ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির হত্যাকাণ্ড শুধু মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতেই আলোড়ন তোলেনি, বরং বিশ্ব রাজনীতির দাবার ছকে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই সামরিক পদক্ষেপ চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও কৌশলগত সমীকরণকেও বদলে দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতির মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্ধারিত চীন সফর বেইজিংকে এক জটিল অবস্থার মধ্যে ফেলেছে।
ইরান ও ভেনেজুয়েলা: চীনের জ্বালানি নিরাপত্তার কেন্দ্র
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক অভিযান চালিয়েছে চীনের ঘনিষ্ঠ দুই দেশ ইরান ও ভেনেজুয়েলায়। ভেনেজুয়েলায় আকস্মিক অভিযানে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করা হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি।
এই দুটি দেশই দীর্ঘদিন ধরে চীনের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের জন্য ইরান ও ভেনেজুয়েলার তেল সরবরাহ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই দুই দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটলে চীনের জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের একটি বড় লক্ষ্য ছিল চীনের ওপর কৌশলগত চাপ তৈরি করা।
ট্রাম্প সফর ঘিরে বেইজিংয়ের দ্বিধা
এই পরিস্থিতির মধ্যেই মার্চের শেষ সপ্তাহে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে চীন যাওয়ার কথা রয়েছে ট্রাম্পের। শুরুতে দীর্ঘ সফরের পরিকল্পনা থাকলেও তা সংক্ষিপ্ত করা হয়েছে।
অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ইরানে সামরিক অভিযান শুরুর সময় নির্বাচনও এই সফরের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্প মনে করছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সফর বাতিল করার মতো অবস্থায় নেই।
চীনের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সফরকে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে। তাই এমন একটি সফর প্রত্যাখ্যান করা বেইজিংয়ের জন্য রাজনৈতিকভাবে বিব্রতকর হতে পারে।

অর্থনৈতিক সংকটে চীন
চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও বর্তমানে চাপের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘদিনের সম্পত্তি খাতের সংকট অর্থনীতিকে দুর্বল করে রেখেছে। করপোরেট আয়ের প্রবৃদ্ধি কমছে, ভোক্তা ব্যয়ও স্থবির হয়ে আছে। একই সঙ্গে তরুণদের বেকারত্ব একটি বড় সামাজিক সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে যদি ট্রাম্প তার সফর বাতিল করেন, তাহলে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের অর্থনৈতিক দুর্বলতা আরও বেশি আলোচনায় আসতে পারে। ফলে বেইজিং সফরটি সফলভাবে আয়োজন করতে আগ্রহী।
সামরিক নেতৃত্বে অস্থিরতা
চীনের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়েও সাম্প্রতিক সময়ে অস্থিরতা দেখা গেছে। পিপলস লিবারেশন আর্মির শীর্ষ কর্মকর্তা ঝাং ইউশিয়ার আকস্মিক অপসারণ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ক্ষমতার দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত দিয়েছে।

এই অস্থিরতার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র তাইওয়ানের জন্য বিশাল অস্ত্র বিক্রির পরিকল্পনা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। এই বিষয়টি চীনের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর এবং ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে শি জিনপিংয়ের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
ইরান হামলার পেছনে বড় কৌশল
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইরানে হামলার মূল লক্ষ্য শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং চীনের ওপর কৌশলগত চাপ সৃষ্টি করা। যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্লেষণ বলছে, এই অভিযান চীন-ইরান সম্পর্ক দুর্বল করে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও মনোযোগ দিতে সুযোগ দেবে।
চীনের জন্য ইরানের তেল ছিল এক ধরনের নিরাপত্তা ভরসা। কারণ সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার সময়ও কম দামে তেল সরবরাহ করে বেইজিংকে সহায়তা করত তেহরান। সেই সমীকরণ এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

নজর এখন তাইওয়ান প্রশ্নে
বিশ্ব রাজনীতির এই উত্তেজনার মধ্যেও বিশ্লেষকদের মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে তাইওয়ান। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, চীন যেন পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর বা তাইওয়ান নিয়ে কোনো সামরিক পদক্ষেপ না নেয়।
ইরানে সামরিক অভিযানকে অনেকেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখছেন। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের চীন সফর বিশ্ব রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হয়ে উঠতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















