিন্ন। কোথাও পোষ্যকে কার্গোতে নিতে হয়, আবার কোথাও নির্দিষ্ট ওজনের ছোট প্রাণী কেবিনে নেওয়ার অনুমতি রয়েছে। তবে ফ্লাইটের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং সময়সূচির পরিবর্তন পুরো প্রক্রিয়াকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
তবুও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞ সহায়তা থাকলে নিরাপদে পোষা প্রাণী স্থানান্তর করা এখনও সম্ভব।
মানসিক চাপ ও অনিশ্চয়তা
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো মানসিক চাপ। একদিকে যুদ্ধের আশঙ্কা, অন্যদিকে পরিবারের সদস্যসম পোষ্যকে নিরাপদে নিয়ে যাওয়ার দায়—সব মিলিয়ে প্রবাসীদের জন্য পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে উঠেছে।
এই সংকট দেখিয়ে দিচ্ছে, শুধু মানুষ নয়, তাদের সঙ্গে থাকা প্রাণীগুলিও আন্তর্জাতিক সংঘাতের প্রভাব থেকে মুক্ত নয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 
















