০৭:৪৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০২ এপ্রিল ২০২৬
ঘুমের সমস্যায় কার্যকর সমাধান যোগব্যায়াম? নতুন গবেষণায় মিলছে ইতিবাচক ফল ওভিডের রূপান্তরের মহাকাব্য: শিল্প ও সাহিত্যের চিরন্তন প্রেরণা আজ রাত থেকে Apple, Google, Tesla সহ ১৭ মার্কিন কোম্পানিতে হামলার হুমকি দিল IRGC যুদ্ধের ভয়ে পোষা প্রাণী নিয়ে দেশ ছাড়তে লাখ টাকার খরচ, আকাশছোঁয়া ভাড়া ও অনিশ্চয়তায় বিপাকে প্রবাসীরা যুদ্ধ শেষের আভাসে এশিয়ার শেয়ারবাজারে বিশাল উত্থান — নিক্কেই ৪%, কসপি ৬.৪% বাড়ল মার্কিন পেট্রোলের দাম গ্যালনপ্রতি ৪ ডলার ছাড়াল — ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ ‘নিজেদের তেল নিজেরা নাও’ — মিত্রদের একা ছেড়ে দিলেন ট্রাম্প যুদ্ধের আড়ালে নিপীড়ন: ইরানে দুই রাজনৈতিক বন্দীর ফাঁসি, ইউরোপে বিক্ষোভ মধ্যপ্রাচ্যে আরো ৬ হাজার সেনা পাঠাল যুক্তরাষ্ট্র — USS George H.W. Bush রওয়ানা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী: ‘আমরা ছয় মাস যুদ্ধ চালাতে প্রস্তুত, কোনো আলোচনা চলছে না’

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল হামলায় ইরানের কী কী ক্ষতিগ্রস্থ হলে

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বিস্তৃত আকার নিয়েছে। গত গ্রীষ্মে ১২ দিনের সংঘাতে মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধিকরণ কেন্দ্র। কিন্তু এবার লক্ষ্য আরও বিস্তৃত—ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করা এবং দেশটির ধর্মীয় শাসকদের ক্ষমতার ভিত্তি নড়িয়ে দেওয়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলার পরিধি এতটাই বড় যে অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

হামলার ব্যাপকতা ও ক্ষয়ক্ষতি

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, এক সপ্তাহেরও কম সময়ে তারা দুই হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। মধ্যপ্রাচ্যে গত এক দশকের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বড় মার্কিন বিমান হামলার অভিযান বলে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ারওয়ার্স।

অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরানের শত শত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিমান হামলার লক্ষ্য হয়েছে ইরানের নেতৃত্ব, সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্র কারখানা, সেনা ও পুলিশ এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন কেন্দ্র।

স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা জানিয়েছে, এত অল্প সময়ে ইরান যে মাত্রার আঘাত পেয়েছে, তা অনেকের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।

তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার পরও জরুরি নেতৃত্ব কাঠামো এখনও দেশের ভেতরে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সক্ষমতা ধরে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মৃত্যুর সংখ্যাও নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন। যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ইরানের একটি সরকারি সংস্থার হিসাবে এখন পর্যন্ত অন্তত এক হাজার দুইশ ত্রিশ জন নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি স্কুলে হামলায় একশ পঁয়ষট্টির বেশি মানুষ নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই শিশু বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

U.S. Central Command Leadership | Commander and Senior Staff

শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধাক্কা

ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে হামলার প্রথম পর্যায়েই তেহরানের কেন্দ্রস্থলে খামেনির আবাসিক কমপ্লেক্সে আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এতে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

এছাড়া বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী, বিপ্লবী গার্ডের প্রধান, খামেনির শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

খামেনির পূর্বসূরির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধর্মীয় স্থাপনাও আংশিক ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ পরিষদের একটি ভবনের গম্বুজে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এই পরিষদের দায়িত্বই হচ্ছে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করা।

খামেনির দাফনের আগে তিনদিনের স্মরণসভা শুরু হচ্ছে আজ

বিপ্লবী গার্ড ও বাসিজ বাহিনীর ওপর তীব্র হামলা

ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড এবং তাদের সহযোগী আধাসামরিক বাহিনী বাসিজকে লক্ষ্য করে বহু হামলা হয়েছে।

আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত নথিভুক্ত ২৮০টির বেশি হামলার মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি ছিল বিপ্লবী গার্ড বা বাসিজের অবস্থানের ওপর। এসব হামলার বেশিরভাগ হয়েছে তেহরান এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ ইরানে।

সামরিক ব্যারাক, বিমানঘাঁটি, ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্স, গোলাবারুদ ভাণ্ডার, অস্ত্র কারখানা এবং কমান্ড কেন্দ্রগুলোতে আঘাত করা হয়েছে।

তেহরানের উত্তরে বিপ্লবী গার্ডের সদর দপ্তরের কয়েকটি ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে বলে স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে। বাসিজ বাহিনীর স্থানীয় অনেক কার্যালয়ও হামলার শিকার হয়েছে।

বৃহস্পতিবার তেহরানের দুটি ক্রীড়া স্থাপনাতেও হামলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিশাল আজাদি স্পোর্টস কমপ্লেক্স। প্রায় ১২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার একটি অঙ্গনের ছাদে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। জানা যায়, বিপ্লবী গার্ড ও বাসিজ বাহিনী কখনও কখনও এসব ক্রীড়া স্থাপনাকে সমাবেশ বা সংগঠনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করত।

তবে সব হামলাই বড় ধরনের কৌশলগত ক্ষতি করতে পারেনি। আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা জানিয়েছে, অনেক সময় ফাঁকা ভবনেও বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।

What to know about Iran's Revolutionary Guard, a powerful force that  answers only to its supreme leader | PBS News

মিসাইল কারখানা ও ভাণ্ডার ধ্বংসের চেষ্টা

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস করা তাদের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি।

মধ্য ইরানের ইসফাহান শহরের কাছে পাহাড়ি এলাকায় সন্দেহভাজন একটি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা হয়েছে। একইভাবে পশ্চিমের কেরমানশাহ শহরের কাছেও হামলা চালানো হয়েছে।

স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, পাহাড়ের নিচে থাকা সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের আশপাশে বহু বিস্ফোরণের গর্ত তৈরি হয়েছে।

তেহরানের উপকণ্ঠে গারমদারাহ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাতেও কয়েকটি ভবন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল, ইরানের কাছে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার কয়েক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এখনও তারা ইসরায়েল, পারস্য উপসাগরে মার্কিন ঘাঁটি এবং অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

একজন পশ্চিমা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান গতিতে হামলা চালাতে থাকলে ইরানের হাতে কয়েক দিনের মতো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য তারা কিছু অস্ত্র সংরক্ষণও করতে পারে।

ইরানের ইস্ফাহান শহরকে ইসরায়েল নিশানা করল কেন? - BBC News বাংলা

সামরিক বাহিনী ও পুলিশও লক্ষ্যবস্তু

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অনেক স্থাপনা ও সম্পদেও হামলা হয়েছে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, দক্ষিণ উপকূলে কনারাক নৌঘাঁটির কাছে হামলার পর পানিতে একটি যুদ্ধজাহাজ উল্টে গেছে।

এছাড়া একটি মার্কিন সাবমেরিন শ্রীলঙ্কার উপকূলে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়। পরে সেখানে ৮৭টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় এবং ৩২ জন ইরানি নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানেও হামলা হয়েছে। ইসফাহানে ইসফাহান অপটিকস ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা সংস্থা। এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সম্পর্ক রয়েছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

তেহরানের প্রধান পুলিশ সদর দপ্তরেও হামলা হয়েছে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, সেখানে একাধিক ভবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানের জাতীয় পুলিশ বাহিনী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনেও তারা ভূমিকা রেখেছে।

স্থানীয় পুলিশ স্টেশনগুলিও হামলার মুখে পড়েছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের কাছের একটি থানাও আঘাতের শিকার হয়েছে। এই এলাকাতেই গত ডিসেম্বর মাসে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল।

তেহরানে পুলিশের সদরদপ্তরে হামলা

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও হামলা

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবির ওপরও একাধিক হামলা হয়েছে। তবুও তারা সম্প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

তেহরানের উত্তরের বড় পার্কের মধ্যে অবস্থিত তাদের প্রধান কার্যালয়ে ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে।

রবিবার রাজধানীর অন্য একটি আইআরআইবি স্টেশনে হামলা হলে একটি অ্যান্টেনা ভেঙে পড়ে। এই হামলার ফলে রাস্তার ওপারে অবস্থিত গান্ধী হাসপাতালেও বড় ক্ষতি হয়। হাসপাতালের সামনের অংশ ভেঙে যায় এবং ভেতরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে।

পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর অবস্থা

এখন পর্যন্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়নি বলে মনে হচ্ছে। যদিও ইসরায়েল জানিয়েছে, প্রয়োজনে তারা এসব স্থাপনাতেও হামলা চালাবে।

সোমবারের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, মধ্য ইরানের নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনায় নতুন কিছু ক্ষতি হয়েছে। এটি ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ কেন্দ্র।

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, এই হামলার ফলে কোনো তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি তৈরি হয়নি।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরও দাবি করেছে, তেহরানের উত্তরের পাহাড়ি এলাকায়ও তারা হামলা চালিয়েছে। তাদের অভিযোগ, জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান গোপনে কিছু পারমাণবিক কার্যক্রম ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে সরিয়ে নিয়েছিল।

ইরান অবশ্য বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। যদিও ইউরেনিয়াম প্রায় অস্ত্রমান পর্যায়ে সমৃদ্ধ করার কারণে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইরানে পারমাণবিক কমপ্লেক্সে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এল স্যাটেলাইট ছবিতে

জনপ্রিয় সংবাদ

ঘুমের সমস্যায় কার্যকর সমাধান যোগব্যায়াম? নতুন গবেষণায় মিলছে ইতিবাচক ফল

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল হামলায় ইরানের কী কী ক্ষতিগ্রস্থ হলে

০৪:১৪:৫৭ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৬ মার্চ ২০২৬

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বিস্তৃত আকার নিয়েছে। গত গ্রীষ্মে ১২ দিনের সংঘাতে মূল লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধিকরণ কেন্দ্র। কিন্তু এবার লক্ষ্য আরও বিস্তৃত—ইরানের সামরিক শক্তিকে দুর্বল করা এবং দেশটির ধর্মীয় শাসকদের ক্ষমতার ভিত্তি নড়িয়ে দেওয়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামলার পরিধি এতটাই বড় যে অল্প সময়ের মধ্যেই ইরানের বহু গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে সামগ্রিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।

হামলার ব্যাপকতা ও ক্ষয়ক্ষতি

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, এক সপ্তাহেরও কম সময়ে তারা দুই হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে। মধ্যপ্রাচ্যে গত এক দশকের মধ্যে এটিকে সবচেয়ে বড় মার্কিন বিমান হামলার অভিযান বলে উল্লেখ করেছে আন্তর্জাতিক সংঘাত পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ারওয়ার্স।

অন্যদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, তারা ইরানের শত শত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিমান হামলার লক্ষ্য হয়েছে ইরানের নেতৃত্ব, সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্র কারখানা, সেনা ও পুলিশ এবং রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন কেন্দ্র।

স্বাধীন পর্যবেক্ষণ সংস্থা আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা জানিয়েছে, এত অল্প সময়ে ইরান যে মাত্রার আঘাত পেয়েছে, তা অনেকের প্রত্যাশার চেয়েও বেশি।

তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার পরও জরুরি নেতৃত্ব কাঠামো এখনও দেশের ভেতরে নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার সক্ষমতা ধরে রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মৃত্যুর সংখ্যাও নিশ্চিতভাবে জানা কঠিন। যোগাযোগ ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় সঠিক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। ইরানের একটি সরকারি সংস্থার হিসাবে এখন পর্যন্ত অন্তত এক হাজার দুইশ ত্রিশ জন নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের একটি স্কুলে হামলায় একশ পঁয়ষট্টির বেশি মানুষ নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই শিশু বলে জানিয়েছে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।

U.S. Central Command Leadership | Commander and Senior Staff

শীর্ষ নেতৃত্বে বড় ধাক্কা

ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখে হামলার প্রথম পর্যায়েই তেহরানের কেন্দ্রস্থলে খামেনির আবাসিক কমপ্লেক্সে আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এতে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

এছাড়া বিমান হামলায় নিহত হয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী, বিপ্লবী গার্ডের প্রধান, খামেনির শীর্ষ নিরাপত্তা উপদেষ্টা এবং আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।

খামেনির পূর্বসূরির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি ধর্মীয় স্থাপনাও আংশিক ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ পরিষদের একটি ভবনের গম্বুজে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এই পরিষদের দায়িত্বই হচ্ছে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করা।

খামেনির দাফনের আগে তিনদিনের স্মরণসভা শুরু হচ্ছে আজ

বিপ্লবী গার্ড ও বাসিজ বাহিনীর ওপর তীব্র হামলা

ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড এবং তাদের সহযোগী আধাসামরিক বাহিনী বাসিজকে লক্ষ্য করে বহু হামলা হয়েছে।

আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বুধবার পর্যন্ত নথিভুক্ত ২৮০টির বেশি হামলার মধ্যে ২০ শতাংশের বেশি ছিল বিপ্লবী গার্ড বা বাসিজের অবস্থানের ওপর। এসব হামলার বেশিরভাগ হয়েছে তেহরান এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ ইরানে।

সামরিক ব্যারাক, বিমানঘাঁটি, ভূগর্ভস্থ কমপ্লেক্স, গোলাবারুদ ভাণ্ডার, অস্ত্র কারখানা এবং কমান্ড কেন্দ্রগুলোতে আঘাত করা হয়েছে।

তেহরানের উত্তরে বিপ্লবী গার্ডের সদর দপ্তরের কয়েকটি ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে বলে স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে। বাসিজ বাহিনীর স্থানীয় অনেক কার্যালয়ও হামলার শিকার হয়েছে।

বৃহস্পতিবার তেহরানের দুটি ক্রীড়া স্থাপনাতেও হামলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে বিশাল আজাদি স্পোর্টস কমপ্লেক্স। প্রায় ১২ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার একটি অঙ্গনের ছাদে বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। জানা যায়, বিপ্লবী গার্ড ও বাসিজ বাহিনী কখনও কখনও এসব ক্রীড়া স্থাপনাকে সমাবেশ বা সংগঠনের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করত।

তবে সব হামলাই বড় ধরনের কৌশলগত ক্ষতি করতে পারেনি। আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা জানিয়েছে, অনেক সময় ফাঁকা ভবনেও বোমা নিক্ষেপ করা হয়েছে।

What to know about Iran's Revolutionary Guard, a powerful force that  answers only to its supreme leader | PBS News

মিসাইল কারখানা ও ভাণ্ডার ধ্বংসের চেষ্টা

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংস করা তাদের প্রধান লক্ষ্যগুলোর একটি।

মধ্য ইরানের ইসফাহান শহরের কাছে পাহাড়ি এলাকায় সন্দেহভাজন একটি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা হয়েছে। একইভাবে পশ্চিমের কেরমানশাহ শহরের কাছেও হামলা চালানো হয়েছে।

স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, পাহাড়ের নিচে থাকা সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের আশপাশে বহু বিস্ফোরণের গর্ত তৈরি হয়েছে।

তেহরানের উপকণ্ঠে গারমদারাহ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনাতেও কয়েকটি ভবন গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

যুদ্ধের আগে ধারণা করা হয়েছিল, ইরানের কাছে স্বল্প ও মাঝারি পাল্লার কয়েক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এখনও তারা ইসরায়েল, পারস্য উপসাগরে মার্কিন ঘাঁটি এবং অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

একজন পশ্চিমা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বর্তমান গতিতে হামলা চালাতে থাকলে ইরানের হাতে কয়েক দিনের মতো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র মজুত থাকতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের জন্য তারা কিছু অস্ত্র সংরক্ষণও করতে পারে।

ইরানের ইস্ফাহান শহরকে ইসরায়েল নিশানা করল কেন? - BBC News বাংলা

সামরিক বাহিনী ও পুলিশও লক্ষ্যবস্তু

ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর অনেক স্থাপনা ও সম্পদেও হামলা হয়েছে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, দক্ষিণ উপকূলে কনারাক নৌঘাঁটির কাছে হামলার পর পানিতে একটি যুদ্ধজাহাজ উল্টে গেছে।

এছাড়া একটি মার্কিন সাবমেরিন শ্রীলঙ্কার উপকূলে একটি ইরানি যুদ্ধজাহাজ ডুবিয়ে দেয়। পরে সেখানে ৮৭টি মৃতদেহ উদ্ধার করা হয় এবং ৩২ জন ইরানি নাবিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়।

সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানেও হামলা হয়েছে। ইসফাহানে ইসফাহান অপটিকস ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনা নথিভুক্ত করেছে আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা সংস্থা। এই প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সম্পর্ক রয়েছে বলে আন্তর্জাতিকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

তেহরানের প্রধান পুলিশ সদর দপ্তরেও হামলা হয়েছে। স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, সেখানে একাধিক ভবন পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানের জাতীয় পুলিশ বাহিনী অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনেও তারা ভূমিকা রেখেছে।

স্থানীয় পুলিশ স্টেশনগুলিও হামলার মুখে পড়েছে। তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের কাছের একটি থানাও আঘাতের শিকার হয়েছে। এই এলাকাতেই গত ডিসেম্বর মাসে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল।

তেহরানে পুলিশের সদরদপ্তরে হামলা

রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনেও হামলা

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার সংস্থা আইআরআইবির ওপরও একাধিক হামলা হয়েছে। তবুও তারা সম্প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে।

তেহরানের উত্তরের বড় পার্কের মধ্যে অবস্থিত তাদের প্রধান কার্যালয়ে ক্ষতির চিহ্ন দেখা গেছে।

রবিবার রাজধানীর অন্য একটি আইআরআইবি স্টেশনে হামলা হলে একটি অ্যান্টেনা ভেঙে পড়ে। এই হামলার ফলে রাস্তার ওপারে অবস্থিত গান্ধী হাসপাতালেও বড় ক্ষতি হয়। হাসপাতালের সামনের অংশ ভেঙে যায় এবং ভেতরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে।

পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর অবস্থা

এখন পর্যন্ত পারমাণবিক স্থাপনাগুলো প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়নি বলে মনে হচ্ছে। যদিও ইসরায়েল জানিয়েছে, প্রয়োজনে তারা এসব স্থাপনাতেও হামলা চালাবে।

সোমবারের স্যাটেলাইট ছবিতে দেখা গেছে, মধ্য ইরানের নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনায় নতুন কিছু ক্ষতি হয়েছে। এটি ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধিকরণ কেন্দ্র।

আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা জানিয়েছে, এই হামলার ফলে কোনো তেজস্ক্রিয়তার ঝুঁকি তৈরি হয়নি।

ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আরও দাবি করেছে, তেহরানের উত্তরের পাহাড়ি এলাকায়ও তারা হামলা চালিয়েছে। তাদের অভিযোগ, জুনের ১২ দিনের যুদ্ধের পর ইরান গোপনে কিছু পারমাণবিক কার্যক্রম ভূগর্ভস্থ বাঙ্কারে সরিয়ে নিয়েছিল।

ইরান অবশ্য বরাবরই দাবি করে আসছে যে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ। যদিও ইউরেনিয়াম প্রায় অস্ত্রমান পর্যায়ে সমৃদ্ধ করার কারণে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ইরানে পারমাণবিক কমপ্লেক্সে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র উঠে এল স্যাটেলাইট ছবিতে