ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বান নতুন এক রাজনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের জনগণকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নামার আহ্বান জানানোর পর দেশটির কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা। তারা ভাবছে—ওয়াশিংটনের ওপর ভরসা করা যাবে কি না, নাকি এটি আবারও অতীতের মতো কোনো অনিশ্চিত জোটে পরিণত হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের লক্ষ্য এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে ইরানের কুর্দি বিরোধী সংগঠনগুলো ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে।

ট্রাম্পের আহ্বানে কুর্দি গোষ্ঠীর দ্বিধা
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে কোনো কুর্দি স্থল অভিযানে তিনি সমর্থন দেবেন। এর পর থেকেই উত্তর ইরাকের কুর্দি অঞ্চলে অবস্থান করা বিভিন্ন ইরানি কুর্দি গোষ্ঠীর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
ইরানের ভেতরে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে কুর্দিরাই তুলনামূলকভাবে সবচেয়ে সংগঠিত এবং সামরিকভাবে অভিজ্ঞ বলে মনে করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে তারা তেহরানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলা, বিদ্রোহে অংশ নেওয়া এবং আঞ্চলিক কুর্দি আন্দোলনের সঙ্গে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা—সব মিলিয়ে তাদের একটি সুসংগঠিত শক্তি হিসেবে দেখা হয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এখনো স্পষ্ট করে বলেনি ইরানের বিরুদ্ধে তাদের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা কী। ফলে সম্ভাব্য মিত্রদের মধ্যেই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

সামরিক শক্তির বড় বৈষম্য
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের স্থলবাহিনীর সদস্যসংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখের কাছাকাছি। এর বিপরীতে কুর্দি বিরোধী সংগঠনগুলো একত্র হলেও সর্বোচ্চ প্রায় দশ হাজার যোদ্ধা জড়ো করতে পারবে।
এই বিশাল সামরিক ব্যবধানের কারণে কুর্দি বাহিনীকে সম্ভাব্য অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের বিমান হামলা, অস্ত্র সহায়তা এবং গোয়েন্দা তথ্যের ওপর নির্ভর করতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেই সহায়তা শেষ পর্যন্ত বাস্তবে পাওয়া যাবে কি না।
অতীতের অভিজ্ঞতা বাড়াচ্ছে সন্দেহ
মধ্যপ্রাচ্যে কুর্দিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক বহুবার উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে। অতীতে বিদ্রোহের আহ্বান জানিয়ে পরে সমর্থন প্রত্যাহারের উদাহরণ রয়েছে।
১৯৯১ সালে ইরাকের তৎকালীন শাসক সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উৎসাহ দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়ায় হাজারো কুর্দির মৃত্যু হয় এবং লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়।
পরবর্তী সময়ে আইএসবিরোধী যুদ্ধে কুর্দিরা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্রে পরিণত হলেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেলে সেই সমর্থন অনেক ক্ষেত্রেই দুর্বল হয়ে পড়ে। এসব অভিজ্ঞতা এখনো কুর্দি রাজনীতিতে গভীর সন্দেহ তৈরি করে রেখেছে।
![]()
উত্তর ইরাকের কুর্দি অঞ্চলের ঝুঁকি
ইরানের কুর্দি বিরোধী সংগঠনগুলোর বেশিরভাগই বর্তমানে উত্তর ইরাকের স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে অবস্থান করছে। সেখানে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন মানুষের বাস।
যদি তারা ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে, তাহলে এই অঞ্চল সরাসরি সংঘাতের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
সম্প্রতি ইরান ওই অঞ্চলে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলাও চালিয়েছে বলে জানা গেছে। তেহরান ইতোমধ্যে সতর্ক করে বলেছে, কুর্দি অঞ্চল থেকে কোনো বিদ্রোহী কার্যক্রম হলে তারা কঠোর সামরিক জবাব দেবে।
তবু সুযোগ দেখছে কেউ কেউ
সব দ্বিধা সত্ত্বেও কিছু বিশ্লেষক মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে কুর্দি আন্দোলনের জন্য একটি সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ইরানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে আসা কুর্দি গোষ্ঠীগুলো মনে করছে, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য দুর্বল হওয়ায় হয়তো নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি হতে পারে।
এদিকে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক বিক্ষোভে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভও স্পষ্ট হয়েছে। ফলে কোনো বিদ্রোহ হলে তা কতটা জনসমর্থন পাবে—সেটিও এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















