ভারতের পূর্ব উপকূলে আন্তর্জাতিক নৌ মহড়ায় অংশ নেওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় ডুবে যায় ইরানের ফ্রিগেট আইআরআইএস ডেনা। এই ঘটনায় জাহাজে থাকা অন্তত ৮৪ জন নাবিক নিহত হন। ঘটনাটি এখন ভারতের জন্য এক জটিল কূটনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
হামলার আগে জাহাজটি ভারতের আয়োজিত বহুজাতিক নৌ মহড়ায় অংশ নিয়েছিল। ফলে ইরান এই ঘটনাকে শুধু সামরিক নয়, রাজনৈতিক বিষয় হিসেবেও দেখছে।
ভারতে অতিথি ছিল ইরানি যুদ্ধজাহাজ
হামলার কয়েক দিন আগে আইআরআইএস ডেনা ভারতের পূর্ব উপকূলের কাছে আন্তর্জাতিক বহুজাতিক নৌ মহড়ায় অংশ নেয়। বিশাখাপত্তনমের উপকূলে অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচিতে ৭০টিরও বেশি দেশের ৪১টি যুদ্ধজাহাজ অংশগ্রহণ করে।
এই মহড়ার উদ্দেশ্য ছিল শান্তিকালীন সমুদ্র সহযোগিতা জোরদার করা এবং সমুদ্রপথে চলাচলের স্বাধীনতা ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইন রক্ষার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা।
কিন্তু বুধবার আন্তর্জাতিক জলসীমায়, শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে মার্কিন সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় ডুবে যায় ইরানি জাহাজটি।

ইরানের ক্ষোভ
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই ঘটনাকে কঠোর ভাষায় নিন্দা করেছেন। তিনি আইআরআইএস ডেনাকে “ভারতের নৌবাহিনীর অতিথি” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, মার্কিন সাবমেরিন এই হামলার মাধ্যমে নাবিকদের বিরুদ্ধে “একটি নৃশংসতা” চালিয়েছে।
ভারতের নীরবতা
ঘটনার পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এখন পর্যন্ত সরাসরি জাহাজডুবি নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
ভারতীয় নৌবাহিনী জানায়, বুধবার সকালে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীর কাছ থেকে একটি বিপদসংকেত পাওয়ার পর তারা উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয়। এই উদ্ধার অভিযানে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী ৩২ জন নাবিককে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়।
বৃহস্পতিবার মোদি শুধু বলেন, “সংঘাতের শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য যে কোনো উদ্যোগকে ভারত সমর্থন করবে।”
বিরোধীদের সমালোচনা

ভারতের প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে এই ঘটনায় মোদির নীরবতার তীব্র সমালোচনা করেছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের অতিথি হিসেবে থাকা একটি জাহাজে হামলার পরও প্রধানমন্ত্রী দেশের কৌশলগত ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নেননি।
সাধারণ মানুষের প্রতিক্রিয়া
বিশাখাপত্তনম বন্দরের কাছে কৈলাসগিরি পার্কের তত্ত্বাবধায়ক এস ভেঙ্কটেশ জানান, আন্তর্জাতিক নৌ মহড়ার সময় বিভিন্ন দেশের নাবিকদের মতো ইরানি নাবিকরাও সেখানে ঘুরতে এসেছিলেন।
তিনি বলেন, কয়েক দিন আগেই আমি ওই তরুণ ইরানি নাবিকদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলাম। তাদের আপ্যায়ন করা হয়েছিল, ছবি তোলা হয়েছিল। এখন তাদের অনেকেই আর নেই—এটা ভাবতেই কষ্ট লাগে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতামত
অবসরপ্রাপ্ত ভাইস অ্যাডমিরাল অরুণ কুমার সিং ১৯ ফেব্রুয়ারির একটি শোভাযাত্রায় উপস্থিত ছিলেন, যেখানে ইরানি নৌসেনাদেরও অংশ নিতে দেখেন।
তিনি বলেন, তখন আমি ইরানি জাহাজগুলো দেখেছি এবং তাদের নাবিকদের ব্যান্ডের সঙ্গে কুচকাওয়াজ করতে দেখেছি। এখন মনে হয়, তাদের অর্ধেকেরও বেশি হয়তো মারা গেছেন।

তবে তিনি এই ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের সরাসরি দোষ দেখেননি। তার মতে, যুদ্ধ শুরু হলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় যেকোনো পক্ষই আক্রমণের শিকার হতে পারে।
অন্যদিকে ভারতের সাবেক নৌপ্রধান অ্যাডমিরাল অরুণ প্রকাশ বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের দিক থেকে হামলাটি বৈধ হতে পারে, কিন্তু কৌশলগত স্বাধীনতার পাশাপাশি নৈতিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারতের কূটনৈতিক দ্বিধা
এই ঘটনায় ভারত অত্যন্ত অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়েছে। একদিকে ইরান, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলো—সব পক্ষের সঙ্গেই ভারতের গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ভারত ইরানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। ইরান থেকে তেল আমদানি এবং আরব সাগরের তীরে চাবাহার বন্দরের উন্নয়ন প্রকল্পে ভারতের অংশগ্রহণ তারই উদাহরণ।
অন্যদিকে গত এক দশকে ভারতের সঙ্গে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্কও উল্লেখযোগ্যভাবে উষ্ণ হয়েছে।
কৌশলগত পুনর্বিন্যাস

গত দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি চীনের প্রভাব মোকাবিলার কৌশলের অংশ হিসেবে ভারত ইসরায়েলের কাছেও আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। ইসরায়েল এখন ভারতের অন্যতম বড় সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী।
ফেব্রুয়ারির শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বাণিজ্য চুক্তি ঘোষণার পর ভারত তিনটি ইরানি পতাকাবাহী তেলবাহী জাহাজ জব্দ করে, যেগুলোকে যুক্তরাষ্ট্র তেল পাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিল।
এর কয়েক দিনের মধ্যেই ভারত সরকার সংসদে জানায়, ইরানের চাবাহার বন্দর প্রকল্পে তাদের প্রতিশ্রুতির কাজ শেষ হয়েছে।
২৪ ফেব্রুয়ারি মোদি ইসরায়েল সফর করেন এবং দুই দেশের সম্পর্ককে “বিশেষ কৌশলগত অংশীদারত্বে” উন্নীত করেন।
তবু যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত নিয়ে মোদি এখনো প্রকাশ্যে কোনো সমর্থন ঘোষণা করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ এবং গত বছর পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের উত্তেজনায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতা নিয়ে সৃষ্ট বিতর্কের পর ভারত এখন কূটনৈতিকভাবে কিছুটা নমনীয় অবস্থান ধরে রাখতে চাইছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















