মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের উত্তাপ দ্রুত বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকা উচিত এবং তিনি নিজেও সেই প্রক্রিয়ায় প্রভাব রাখতে চান। তার এই মন্তব্যের মধ্যেই ইরান ও ইসরায়েলের সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার নিয়েছে। বিভিন্ন দেশে আকাশ হামলা, ড্রোন আক্রমণ ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
ইরানের নতুন নেতা নির্ধারণে ট্রাম্পের আগ্রহ
এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ভবিষ্যতে ইরানের নেতৃত্ব কেমন হবে তা নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে যুক্ত থাকতে হবে। তার মতে, ইরানে এমন একজন নেতা দরকার যিনি দেশটির জনগণ ও রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারবেন এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করবেন।
তিনি আরও বলেন, প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনি ক্ষমতার উত্তরসূরি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। একই সঙ্গে ট্রাম্প ইরানি কুর্দি বাহিনীকে আক্রমণাত্মক অবস্থান নেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন।

ইরানে নতুন করে বিমান হামলা ও আতঙ্ক
ইসরায়েলি বাহিনী তেহরানের পূর্বাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকা খালি করার নির্দেশ দিয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় গণমাধ্যম।
তেহরানের উত্তর-পশ্চিমে একটি অতিথিশালায় বিমান হামলায় অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছে। শহরের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখন পুরোপুরি যুদ্ধক্ষেত্রের মতো হয়ে উঠেছে এবং মানুষ নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে না।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে একাধিক দেশে
সংঘাতের ষষ্ঠ দিনে ইরান ইসরায়েল, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। বাহরাইনের একটি তেল শোধনাগারে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে আগুন লাগার ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে আজারবাইজান অভিযোগ করেছে, তাদের ভূখণ্ডে ইরান ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর জেরে দেশটি দক্ষিণের আকাশসীমা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। যদিও তেহরান এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
সংঘাতের প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে আরও দূরে। পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইউরোপীয় দেশগুলো যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সময়ে শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছাকাছি সমুদ্রে একটি মার্কিন সাবমেরিন ইরানের একটি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দিয়েছে বলে জানা গেছে। এতে অন্তত ৮০ জন নৌসদস্য নিহত হয়েছে।

বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা
ইরানে এখন পর্যন্ত অন্তত এক হাজার দুইশ ত্রিশ জন নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে দেশটির রেড ক্রিসেন্ট। নিহতদের মধ্যে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে হামলায় মারা যাওয়া বহু ছাত্রী ও শিক্ষকও রয়েছেন।
লেবাননেও হামলায় বহু মানুষ নিহত হয়েছে। ইসরায়েলি সতর্কতার পর দক্ষিণ বৈরুত থেকে হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে যেতে শুরু করেছে।
ইসরায়েলের দ্বিতীয় ধাপের হামলার প্রস্তুতি
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, ইরানে সামরিক অভিযানে তাদের উল্লেখযোগ্য সাফল্য এসেছে, তবে সামনে আরও বড় কাজ বাকি রয়েছে।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর প্রধান জানিয়েছেন, ইরানের প্রায় ষাট শতাংশ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ইতিমধ্যে ধ্বংস করা হয়েছে। পরবর্তী ধাপে ভূগর্ভস্থ বাংকার ও ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সতর্ক করে বলেছেন, আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাদের যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রকে কঠিন মূল্য দিতে হবে।
এদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর এক শীর্ষ কমান্ডার ঘোষণা দিয়েছেন, যেখানে সুযোগ পাওয়া যাবে সেখানেই তারা মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত ইতোমধ্যে জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বৈশ্বিক পরিবহন ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। পরিস্থিতি দ্রুত আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















