ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রশ্নে লেবানন এখন এক সংকটপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। ইসরায়েলের সঙ্গে দ্রুত বাড়তে থাকা সংঘাতের মাঝেই দেশটির সরকার কঠোর পদক্ষেপ নেবে কি না—এবং হিজবুল্লাহ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে—সেই প্রশ্নেই এখন নজর সারা দেশের।
সংঘাতের নতুন বিস্ফোরণ
গত এক বছরে লেবানন সরকার হিজবুল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে চলছিল। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা মিত্রদের চাপ ছিল দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য, অন্যদিকে সরাসরি সংঘর্ষ এড়ানোর চেষ্টা করছিল সরকার, কারণ তা গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনায় সেই ভারসাম্য ভেঙে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের দিকে রকেট ছুড়তে শুরু করলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
এরপর ইসরায়েল দক্ষিণ বৈরুতসহ লেবাননের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র বিমান হামলা চালায়। রাজধানীর দক্ষিণ প্রান্তে বিস্ফোরণের শব্দ ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে। এতে হাজার হাজার মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে রাস্তায় রাত কাটাতে বাধ্য হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি লেবাননের জন্য একটি ‘সংকটময় মোড়’। হয় সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করবে, নয়তো সেনাবাহিনী ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষের ঝুঁকি তৈরি হবে।

সরকারের কঠোর অবস্থান
সংঘাত বাড়ার পর সোমবার লেবানন সরকার হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রমকে অবৈধ ঘোষণা করে। এর ফলে একসময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তিকে কার্যত বেআইনি সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এই সিদ্ধান্তের জবাবে হিজবুল্লাহ সতর্কবার্তা দেয়। সংগঠনটির এক শীর্ষ নেতা বলেন, দুর্বল সরকারকে এমন সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকা উচিত যা দেশের ভেতরে উত্তেজনা ও অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
সরকারও পাল্টা অবস্থান আরও কঠোর করেছে। লেবানন ঘোষণা দিয়েছে, দেশে অবস্থান করা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাদের বহিষ্কার করা হবে।
হিজবুল্লাহ–ইসরায়েল সংঘাতের পটভূমি
২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে হামাসের হামলার প্রতি সংহতি জানিয়ে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে রকেট হামলা চালালে দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। এরপর ইসরায়েল ব্যাপক হামলা চালায়।

২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হলেও ততদিনে লেবাননের বড় অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং হিজবুল্লাহ বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ওই যুদ্ধের পর ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সদস্যরা লেবাননে এসে হিজবুল্লাহর সামরিক কাঠামোর বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে।
এদিকে লেবাননের সেনাবাহিনীও সাম্প্রতিক সময়ে অস্ত্রসহ ২৬ জনকে আটক করেছে। যদিও তাদের পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি, তবে ধারণা করা হচ্ছে সরকার নিরস্ত্রীকরণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে এগোতে শুরু করেছে।
যুদ্ধের মধ্যে নতুন সংকট
হিজবুল্লাহর রকেট হামলার জবাবে ইসরায়েল দক্ষিণ ও পূর্ব লেবাননসহ বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে। এই অঞ্চলটি হিজবুল্লাহর শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।
ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকায় প্রবেশ করে নিয়ন্ত্রণও নিয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননের বড় অংশ এবং বৈরুতের দাহিয়া অঞ্চলের জন্য সরিয়ে নেওয়ার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
এতে বড় আকারের স্থল অভিযান শুরু হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

লেবাননের ভেতরের রাজনৈতিক উত্তেজনা
লেবাননের সমাজ বহু ধর্মীয় ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত। শিয়া ও সুন্নি মুসলিম, বিভিন্ন খ্রিস্টান সম্প্রদায় এবং দ্রুজ জনগোষ্ঠী একসময় ১৫ বছর ধরে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছিল।
গত দুই দশকে এই সব গোষ্ঠীর ওপর প্রভাব বিস্তার করে হিজবুল্লাহ দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়।
কিন্তু ইসরায়েলের সঙ্গে আগের যুদ্ধে বড় ক্ষতির পর দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। হিজবুল্লাহর অস্ত্রভাণ্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অনেক যোদ্ধা নিহত হয়।
এই সুযোগে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটিয়ে লেবাননের পার্লামেন্ট নতুন সরকার গঠন করে। তখন থেকেই হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার দাবি জোরালো হতে থাকে।
সরকারের ধীরগতির সমালোচনা
গত এক বছরে সরকার ও সেনাবাহিনীকে নিরস্ত্রীকরণে ধীরগতির জন্য সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
সামরিক নেতৃত্বের মতে, তারা সতর্কভাবে এগোচ্ছে কারণ হিজবুল্লাহ এখনও শক্তিশালী। হঠাৎ কঠোর পদক্ষেপ নিলে সেনাবাহিনী ও হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হতে পারে, যা আবার দেশব্যাপী অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।

২০০৮ সালে সরকার যখন হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিয়েছিল, তখন বৈরুতে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল।
হিজবুল্লাহর দুর্বলতা ও বিচ্ছিন্নতা
বর্তমান পরিস্থিতিতে হিজবুল্লাহ আগের তুলনায় অনেক দুর্বল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইসরায়েলের সঙ্গে আগের যুদ্ধে তাদের অস্ত্রভাণ্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে তারা আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
সোমবার লেবাননের আরেক শক্তিশালী শিয়া রাজনৈতিক দল আমাল মুভমেন্টও সরকারের পক্ষে অবস্থান নেয় এবং হিজবুল্লাহর সামরিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করে।
এতে হিজবুল্লাহ তাদের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মিত্রকেও হারায়।
অন্যদিকে ইসরায়েলের নতুন হামলায় তাদের সমর্থকদের মধ্যেও হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে, কারণ অনেক মানুষ আবারও ঘরছাড়া হয়েছে।
এখন প্রশ্ন উঠেছে—সংগঠনটি তাদের সমর্থন ধরে রাখতে পারবে কি না।

আগামী পথ কোন দিকে
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের সিদ্ধান্ত লেবানন রাষ্ট্রের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমারেখা তৈরি করেছে। এতে বোঝা যায় হিজবুল্লাহ আগের মতো শক্তিশালী অবস্থানে নেই।
তবে এখনো স্পষ্ট নয় এই সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ইসরায়েল ও লেবানন সরকারের চাপের মধ্যে পড়ে হিজবুল্লাহ কি তাদের আগের কৌশল বদলাবে? নাকি দেশের ভেতরেই বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করবে?
এই আশঙ্কাই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হয়ে উঠেছে লেবাননের জন্য।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















