মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সামরিক উত্তেজনার কারণে আকাশপথে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানে হামলা এবং এর পাল্টা জবাবে ইরানের আঞ্চলিক আক্রমণের পর পুরো অঞ্চলের বিমান চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতির কারণে অনেক এয়ারলাইনকে ফ্লাইট বাতিল করতে, রুট পরিবর্তন করতে এবং কিছু ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে পরিষেবা বন্ধ রাখতে হয়েছে।
আকাশসীমা বন্ধ হওয়ায় বিমান চলাচলে বড় ধাক্কা
ইরান, ইসরায়েল, ইরাক, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও সিরিয়ার আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আঞ্চলিক বিমান চলাচলের বড় অংশ থেমে যায়। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবেও আংশিক বিধিনিষেধ জারি হওয়ায় বিমান চলাচলে প্রভাব পড়ে।
বিমান চলাচল বিশ্লেষণ সংস্থা সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ২৩ হাজারেরও বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ওই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে আসা বা এখান থেকে ছাড়ার জন্য প্রায় ৩৬ হাজার ফ্লাইট নির্ধারিত ছিল। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি বাতিল হওয়ায় প্রায় ৪৪ লাখ আসন কমে গেছে।

বড় বিমানবন্দরগুলোতে সময়সূচি পরিবর্তন
সংঘাতের কারণে দুবাই, আবুধাবি ও দোহা—এই প্রধান বিমানবন্দরগুলোতে ফ্লাইটের সময়সূচি বারবার বদলাতে হয়েছে। বিকল্প রুট ব্যবহার করতে গিয়ে বিমান চলাচলে ভিড় এবং বিলম্বের ঘটনাও বাড়ছে।
ফিচ রেটিংসের বিশ্লেষণ বলছে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ মার্চের মধ্যে অঞ্চলের সাতটি বড় বিমানবন্দরে ১৫ হাজারের বেশি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে অন্তত ১৫ লাখ যাত্রী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
এয়ারলাইনের আয় কমছে, বাড়ছে খরচ
ফ্লাইট পরিচালনা করা না গেলে এয়ারলাইনের আয় সরাসরি কমে যায়। বিশেষ করে যেসব এয়ারলাইনের প্রধান কেন্দ্র সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলে, তাদের ঝুঁকি বেশি। কারণ তাদের নেটওয়ার্ক অনেকটাই নির্ভর করে ওই আকাশপথের ওপর।
সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারের আকাশপথে উড়ান পরিচালনায় বর্তমানে বেশি সীমাবদ্ধতা দেখা যাচ্ছে।
একই সঙ্গে বিকল্প পথ ধরে উড়তে হওয়ায় ফ্লাইটের সময় বেড়ে যাচ্ছে এবং জ্বালানি খরচও বাড়ছে। এতে অতিরিক্ত প্রযুক্তিগত বিরতি, ক্রুদের অতিরিক্ত কাজের সময়, হোটেল ও বিমানবন্দর ব্যবস্থাপনার খরচও বাড়ছে।
এছাড়া যাত্রীদের খাবার, হোটেল, রিফান্ড বা ভাউচার দেওয়ার মতো খরচও বহন করতে হচ্ছে অনেক এয়ারলাইনকে। তবে এই পরিস্থিতি ভূরাজনৈতিক সংঘাতের কারণে তৈরি হওয়ায় যাত্রী ক্ষতিপূরণ তুলনামূলকভাবে সীমিত হতে পারে।

ভাড়া বাড়ার সম্ভাবনা
ফ্লাইট সংখ্যা কমে যাওয়ায় কিছু রুটে বিমান ভাড়া বাড়তে পারে। এতে এয়ারলাইনগুলো আংশিকভাবে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে।
অন্যদিকে তেলের দামও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক এয়ারলাইন আগাম চুক্তির মাধ্যমে জ্বালানি দামের ঝুঁকি কমিয়ে রাখে। সাধারণত ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার এয়ারলাইনগুলো আগামী তিন মাসের জন্য তাদের জ্বালানির ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত আগাম সুরক্ষিত করে রাখে।
পর্যটনে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সংঘাত কতদিন চলবে তার ওপর নির্ভর করে ২০২৬ সালে এই অঞ্চলে আন্তর্জাতিক পর্যটক আগমন ১১ থেকে ২৭ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
এর ফলে পূর্বাভাসের তুলনায় ২ কোটি ৩০ লাখ থেকে ৩ কোটি ৮০ লাখ কম পর্যটক আসতে পারে। এতে পর্যটন খাতে ৩৪ থেকে ৫৬ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ব্যয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই বিশ্লেষণে দুটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে। প্রথমটি হলো সংঘাত এক থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে শেষ হওয়া। দ্বিতীয়টি হলো প্রায় দুই মাস ধরে উত্তেজনা চলতে থাকা।
জিসিসি দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, কারণ এই অঞ্চলেই পর্যটনের বড় অংশ কেন্দ্রীভূত। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব বড় বাজার হওয়ায় এবং বিমান যোগাযোগের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের ঝুঁকি বেশি।

ইসরায়েল ও ইরানে সবচেয়ে বড় পতন
সংঘাত সরাসরি এই দুই দেশে কেন্দ্রীভূত হওয়ায় পর্যটন খাতে সবচেয়ে বড় পতন দেখা যেতে পারে। আগের পূর্বাভাসের তুলনায় ইসরায়েলে বিদেশি পর্যটক আগমন ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। ইরানে তা কমতে পারে প্রায় ৪৯ শতাংশ।
বিমান খাতের বাইরে অন্য খাতেও প্রভাব
এই অস্থিরতার প্রভাব শুধু এয়ারলাইনেই সীমাবদ্ধ নয়। বিমানবন্দর, হোটেল, বীমা কোম্পানি এবং বিমান লিজদাতা প্রতিষ্ঠানও এর প্রভাব অনুভব করছে।
ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে যাত্রী চলাচল কমে যাওয়ায় ইউরোপের কিছু বিমানবন্দরের আয় কমতে পারে। যদিও পার্কিং আয় বা নিয়ন্ত্রক সুরক্ষার কারণে তারা আংশিক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যনির্ভর অনেক হোটেল আন্তর্জাতিক চেইনের অংশ হওয়ায় তাদের বৈচিত্র্যময় ব্যবসা কাঠামো এই ধাক্কা সামাল দিতে সাহায্য করতে পারে।
অন্যদিকে বিমান লিজদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব তুলনামূলকভাবে কম হওয়ার কথা। কারণ তাদের বিমানবহর বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তৃত এবং বেশিরভাগ চুক্তিই দীর্ঘমেয়াদি।

পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে দ্রুত পুনরুদ্ধারের আশা
বিমান চলাচল বিশ্লেষকদের মতে, আকাশসীমার বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া হলে ভ্রমণ চাহিদা সাধারণত দ্রুত ফিরে আসে। ইউরোপ, এশিয়া এবং অন্যান্য দীর্ঘ দূরত্বের বাজারের মধ্যে সংযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিমানবন্দরগুলো ভবিষ্যতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
জাস্টিন ভার্গেস 



















