বিশ্বে আবারও সবচেয়ে বেশি ধনকুবেরের দেশ হিসেবে শীর্ষস্থান দখল করেছে চীন। শেয়ারবাজারের উত্থান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে দ্রুত বিস্তারের ফলে বিশ্বজুড়ে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। সর্বশেষ হুরুন গ্লোবাল রিচ লিস্টে এই তথ্য উঠে এসেছে।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এই বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বিশ্বজুড়ে মোট ৪ হাজার ২০ জন বিলিয়নিয়ারের মধ্যে ১ হাজার ১১০ জনই চীনের বাসিন্দা। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে আবারও বিশ্বের বিলিয়নিয়ার রাজধানীর মর্যাদা ফিরে পেয়েছে চীন।
শেয়ারবাজার ও প্রযুক্তি খাতের উত্থান
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক বছরে চীনে নতুন করে ২৮৭ জন বিলিয়নিয়ার যুক্ত হয়েছেন। ফলে গত তিন বছরে যে ক্ষতি হয়েছিল তা প্রায় পুরোপুরি পুষিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছে দেশটি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত থেকে নতুন দুই চীনা বিলিয়নিয়ারও তৈরি হয়েছে। মিনিম্যাক্সের প্রতিষ্ঠাতা ইয়ান জুনজি প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে তালিকায় প্রবেশ করেছেন। আর নলেজ অ্যাটলাস টেকনোলজি, যা জিপু নামে বেশি পরিচিত, তার সঙ্গে যুক্ত লিউ ডেবিংয়ের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
হুরুন গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান গবেষক রুপার্ট হুগেওয়ার্ফ বলেন, বিশ্বে অর্থনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ আরও বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারের উত্থান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিস্তার বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা বাড়াতে বড় ভূমিকা রেখেছে। একই সঙ্গে চীনা ব্যবসা বিশ্ববাজারে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।

বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবেরদের তালিকা
তালিকার শীর্ষে রয়েছেন টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। তার মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭৯২ বিলিয়ন ডলার। তিনি বিশ্বের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে ৭০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদের মালিক হয়েছেন।
দ্বিতীয় স্থানে আছেন অ্যামাজনের প্রতিষ্ঠাতা জেফ বেজোস, যার সম্পদ প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলার। তৃতীয় স্থানে আছেন অ্যালফাবেটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ, যার সম্পদ প্রায় ২৮১ বিলিয়ন ডলার।
গত এক বছরে বিশ্বজুড়ে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা নিট হিসেবে ৫৭৮ জন বেড়েছে। নতুন যুক্ত হওয়া বিলিয়নিয়ারের প্রায় অর্ধেকই এসেছে চীন থেকে, যার মধ্যে মূল ভূখণ্ড, হংকং, ম্যাকাও এবং তাইওয়ান অন্তর্ভুক্ত।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের অবস্থান
এই তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যেখানে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ১ হাজার। গত বছরের তুলনায় দেশটিতে নতুন করে ১৩০ জন বিলিয়নিয়ার যুক্ত হয়েছেন।
তৃতীয় স্থানে রয়েছে ভারত, যেখানে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ৩০৮ জন। চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে জার্মানি, যার বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ১৭১। এতে যুক্তরাজ্য এক ধাপ পিছিয়ে গেছে।
প্রতিবেদন আরও জানায়, চীনে জন্ম নেওয়া কিন্তু বর্তমানে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বসবাস করছেন এমন বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ৪২ জন। তাদের বেশিরভাগই সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন।
সম্পদ সৃষ্টির ধরনে বড় পরিবর্তন
হুরুনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান বিলিয়নিয়ারদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই দশ বছর আগে এই তালিকায় ছিলেন না। অর্থাৎ সাম্প্রতিক দশকে সম্পদ সৃষ্টির ধরণে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে।
বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাত থেকেই এখন সবচেয়ে বেশি নতুন বিলিয়নিয়ার তৈরি হচ্ছে। এই খাত থেকে মোট ১১৪ জন বিলিয়নিয়ার এসেছে, যার মধ্যে ৪৬ জন এবার প্রথমবারের মতো তালিকায় প্রবেশ করেছেন।
রুপার্ট হুগেওয়ার্ফ বলেন, আজকের দিনে সম্পদ তৈরির পদ্ধতি দশ বছর আগের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত বছর সম্পদ সৃষ্টির গতি হুরুন রিচ লিস্টের ইতিহাসে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এক বছরে ৭০০-এর বেশি নতুন বিলিয়নিয়ার যুক্ত হয়েছেন, যা গড়ে প্রতিদিন প্রায় দুইজন।
![]()
শহরভিত্তিক ধনকুবেরের কেন্দ্র
বিশ্বের শহরগুলোর মধ্যে এখনও সবচেয়ে বেশি বিলিয়নিয়ারের শহর নিউইয়র্ক। সেখানে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা ১৪৬ জন, যা গত বছরের তুলনায় ১৭ জন বেশি।
দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে চীনের শেনঝেন শহর, যেখানে নতুন করে ৪৭ জন যুক্ত হয়ে মোট বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৩২। এরপর রয়েছে সাংহাই, বেইজিং এবং লন্ডন।
হংকংয়ে বর্তমানে ৮৮ জন বিলিয়নিয়ার রয়েছেন, যা গত বছরের তুলনায় ১৪ জন বেশি। তালিকায় ৫৪তম স্থানে যৌথভাবে রয়েছেন লি কা-শিং এবং তার বড় ছেলে ভিক্টর লি।
চীনের নতুন ধনকুবেরদের উত্থান
বর্তমানে চীনের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ বিলিয়নিয়ারই দশ বছর আগে এই তালিকায় ছিলেন না। শিল্পপণ্য খাত থেকে সবচেয়ে বেশি নতুন বিলিয়নিয়ার তৈরি হয়েছে, যার সংখ্যা ৮০ জনের বেশি।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্প থেকেও ১৮ জন নতুন বিলিয়নিয়ার এসেছে। দেশটির চিপ প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর হওয়ার প্রচেষ্টার ফলেই এই উত্থান হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই খাতে মেটাএক্স ইন্টিগ্রেটেড সার্কিটসের চেন ওয়েইলিয়াং প্রায় ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে এগিয়ে আছেন। আর মুর থ্রেডস টেকনোলজির ঝ্যাং জিয়ানঝংয়ের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৪ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
স্বাস্থ্য ও জ্বালানি খাতেও উত্থান
চীনের স্বাস্থ্যখাত থেকেও নতুন ২৮ জন বিলিয়নিয়ার যুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছেন রেজেনসেল বায়োসায়েন্সের আউ ইয়াত-গাই, যার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১৩ বিলিয়ন ডলার।
জ্বালানি খাত থেকেও নতুন ১৯ জন বিলিয়নিয়ার এসেছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাটারি শিল্প এই উত্থানে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্বের বিলিয়নিয়ারদের গড় বয়স বর্তমানে ৬৫ বছর।
মাস্কের সম্পদের বিস্ফোরক বৃদ্ধি
৫৪ বছর বয়সী ইলন মাস্ক গত ছয় বছরের মধ্যে পঞ্চমবারের মতো বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবেরের অবস্থান ফিরে পেয়েছেন। গত এক বছরে তার সম্পদ প্রায় ৮৯ শতাংশ বেড়ে ৭৯২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
টেসলার শেয়ারমূল্য দ্বিগুণ হয়ে প্রায় ৪১১ ডলারে পৌঁছানো এবং স্পেসএক্সের সম্ভাব্য রেকর্ড আইপিও প্রস্তুতির কারণে তার সম্পদ দ্রুত বেড়েছে।
মাত্র ছয় মাস আগে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনে উচ্চপ্রোফাইল উপদেষ্টা পদ ছাড়ার পর থেকেই তার সম্পদ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বেড়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















